হঠাৎ রাজধানীতে চালের বাজারে আগুন!

  

পিএনএস ডেস্ক : রাজধানীতে চালের দাম বেড়েই চলেছে। ঢাকার প্রধান বাজারগুলোয় এখন প্রতিকেজি মিনিকেট (সরু) চালের দাম ৬৬ টাকা। প্রতিকেজি নাজির শাইল চালের দাম ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। কিন্তু ঢাকার বাইরে চালের দাম এর চেয়ে অনেক কম। রাজধানীতে চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতির জন্য অসৎ ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করেছেন ক্রেতাসহ সংশ্লিষ্টরা।

সদ্য শুরু হওয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি করা চালের ওপর ২৮ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করার অজুহাতে রাজধানীর এসব অসৎ ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, গতবছর দেশে আগাম বন্যা ও হাওরে পানি বাড়ার কারণে ধানের ফলন নষ্ট হয়েছিল। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, গতবছর সর্বমোট ২৬ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাল আমদানির মাধ্যমে এ সংকট কাটিয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয়।

এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রথমে ১০ শতাংশ ও পরবর্তীতে ২ শতাংশ নির্ধারণ করে। চালের আমদানি শুল্ক ছাড়ের এই সুযোগ নিয়ে এ সময় পর্যন্ত দেশে মোট ৫৬ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। এছাড়াও এ বছর দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ বছর চালের উৎপাদন চার কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। অথচ চালের দাম বাড়ছে।

এদিকে, দেশের কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পায় সেজন্য ৩৮ টাকা কেজি দরে মোটা চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ৩৮ টাকা কেজি দরেই সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করছেন। মফস্বলের বাজারগুলোয় মোটা চালের দর ৩৮ টাকার বেশি নয়।

এ ছাড়াও সেখানে সব ধরনের চিকন চালের কেজি ৪৮ থেকে ৪৯ টাকার বেশি নয়। অথচ রাজধানীতে চালের বাজারের চিত্র মফস্বলের বাজারের তুলনায় পুরোপুরি বিপরীত। রাজধানীতে প্রতি কেজি চিকন (মিনিকেট) চালের দর এখন সর্বনিম্ন ৬২ থেকে ৬৬ টাকা। এছাড়াও ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে নাজিরশাইল চাল।

হঠাৎ করে কী কারণে চালের দাম বেড়েছে জানতে চাইলে বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ী লক্ষ্মী ভাণ্ডারের মালিক নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘ঈদের কারণে পরিবহন ও শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। চালের মোকাম নামে খ্যাত নওগাঁ বা দিনাজপুর থেকে এক ট্রাক চাল রাজধানীতে আনতে যেখানে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা পরিবহন ব্যয় হতো, সেখানে এখন ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগছে।

যা চালের মূল্যের ওপর বর্তায়। একইভাবে নওগাঁ থেকে চট্টগ্রাম এক ট্রাক চাল নিতে ব্যয় হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা। যার ওপর কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ নাই।’ তিনি জানিয়েছেন, ঈদের পর শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে চালের মোকামগুলোয়। ট্রাক পাওয়া গেলেও এর চালক বা হেলপার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার গুদাম থেকে চাল ট্রাকে তোলার জন্য লেবারও পাওয়া যাচ্ছে না। আর পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। তাই চালের দাম বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চালের আমদানি শুল্ক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পর থেকেই রাজধানীতে চালের দাম বাড়ছে। ঈদের পর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকট।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার সব সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে মোটা চালের ওপর গুরুত্ব দেয়। সরু বা চিকন চালের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারকে তেমন ভাবিয়ে তোলে না। এই সুযোগে অসৎ ব্যবসায়ীরা রাজধানীতেই সব সময় চালের দাম বাড়ায়। এছাড়াও রাজধানীতে মোটা চালের তুলনায় চিকন চালের বিক্রি বেশি।

তাই দাম বৃদ্ধির পর তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। এক ধরনের হুলস্থুল শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে দেশের চালের বাজারে কোনও অস্থিরতা নাই। গ্রামগঞ্জে মোটা-সরু সব ধরনের চালের দামই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

দেশের প্রধান সারির চাল ব্যবসায়ী জয়পুরহাটের লায়েক আলী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘রাজধানী ছাড়া দেশের কোথাও চালের দাম বাড়েনি। দেশে চালের দাম বৃদ্ধির সংবাদটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। চালের দাম বৃদ্ধির কোনও সুযোগ নাই। যদি চালের দাম কোথাও বেড়ে থাকে তা বেড়েছে রাজধানীতে। আর এর জন্য দায়ী অসৎ ব্যবসায়ীরা। তারা সুযোগ বুঝেই চালের দাম বাড়িয়েছে অনৈতিক মুনাফার জন্য।’

লায়েক আলী জানতে চান, ‘৫৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হলো ২ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে। সেই ৫৬ লাখ টন চাল গেলো কোথায়। কারা এ চাল খেয়ে ফেলেছে? দেশে কি মানুষ এখন ২০ কোটি? আর যদি তা না হয় তাহলে কি চাল আমদানি সংক্রান্ত সরকারের দেওয়া তথ্যে গড়মিল রয়েছে? দেশে নাকি চালের বাম্পার ফলনও হয়েছে। তাহলে সেই বাম্পার ফলনের চাল বা গেলো কই? নাকি এ তথ্যও ভুল? সংশ্লিষ্টদেরই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। নতুবা আমদানি করা ৫৬ লাখ টন ও বাম্পার ফলনের সেই চাল খুঁজে বের করতে হবে। আর এর জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

জানা গেছে, বিশ্ববাজারে চালের বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রতি টনে ৩৫ ডলার কমে গেছে। বিশ্ববাজারে প্রতি টন চালের দাম ৪০০ ডলারের নিচে। ঠিক এই সময়ে দেশে মোটা চালের দাম ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশে বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় দুই কোটি টন। আমন উৎপাদন হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টন। চলতি মাস পর্যন্ত এক বছরে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ টন চাল।

সোয়া তিন কোটি টন চাহিদার বিপরীতে দেশে বছরজুড়ে চাল ছিল প্রায় চার কোটি টন। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি থাকার পরও দাম না কমে কেন বাড়ছে, তার কোনও সদুত্তর কারও কাছে নেই।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘চালের দাম বাড়েনি। যদি বেড়ে থাকে তা সাময়িক। কমে যাবে। এ নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নাই। আর দেশে মোটা চালের দাম কোথাও বাড়েনি। তা ক্রেতার ক্রয়সীমার মধ্যেই রয়েছে। সাংবাদিকরা কয়দিন পরপর খালি ঝামেলা করে।’

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech