দুর্দিন শুরু হয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে - অর্থনীতি - Premier News Syndicate Limited (PNS)

দুর্দিন শুরু হয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে

  


পিএনএস ডেস্ক: দুর্দিন শুরু হয়েছে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারনির্ভর এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে চরম তহবিল সঙ্কট। আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে তহবিল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। এ সঙ্কট মেটাতে বর্তমান বাজারের তুলনায় উচ্চ সুদেও তহবিল জোগাড় করতে পারছে না কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। সামনে এ সঙ্কট আরো প্রকট আকার ধারণ করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীরা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়োশনের (বিএলএফসিএ) নব মনোনীত কর্মকর্তারা গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সাথে সাক্ষাৎ করে এ অনুরোধ জানিয়েছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিদের নেতৃত্ব দেন বিএলএফসিএ চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো: খলিলুর রহমান। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি গতকাল জানিয়েছেন, বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলছে চরম তহবিল সঙ্কট। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের প্রধান উৎস ব্যাংকিং খাতে তহবিল সঙ্কট শুরু হওয়ার পর তাদের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কিছুদিন আগেও ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত তহবিল বিনিয়োগ করতে না পারায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ধরনা দিত। বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর তহবিল উদ্বৃত্ত ছিল। তখন ব্যাংকগুলো লোকসান কমাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধার দিত। তাতে সুদ হার কমে তলানিতে নেমে যায়।

যেখানে কলমানি মার্কেট থেকে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে ধার নেয়া যেত, তখন কোনো কোনো ব্যাংকের পীড়াপীড়িতে ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করা হতো ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। অনেক সময় কম সুদের আমানত নিয়ে বেশি সুদের আমানত পরিশোধ করত। কিন্তু এখন হচ্ছে এর উল্টো। ব্যাংকিং খাতে আমানত কমায় অনেক ব্যাংকেরই এখন তহবিল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেক ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাখা তহবিল প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদেও আমানত পাচ্ছে না। বেশি সুদ দিয়ে এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে। বছর খানেক আগেও যেখানে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করা যেত, এখন কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে। আমানত সংগ্রহে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে তা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। এ বিষয়টিকেই গভর্নরের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ব্যাংকে আমানতের গড় সুদহার কমতে কমতে গত সেপ্টম্বরের ৪ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে গেছে। ওই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৫ দশমিক ১২ শতাংশ। শুধু মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত আমানতের সুদহার ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে সরকার সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছে জনগণের কাছ থেকে।

ব্যাংকের আমানতের সুদহার তলানিতে নেমে যাওয়ায় আমনতকারীরা ব্যাংকে অর্থ রাখতে নিরুৎসাহিত হয়ে অধিক মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করছে সঞ্চয়পত্রে। কেউ কেউ আবার সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি অধিক মুনাফার জন্য পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, আগস্টে ব্যাংকব্যবস্থায় আমানতের প্রবৃদ্ধি নেমেছে ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ।

সামনে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নানামুখী সঙ্কট দেখা দেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিপরীতক্রমে ঋণের প্রবৃদ্ধি দিন দিন বেড়ে চলছে। অক্টোবরে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৯ শতাংশের কাছাকাছি চলে গেছে, যেখানে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা থাকলেও এটা হচ্ছে উল্টো, যা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। কারণ, নিয়মানুযায়ী যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হচ্ছে, তা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না।

ঋণের অর্থ হয় হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে, না হয় গ্রাহক ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছে। অর্থাৎ সঠিক কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঋণ সঠিক কাজে ব্যবহার না হওয়ায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আর আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে, তারল্য কমে যাচ্ছে। বছরের শুরুতেও যেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ছিল, বছরের শেষ সময়ে এসে তা ৭০ হাজার কোটি টাকায় নেমে গেছে, যার বেশির ভাগই সরকারের কোষাগারে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য আটকে গেছে।

ইতোমধ্যে টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। গত বুধবার একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সুদহার তার কাছে এখন মুখ্য বিষয় নয়, তার দরকার নগদ টাকা। প্রয়োজন মেটাতে তিনি ১৫-১৬ শতাংশ হারেও তহবিল সংগ্রহ করতে রাজি আছেন। একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জোর করে টাকা রাখা হতো, এখন তারই টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিরা গতকাল তহবিল সঙ্কট মেটাতে গভর্নরের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তারা বিকল্প হিসেবে কর রেয়াত সুবিধায় বন্ড ছাড়ার অনুমোতি চেয়েছেন। পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় গৃহায়ণ তহবিল আবার চালু করার বিষয়ে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ৯ শতাংশ সুদে ফ্যাট কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছিল। সূত্র: নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech