রাশিয়া বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশি দালালদের মানব পাচারের ফাঁদ

  

পিএনএস ডেস্ক : রাশিয়ায় চলমান ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের দালাল চক্র। ইউরোপে প্রবেশদ্বার হিসেবে রাশিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছে তারা। মিথ্যা আশ্বাস আর ভুল তথ্য দিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাচার করছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো।

চলমান ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশি, রাশিয়ান ও ইউরোপীয় দালালেরা একজোট হয়ে গড়ে তুলেছে মানব পাচারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আর দালালদের লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশিরা রাশিয়ায় এসে এখন পড়েছেন মহাবিপদে। অবৈধ পথে ইউরোপ পাড়ি জমাতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি রাশিয়ায় পৌঁছান বলে জানা যায়। বেলারুশ ও ইউক্রেন সীমান্তে বাংলাদেশিদের আটক হওয়ার খবর প্রচার করছে ওই দেশের গণমাধ্যম। দালালদের সহযোগিতা নিয়ে রাশিয়ায় এসেছেন—এমন কয়েকজন বাংলাদেশি ও তাঁদের পরিবার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে রাশিয়া হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার বিপজ্জনক চিত্র উঠে আসে।

ঢাকায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে যাঁরা রাশিয়ায় যাচ্ছেন, তাঁদের নাম-পরিচয় রাখা হচ্ছে। যাঁরা ফিরছেন, তাঁদের হিসাবও রাখা হচ্ছে। ফিফার ফ্যান আইডি নিয়ে কতজন গেছেন বা ফিরেছেন, সেই হিসাব জানাতে না পারলেও ওই কর্মকর্তা বলছেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে সবাইকে ফিরতেই হবে। তখন জানা যাবে কেউ রাশিয়া বা অন্য কোথায় চলে গেছেন কি না।

রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফ্যান আইডি ব্যবহার করছে ফিফা। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের যেকোনো ম্যাচ স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখতে হলে টিকিটের পাশাপাশি ফ্যান আইডি থাকতে হবে। এই ফ্যান আইডি দিয়ে রাশিয়ায় ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করা যাচ্ছে। এ জন্য রুশ দূতাবাসকেও কোনো তথ্য জানানোর প্রয়োজন নেই। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ১০ দিন আগে ও বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আরও ১০ দিন পর্যন্ত ফ্যান আইডি দিয়ে রাশিয়ায় বৈধভাবে অবস্থান করা যাবে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়ায় মানব পাচার ব্যবসায় তৎপর হয়ে ওঠে বাংলাদেশের দালাল চক্র।

বিশ্বকাপের টিকিট কিনেছেন—এমন যে-কেউ অনলাইনে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ফ্যান আইডির জন্য আবেদন করতে পারছেন। বিনা মূল্যেই ফ্যান আইডি তৈরি করে তা আবার আবেদনকারীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে ফিফা। আর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যান আইডি বিতরণের এজেন্টের দায়িত্ব পালন করছে ভিএসএফ গ্লোবাল। মস্কোর ফ্যান আইডি সেন্টারে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী বলেন, গত ২১ জুন পর্যন্ত শুধু বাংলাদেশ থেকে ফ্যান আইডির জন্য ফিফার কাছে ২ হাজার ১৯৭টি আবেদন জমা পড়েছে। আর বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ফ্যান আইডির জন্য আবেদন এসেছে ৩ হাজার ৮৪০টি।

ফ্যান আইডি ব্যবহার করে রাশিয়ায় এসে অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার বিষয়টি ফিফার দৃষ্টিগোচরে এসেছে কি না, তা জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই রুশ কর্মী জানান, ফ্যান আইডি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ থেকে রাশিয়ায় মানব পাচারের জন্য লোক পাঠানো হচ্ছে। এদের অনেকেই আবার রাশিয়ায় থেকে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসছেন। ইতিমধ্যে ফিফার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বকাপ শেষ হলে রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকে বসতে পারে ফিফা।

একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, শুধু মস্কোতেই প্রায় ১০০ জন বাংলাদেশি হয়তো অবস্থান করছেন, যাঁরা কিনা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার নাম করে ফ্যান আইডি ব্যবহার করে রাশিয়ায় আসেন। সুযোগ পেলেই তাঁরা রওনা দেবেন স্বপ্নের ইউরোপের পথে।

রাশিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা যেভাবে শুরু
গত ১৮ জুন মস্কোগামী একটি ফ্লাইটে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া কয়েকজন দর্শকের। এঁদের কারও স্থায়ী ঠিকানা সিলেট, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায়। শারজা বিমানবন্দরে ট্রানজিটে দীর্ঘ সময়ে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বকাপ উপলক্ষে তাঁদের রাশিয়ায় আসার প্রস্তুতি শুরু হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে। ম্যাচের টিকিট কেনা কিংবা ফ্যান আইডির জন্য আবেদন করতে তাঁরা দালাল কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নেন। এ কারণে তাঁদের অনেককেই গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা।

সিলেটের মৌলভীবাজারের বাসিন্দা মিয়া শাহাজাহান। স্থানীয় একটি বাজারে তার মুদির দোকান ছিল। বিশ্বকাপের ম্যাচের এবং বিমানের টিকিটসহ সব মিলিয়ে রাশিয়ায় আসতে তার খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা। অনেকেই আবার আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকাও খরচ করে রাশিয়ায় আসেন।

এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করা শাহাজাহানকে ম্যাচের টিকিট কিনে দিতে ইংল্যান্ড থেকে সহযোগিতা করেছেন তাঁর এক আত্মীয়। ওই আত্মীয় ক্রেডিট কার্ড দিয়ে শাহাজাহানের জন্য টিকিট কেনা ও ফ্যান আইডির জন্য আবেদন করেন। এক থেকে দেড় মাস পরে শাহাজাহানের ফ্যান আইডি পৌঁছে যায় ঢাকার গুলশানের ভিএফএস গ্লোবালের অফিসে। ওই ফ্যান আইডি আর ম্যাচের টিকিট হাতে নিয়েই মস্কোগামী ফ্লাইট ধরেন শাহাজাহান।

শাহাজাহানের কাছে জানতে চাইলাম, কোন ম্যাচের টিকিট কিনেছেন? জবাবে জানালেন, আইসল্যান্ড ও নাইজেরিয়া। এবার জানতে চাইলাম, খেলা দেখতে ভলগাগ্রাদ যাবেন কি না? উত্তরে বললেন, খেলা দেখতে তো রাশিয়ায় আসিনি। এখান থেকে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করব কিংবা রাশিয়ায় থেকে যাব। শাহাজাহান জানেন না, ফ্যান আইডি দিয়ে রাশিয়ায় প্রবেশ করতে পারলেও বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে তাঁকে রাশিয়া ত্যাগ করতে হবে।

শাহাজাহান জানালেন, সিলেটের বিভিন্ন এলাকার বাংলাদেশিরা গত ৭ জুন থেকে রাশিয়ায় আসতে শুরু করেন এবং তাঁরা সবাই ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই মস্কো ঢুকেছেন। তাঁদের অনেককেই বিশ্বকাপের ম্যাচের টিকিট ও ফ্যান আইডি কিনতে সাহায্য করেছেন ইংল্যান্ডে থাকা আত্মীয়-স্বজন।

থাকার জায়গা যখন ইয়োথ হোস্টেল
ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশে রাশিয়ায় আসা বাংলাদেশিরা থাকার জন্য বেছে নিয়েছেন মস্কো নগরীর বিভিন্ন ইয়োথ হোস্টেল। অনলাইনে হোস্টেল বুকিং দেওয়ার সুযোগ থাকা আর অল্প খরচ হওয়ায় হোস্টেলেই তাঁদের রাখে দালালেরা।

জনপ্রিয় সাইট বুকিং ডটকমে অগ্রিম টাকা জমা দেওয়া ছাড়াই রাশিয়ায় আসার আগেই হোস্টেল বুকিং করে রাখে দালালেরা।

১৮ জুনের রাশিয়াগামী ফ্লাইটে থাকা সিলেটের শাহাজাহান কিংবা ময়মনসিংহের রাসেল খানের মতো ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকা এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের পরিচিত অনেকেই আগে থেকে মস্কোর বিভিন্ন হোস্টেলে উঠেছেন। মেসেজিং অ্যাপ ইমো কিংবা মেসেঞ্জারে দেশে থাকতেই তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো।

শাহাজাহানের দেওয়া তথ্যে খোঁজ পাওয়া যায় মস্কোর সোভোই লুদি নামের হোস্টেলের। মস্কো এসে এখানেই ওঠেন তিনি। মস্কোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওই হোস্টেলে গত ৭ জুন সিলেট থেকে আসা চার-পাঁচজন বাংলাদেশি অবস্থান নেন। হোস্টেলের এক রুমে ছয়জন, আটজন ও দশজনের বিছানা রয়েছে। এক দিনের সিটভাড়ার জন্য জনপ্রতি তাঁদের খরচ হয়েছে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।

এই হোস্টেল থেকেই পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন অনেকেই। পোল্যান্ড, ইউক্রেন কিংবা ইতালি যাওয়ার জন্য কেউ কেউ দালালও নাকি ঠিক করে ফেলেছেন বলে জানান শাহাজাহান।

যেতে হবে কালিনিনগ্রাদ
রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত বিশ্বকাপের ভেন্যু শহর কালিনিনগ্রাদ। পোল্যান্ড আর লিথুনিয়ার সীমান্তবর্তী এই শহরকে ইউরোপে প্রবেশদ্বার হিসেবে বেছে নিয়েছে মানব পাচারকারীরা।

মস্কো থেকে বিমানে কিংবা ট্রেনে করে কালিনিনগ্রাদে যাওয়া যায়। কিন্তু যাঁদের পাসপোর্টে সেনজেন ভিসা নেই, তাঁরা ট্রেনে চেপে কালিনিনগ্রাদ যেতে পারবেন না। কারণ, মস্কো থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত লিথুনিয়ায় ট্রানজিট নিয়ে কালিনিনগ্রাদ পৌঁছায়। বাংলাদেশি দর্শকেরা যাঁরা কালিনিনগ্রাদে খেলা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা যেন বিমানে অথবা সেনজেন ভিসা নিয়ে ট্রেনে ভ্রমণ করেন, এ-সংক্রান্ত একটা নির্দেশনা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশকে জানানো হয়। মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র বিষয়টিনিশ্চিত করেছে।

মস্কোতে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সালিম মোহাম্মদ জানান, কিছুদিন আগে কয়েকজন রুশ বাংলাদেশ থেকে আসা এক ব্যক্তিকে তাঁর দোকানে নিয়ে আসেন। ওই বাংলাদেশি কী চাইছেন, তা ইংরেজিতে ঠিকভাবে বোঝাতে পারছিলেন না। পরে বাংলায় তাঁর কাছ থেকে জানা গেল যে তিনি কালিনিনগ্রাদে যেতে চান। সেখান থেকে নাকি ইউরোপে যাওয়া যায়।
rassia
মানচিত্রে মানব পাচারের রুট।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের কানাইঘাটের বাসিন্দা জানান, তাঁর পরিচিত চারজন বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে ফ্যান আইডি দিয়ে রাশিয়ায় গেছেন। আরও বেশ কয়েকজন রাশিয়ায় আসার অপেক্ষা রয়েছে। তাঁদের সবার বাড়ি সিলেটে। রাশিয়ায় পৌঁছাতে দালালকে দিতে হয়েছে জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা আর ইউরোপে পৌঁছে দিতে পারলে আরও সাত লাখ টাকা দিতে হবে দালালকে। জানা যায়, তাঁদের সবাইকে প্রথমে রাশিয়ায় এনে মস্কোর একটি হোটেলে রাখা হয়। রাশিয়ার সীমান্ত পাড়ি দিতে তাঁদের এখন আনা হয়েছে কালিনিনগ্রাদে। সময়-সুযোগ পেলেই নাকি গাড়ি দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে তাঁদের তুলে দেওয়া হবে ইউরোপের দালাল চক্রের হাতে।

এদিকে ৩ জুলাই কালিনিনগ্রাদে তিনজন বাংলাদেশির আটক হওয়ার খবর পাওয়া যায়। মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কালিনিনগ্রাদের ডিপোর্ট সেন্টার থেকে বাংলাদেশিদের আটক হওয়ার একটি নথি দূতাবাসে পোঁছায় গত মঙ্গলবার। ওই তিনজনকে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য দূতাবাসকে আউটপাস (টিপি) ইস্যু করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

ইউক্রেন ও বেলারুশে আটক বাংলাদেশিরা
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই নিয়মিতভাবে রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের গণমাধ্যমে বাংলাদেশিদের আটক হওয়ার খবর আসছে। রাশিয়ায় বসবাসরত একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির কাছ থেকেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি ইউক্রেন আর বেলারুশের জেলহাজতে আটক আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে যানা যায়নি। একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, মস্কোর বিমানবন্দর থেকেও নাকি বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁরা কেউ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের বলতে পারেননি যে কোথায় এবং কোন দলের খেলা দেখতে রাশিয়া যাচ্ছেন।

অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি আটক হয়েছে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ায় আসা বিদেশি দর্শকেরা সহজেই বেলারুশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারছেন। গত মে মাসের শেষের দিকে রাশিয়া ও বেলারুশ দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। এতে বলা হয়, ফ্যান আইডি নিয়ে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে রাশিয়ায় আসা বিদেশিরা ভিসা ছাড়াই বেলারুশে প্রবেশ করতে পারবেন।

মস্কোর এক প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে ইউক্রেনে আটক হওয়া পাঁচ বাংলাদেশির খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় আসা পাঁচ তরুণ অবৈধভাবে ইউক্রেনে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁদের আটক করে ইউক্রেনের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। আটক হওয়া ওই পাঁচ বাংলাদেশির সবার বাড়ি সিলেটে। তাঁরা বিশ্বকাপের খেলা দেখার নাম করে রাশিয়ায় আসেন।

গত ১৪ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে কোনো এক দিন তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে আটক করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাংলাদেশি জানান, ওই পাঁচজনের মধ্যে একজনের বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ইউক্রেনে বাংলাদেশিদের আটক হওয়ার খবর জানতে পারি। প্রবাসী ওই বাংলাদেশির কাছে আটক হওয়া পাঁচজনের একটি ছবিও রয়েছে। তাতে দেখা যায়, পাঁচ বাংলাদেশি সারিবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাঁদের ঘিরে রেখেছে ইউক্রেনের সীমান্তরক্ষীরা। বর্তমানে তাঁরা ইউক্রেনের কোথায় আছে, সে বিষয়ে তাঁদের পরিবার কিছুই জানে না।

বেলারুশের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওএনটে ও রাশিয়ার স্পুৎনিক বার্তা সংস্থার বেলারুশ সংস্করণের অনলাইন থেকে আরও তিনজন বাংলাদেশির আটক হওয়ার ভিডিও এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে। ১ জুলাই চ্যানেল ওএনটেতে বাংলাদেশিদের আটক হওয়াসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। এতে দেখা যায়, ২৭ জুন তিনজন বাংলাদেশিকে নিয়ে বিএমডব্লিউ ব্রান্ডের একটি প্রাইভেটকার বেলারুশের রাজধানী মিনস্ক থেকে লিথুনিয়া সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় বেলারুশের অপরাধ দমনবিষয়ক স্পেশাল ফোর্স কোবরা বাহিনী অভিযান চালিয়ে মোট পাঁচ বিদেশিকে আটক করে। মুহূর্তেই তাঁদের গাড়ি থেকে বের করে এনে রাস্তায় উপুড় করে শুয়ে ফেলে পেছন থেকে হাত বেঁধে ফেলা হয়। আটককারীদের মধ্যে একজন গাড়িচালক, একজন মানব পাচারকারী ও বাকি তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক। আটক হওয়া ওই তিন বাংলাদেশি হলেন রিসুল আহমেদ, ইকবাল ও ফয়সাল আহমেদ। মানব পাচারকারীর কাছে তিন হাজার ডলার ও ৩ হাজার ৪০০ ইউরো উদ্ধার করা করে কোবরা বাহিনী।

বেলারুশ হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা না করতে বিদেশিদের সতর্ক করেছে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী। পোল্যান্ড-বেলারুশের ব্রেস্ট সীমান্তের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইউরি গারদিয়েভিচ টেলিভিশন চ্যানেল ওএনটেকে বলেন, আইন অমান্য করে বেলারুশের সীমান্ত দিয়ে ইউরোপে ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। দয়া করে আপনারা এমন চেষ্টাও করবেন না।

এদিকে গত ৩০ জুন রাশিয়ার সংবাদপত্র রাসিস্কায়া গাজেটা থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরে বেলারুশ থেকে পোল্যান্ডে অবৈধভাবে ঢোকার চেষ্টা করলে আরও দুই বাংলাদেশি আটক হন। আর বেলারুশের গ্রোদনেন অঞ্চলের বেলইয়ান এলাকা থেকে আরও চারজন বাংলাদেশিকে আটক করে বেলারুশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। আটক হওয়া বাংলাদেশিরা বিশ্বকাপের ফ্যান আইডি দিয়ে রাশিয়ায় ঢোকেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে বেলারুশ। জানা যায়, বড় অঙ্কের টাকা জরিমানা দেওয়া ছাড়াও তাঁদের পাঁচ বছরের জন্য বেলারুশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

এদিকে বেলারুশের গণমাধ্যম থেকে কয়েক দিন ধরে অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার পথে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটক হওয়ার খবর জানা যায়। বাংলাদেশি ছাড়াও নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মরক্কো ও আলজেরিয়ার নাগরিকেরা বেলারুশের সীমান্তে ধরা পড়েছেন বলে খবরে বলা হয়।

বিশ্বকাপ শেষে চিরুনি অভিযান
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে রাজধানী মস্কোসহ প্রতিটি ভেন্যু শহরে সাঁড়াশি অভিযান চালায় রাশিয়ার পুলিশ। এ সময় অনেক অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়। জানা যায়, স্টুডেন্ট ভিসায় মস্কো এসে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই কাজ করছেন—এমন সাতজন বাংলাদেশিকে রাশিয়া ত্যাগ করার আদেশ দিয়েছেন এখানকার আদালত।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরপরই রাশিয়াজুড়ে আবারও চিরুনি তল্লাশি চালাবে রাশিয়ার পুলিশ প্রশাসন।-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech