সীমাহীন ভেজালের দৌরাত্ম্য সর্বত্র

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : ভেজাল চারদিকে, সর্বত্র। ভেজালের আধিক্য অবাক করার মতো। পদ-পদবী, খাবার থেকে যন্ত্র- সবকিছুতে ভেজাল। ভেজালের মধ্যেই আমাদের বসবাস। রমজানে খাবারে ভেজাল বেশি দৃষ্টি কাড়ছে। এককথায় সীমাহীন ভেজালের দৌরাত্ম্য সর্বত্র। আর আমরা এর মধ্যেই বেঁচে আছি।

খাদ্যদ্রব্যকে টাটকা, তরুতাজা রাখার জন্য ফরমালিনের অবাধ ব্যবহার বেড়ে গেছে। বাজারে গিয়ে খাদ্যদ্রব্য কিনতে গিয়ে মানুষ দুচিন্তায় পড়ছে। কী কিনবে, কোনটা কিনবে, ভেবে কূল পাচ্ছে না। মাস-গোশত, ভোজ্যতেল, শাক-সবজি, ফল, ওষুধ- কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছে না। ভেজালের রাজ্যে খাঁটি জিনিস মিলছে না। ফরমালিনের আধিক্য তাদের চিন্তার কারণ।

কদিন ধরে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো অপুষ্ট আম ও পচা খেজুর জব্দ করে নষ্ট করার খবর আসছে মিডিয়ায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের করা হচ্ছে জরিমানা। কিন্তু কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না মানুষের জীবন নাশকারী ও জটিল রোগের সৃষ্টির এ অনিয়ম। রাজধানীর প্রায় সর্বত্র অপুষ্ট আমের বাহারি কালারে চোখ পড়ছে। যেগুলো বিষে ভরপুর।

ফলসহ খাদ্যে ভেজাল নতুন নয়। পুরনো ঘটনা। সময়ে সময়ে দায়িত্বশীলদের তৎপরতা চোখে পড়ে। সব সময় এ তৎপরতা অব্যাহত থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল দেয়ার সাহস পেত না। অভিজ্ঞ মহলের মতে, ব্যাপারটি সব সময় নজরদারিতে থাকলে কেউ পণ্য অটুট রাখার জন্য অবৈধ পন্থা অবলম্বনের সাহস পেত না।

ফল পাকাতে এবং পচনশীল দ্রব্য অটুট রাখতে যে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, সেটা মানব দেহের জন্য যারপরনাই ক্ষতির কারণ। এতে বদ হজম থেকে শুরু করে কিডনি ড্যামেজ, চোখের রেটিনার কোষ ধ্বংস, লিভার অকেজো, ও হার্টের জটিল সমস্যা দেখা দেয়। জেনে-বুঝে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বিষয়টি গতি পাচ্ছে।

রমজানে রোজাদাররা ভালো ও খাঁটি খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ইফতার ও সেহরী গ্রহণ করবেন, সে বাস্তবতা উপস্থিত নেই খোদ রাজধানী ঢাকায়। খাবারের নামে মানুষ জেনে না জেনে প্রায় প্রতিনিয়ত বিষ গ্রহণ করছে। আর এর কুফলস্বরূপ ভোগ করছে জটিল-কঠিন রোগ। বাহারি ইফতারের নামে প্রকাশ্যে চলছে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর রঙের অবাধ ব্যবহার ও খানাপিনা।

বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতার অভাবে দ্রব্যমূল্য হু হু করে বাড়ছে। এক কেজি বেগুন ১৪০ টাকা। ভাবা যায়! এই বেগুন উৎপাদনকারী কৃষকের কাছ থেকে কত টাকায় ক্রয় করা হয়েছে, খোঁজ নিয়ে সমন্বয় করলে বাজারে পণ্যমূল্য ক্রেতাদের অতিষ্ঠ করে তুলত না। বাজার হতো না অস্থিতিশীল। এই সহজ বিষয়টি দেখার কেউ নেই। সব নামকাওয়াস্তে।

আমরা যখন ভেজাল নিয়ে অতিষ্ঠ, তখন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চস্তর সচিবালয়ে ভেজাল মুক্তিযোদ্ধা সবিচ পাওয়া যায়! একটি দেশের সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত বীরদের নিয়ে নোংরামি ও ভেজাল কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, চারজন সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ এর জ্বলন্ত প্রমাণ। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ না গিয়ে অবৈধ উপায়ে সার্টিফিকেট গ্রহণকারীদের বিচার কিন্তু হয়নি। আদৌ হবে কিনা, কেউ জানে না।

ব্যাংক খাতের ভেজাল ঢুকে গেছে। ফলে সরকারীসহ বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় ঢাকাত পড়েছে বললে কমই বলা হবে। পারিবারীকরণে এগুলোকে একধরনের লাইচেন্স দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত লুটেরারা দুর্নীতি করে পার পেয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যাংকও যুক্ত হয় এ তালিকায়। ব্যাংক খাত শুধু নয়, শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে পুরো অর্থখাত সীমাহীন ভেজালের দৌরাত্ম্যে দেউলিয়ার হওয়ার উপক্রম।

ভেজালের দৌরাত্ম্য যে সর্বত্র সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, পরিস্থিতি আমাদের সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম নেই। ফলে মনে করা হচ্ছে, জেনে-বুঝে আমরা এগুলো লালন করছি। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও অনিয়মের পাহাড় গড়ছি। পাপিষ্টদের শায়েস্তা না করার মধ্য দিয়ে তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছি। এমনটা চলতে থাকলে অর্থ খাত শুধু নয়, মানব উন্নয়ন খাতসহ সবকিছুতে দেউলিয়া স্পষ্ট হয়ে পড়তে বাধ্য। এমনটাই অভিমত অভিজনদের।

লেখক : বার্তা সম্পাদক- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech