ফেসবুকে চার কন্যার গুজবে কাঁপছে দেশ!

  

পিএনএস ডেস্ক : সড়কে নিরাপত্তা দাবির আন্দোলনের সপ্তমদিন অর্থাৎ শনিবার দুপুরে রাজধানীর রাস্তায় শিক্ষার্থীরা যখন যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তল্লাশির কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে কমপক্ষে ৮টি ভিডিও। এসব ভিডিওতে ধানমন্ডি জিকাতলার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই তরুণ আর কয়েকজন তরুণী দাবি করেন ওই এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছে আর ছাত্রীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এসব ভিডিও’র মধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়া চার কন্যার আকুতি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে এবং চার কন্যার ভিডিও ভাইরাল হয়।

ভিডিওগুলোর কয়েকটিতে দাবি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুইজন মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং রেপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও কিছু ভিডিওতে জিগাতলার সংঘর্ষে প্রাথমিকভাবে দুইজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয় । কয়েকটি ভিডিওতে জানানো হয়েছে, নিহত হয়েছেন চারজন।

গুজব ছড়ানো আলোচিত চার কন্যার মধ্যে চেনা মুখ ছিলেন অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ। তিনি তার লাইভ ভিডিওতে দাবি করেন, একজনের চোখ তুলে নেয়া হয়েছে এবং দুইজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ সময় তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে সবাইকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভিডিওটিই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করে। আর গুজব তৈরিতে ভূমিকা রাখা অন্য তিনটি ভিডিওতে তিন তরুণীকে দেখা যায় মুখ ঢেকে কথা বলতে। এদের মধ্যে আবার দুজনের পরনে ছিল সাদা কলেজ ইউনিফর্ম এবং অন্যজন ছিলেন গোলাপি রঙের সিভিল ড্রেসে।

ফেসবুক ভিডিওতে তাদের দাবির সত্যতা নিশ্চিত না হয়েই সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীরা হামলা চালান ধানমন্ডি ৩/এ তে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে। ঘটতে থাকে পাল্টা হামলা-ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ঘটনা। সন্ধ্যায় সব উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ছাত্রদের দুটি প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগ কার্যালয় ঘুরে এসে জানান, সবই গুজব ছিল। এটিও নিশ্চিত হয়, প্রপাগাণ্ডার মাধ্যমে নৈরাজ্য ও নাশকতার তৈরির পাঁয়তারা থেকেই পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এইসব গুজব ছড়ানো হয়েছে।

গুজবের মাধ্যমে নাশকতা তৈরির উসকানি দেওয়া চার কন্যার মধ্যে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদকে আটক করা হয়। শনিবার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উত্তরার র‍্যাব-১ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোর আলোচিত বাকি তিন কন্যাসহ মোট আটজনকে শনাক্ত করে তাদের পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা করছে গোয়েন্দাদের একাধিক দল।

এর আগে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ফেসবুকের ইনবক্সে ও ম্যাসেঞ্জারে ঝড়োগতিতে জনে জনে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। বার্তাটি ছিল এমন- ‘আগামী রবিবার মন্ত্রী এমপিরা ১০০০-১৫০০ বস্তির ছেলেকে রাস্তায় নামাবে। যাদের কাজ হবে মেয়েদেরকে যৌন নির্যাতন করা, গাড়ি ভাঙা, গাড়িতে আগুন দেওয়া। আর এই ঘটনার প্রতিবাদে পুলিশ সাধারণ ছাত্রদের উপর আক্রমণ চালাবে। ফলাফল ছাত্রদের উপর সাধারণ মানুষ ক্ষেপবে।অনুগ্রহপূর্বক নিউজটি ম্যাসেজের মাধ্যমে শেয়ার করবেন। কোনপ্রকার পোষ্ট দিবেন না। সুত্র : একজন সাংবাদিক এবং এক মন্ত্রীর খুব কাছের একজন’।

গোয়েন্দাদের ধারণা, সচেতন মানুষেরা এই বার্তাটিকে গুরুত্ব না দিলেও রাজধানীর জিগাতলায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে যে গুজবটি তুলকালাম তৈরি করে তা ছিল একই সূত্রে গাঁথা। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এ বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত তারা। বার্তা অনুযায়ী রোববার উল্লেখ করে শনিবারই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার দুইটি কারণ অনুমান করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রথম কারণটি হলো, বৃহস্পতিবার থেকেই ব্যবহারকাীরা ইন্টানেটের ধীর গতি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। এরই মধ্যে ফেসবুক বন্ধ করা হচ্ছে বলে রটনাও ছড়িয়ে পড়ে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্লাটফর্ম যেহেতু ফেসবুক, তাই তড়িঘড়ি করে একদিন আগেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে গুজব ছড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে. পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারি এড়াতে রোববারের কথা ছড়িয়ে শনিবারই গুজবের মাধ্যমে উসকানি দিয়ে নাশকতা ও নৈরাজ্য তৈরিতে চেষ্টা করা হয়।

র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতার। এরই মধ্যে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ করছে র‌্যাবসহ গোয়েন্দাদের একাধিক টিম। তদন্ত চলছে, তাই আপাতত এটুকুর বেশি বলা সম্ভব নয়।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শান্তিপুর্ণ আন্দোলনের শুরু থেকেই গুজব রটনাকারীরা সক্রিয়। তিন বছর আগের পুরনো ছবিও তারা এই আন্দোলনের বলে চালিয়ে দিচ্ছে। আর ওইসব ছবি আর প্রপাগান্ডা শুনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন অনেকেই। সপ্তম দিন শনিবার আন্দোলনকে সহিংসরূপ দিতে পূর্ব পরিকল্পতভাবে হত্যা ও ধর্ষণের সবচেয়ে বড় গুজবটি রটানো হয়।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনকে সহিংস রূপ দিতে যে ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়েছে তার মধ্যে অন্তত তিনটির উৎস হলো মৌলবাদীদের চিহ্নিত ফেসবুক পেইজ ‘বাঁশের কেল্লা’। দিন দিন অপপ্রচারের মাধ্যমে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা এই ফেসবুক পেজটি বিটিআরসি একাধিকবার বন্ধ করে দেয়ার পরও কোন লাভ হয়নি। কারণ বন্ধ করার অল্প সময়ের মধ্যেই শিবিরের লোকজন আবার একই নামে একটি করে নতুন পাতা চালু করে ফেলছে। দেশে-বিদেশে সহস্রাধিক এডমিন হিসাবে বাঁশের কেল্লার বিভিন্ন পেইজে বা সাইটে সার্বক্ষণিক কাজ করছে। তাদের সঙ্গে পাকিস্তান, তুর্র্কি ও ইন্দোনেশিয়ার সাইবার আর্মি একযোগে কাজ করছে। লন্ডন থেকে জামায়াত শিবিরের যে ফ্যান পেজটি পরিচালিত হয় তার নাম ইউকে বাঁশের কেল্লা।

বাঁশের কেল্লা সাইট থেকে নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়টি নিয়ে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের সাইট কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই বিষয়টি কোনভাবেই নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। কারণ দেশের বাইরে থেকে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের উসকানিদাতা হিসেবে ২৮টি ফেসবুক ও টুইটার আইডি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব আইডির মালিক ও অ্যাডমিনদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ।

এ ঘটনায় গত ২ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ। এজাহারে যেসব ফেসবুক আইডি ও পেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, বাংলামেইল৭১, বাঁশেরকেল্লা, ফাইট ফর সারভাইভার্স রাইট, জুম বাংলা নিউজ পোর্টাল, বিএনপি সমর্থক গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ, অ্যাক্সিডেন্ট নিউজ, ফাঁকিবাজ লিংক, আন্দোলন নিউজ। এছাড়া টু্ইটার আইডিগুলো হচ্ছে- রানা মাসুম-১ , নওরিন-০৭, দিপু খান বিএনপি, ইদ্রিস হোসেইন, এম আল আমিন-৯৯, বিপ্লবী কাজী, নাসিফ ওয়াহিদ ফায়জাল।

পুলিশের মিডিয়া উইং থেকে বার বার অনুরোধ করা হচ্ছে , না জেনে এবং সত্যতা নিশ্চিত না করে এ ধরণের ভিডিও শেয়ার না করার জন্য। অকারণ পেনিক সৃষ্টির জন্য পরবর্তীতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech