জনতা ব্যাংকে আবারও বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ফাঁস! - অর্থনীতি - Premier News Syndicate Limited (PNS)

জনতা ব্যাংকে আবারও বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ফাঁস!

  

পিএনএস ডেস্ক : জনতা ব্যাংকে আবারও বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। এবার ভুয়া রপ্তানি নথিপত্র তৈরি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। এভাবে সরকারের নগদ সহায়তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা নিয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

অপকর্মে সহায়তা করার পাশাপাশি ক্রিসেন্ট গ্রুপকে অর্থায়নও করেছে জনতা ব্যাংক। ক্রিসেন্টের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। বিদেশে রপ্তানির ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা আটকা রয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রুপটি সরকারি ব্যাংক ও সরকারের তহবিল থেকে মাত্র পাঁচ বছরেই নিয়ে নিয়েছে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০১৩ সাল থেকে এসব অনিয়মের শুরু।

খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, গ্রাহক তিনভাবে এর সুবিধা ভোগ করেছেন। রপ্তানি বিলের টাকা বিদেশে রেখে দিয়েছেন। ব্যাংক সেই বিল কিনে গ্রাহককে নগদ টাকা দিয়েছে। আবার এসব রপ্তানির বিপরীতে সরকার থেকে নগদ সহায়তাও নিয়েছে গ্রাহক।

জনতা ব্যাংক ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার মাধ্যমে এত সব জালিয়াতি হয়েছে। শাখাটির মোট ঋণের ৯৮ শতাংশই এ গ্রুপের কাছে আটকা। যার সবই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাদুকাসহ চামড়াজাত পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

জনতা ব্যাংকের নিজস্ব অনুসন্ধান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ও
একটি দৈনিকের অনুসন্ধানে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ব্যাংক ও গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

এর আগে এক গ্রাহককেই নিয়ম লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংকের ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা দেওয়ার খবর দিয়েছিল একটি দৈনিক। আবারও একই ব্যাংকের নতুন এক কেলেঙ্কারির খবর মিলল।

যেভাবে জালিয়াতি
কাগজে-কলমে ক্রিসেন্ট গ্রুপ চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করেছে হংকং ও ব্যাংককে। সেই রপ্তানি বিল ক্রয় করে গ্রুপটিকে নগদে টাকা দিয়েছে ব্যাংক। এখন রপ্তানির টাকা ফেরত আসছে না। ব্যাংক চাপ দেওয়ায় মাঝে মাঝে কিছু অর্থ আসছে দুবাই থেকে। যদিও আমদানিকারক দেশ থেকেই টাকা আসার কথা।

তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সরকার থেকে নেওয়া নগদ সহায়তার টাকা দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছে গ্রুপটি।

জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় গ্রাহক বলতে ক্রিসেন্ট গ্রুপ একাই। শাখাটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংকের রক্ষিত মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কোনো গ্রুপকে অর্থায়ন করা যায় না। কিন্তু ব্যাংকটির শাখা থেকে ঋণ হিসেবে গেছে মূলধনের ৫৫ শতাংশ।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, রূপালী কম্পোজিট লেদার, লেক্সকো লিমিটেড, গ্লোরী এগ্রোর কর্ণধার এম এ কাদের। আর রিমেক্স ফুটওয়্যার নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তাঁর ভাই এম এম আজিজ।

রপ্তানির টাকা ফেরত না আসার বিষয়ে গ্রুপটির কর্ণধার এম এ কাদের ১৭ জুলাই বলেন, হাজারীবাগ থেকে সময়মতো ট্যানারি স্থানান্তর না করায় কারখানার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ কারণে সময়মতো চামড়া রপ্তানি করা যায়নি। ফলে ১ হাজার ২০০ কোটির বেশি টাকা বিদেশে আটকে আছে। চেষ্টা চলছে টাকা ফিরিয়ে আনার। এ জন্য দেড়-দুই বছর সময় লাগবে।

এম এ কাদের আরও জানান, হংকংয়ের প্রতিষ্ঠান চামড়া নিয়ে অন্য দেশে বিক্রি করেছে। এ জন্য অন্য দেশ থেকে টাকা আসছে। তা ছাড়া তাঁর ভাই কোনোভাবে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। আগে নামে ছিল, এখন বাবার পুরো ব্যবসা তিনি একাই দেখভাল করেন।

এত টাকা গেল কোথায়
গ্রুপটির রপ্তানির ৫৭৭টি বিলের টাকা দেশে ফেরত আসেনি। যার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ২৯৫ কোটি। এসব রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই কিনেছে হংকং ও থাইল্যান্ডের ৯টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন বাংলাদেশিরা। আবার পণ্য হংকংয়ে পাঠানো হলেও রপ্তানি বিল পাঠানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমদানি করা এসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া। রপ্তানি ভর্তুকির টাকা অবৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে নিয়ে ফেরত এনেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

এদিকে, ব্যাংকটির ইমামগঞ্জ শাখার ভোল্টের সীমা ৩ কোটি টাকা। এ জন্য গ্রাহকের হিসাবে যাওয়া টাকা উত্তোলনে ব্যবহার করা হতো প্রধান কার্যালয়ের পাশের স্থানীয় শাখাকে। সব অর্থই নগদে তুলে নিয়েছে গ্রাহক। এসব টাকার একটা অংশ গেছে শেয়ারবাজার, স্পিনিং মিল ও আবাসন প্রতিষ্ঠানে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইমামগঞ্জ শাখায় ৮১ কোটি টাকা জমা হলে সেদিনেই বেসরকারি খাতের আরেকটি ব্যাংকের সাতমসজিদ রোড শাখার ক্রিসেন্ট গ্রুপের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এ হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে এইমস অ্যান্ড গ্রামীণ ওয়ানের শেয়ার কেনা হয়।

এ ছাড়া ইমামগঞ্জ শাখা থেকে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্রাহকের হিসাব থেকে কয়েক দফায় টাকা গেছে দুটি স্পিনিং মিল, একটি বিমা কোম্পানি, একটি শেয়ার লেনদেনকারী কোম্পানি ও সাতটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।

এম এ কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রপ্তানি সহায়তা ও ব্যাংকের টাকা দিয়ে সাভারে ১৩টি কোম্পানি করেছি। কোনো টাকা অপচয় করিনি। আমাকে একটু সময় দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। নগদ টাকা দিয়ে চামড়া কেনা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া হয়েছে, এর সবই ব্যবসায়িক। কোথাও দোকান করতে টাকা দেওয়া হয়েছে, কিছু টাকা শেয়ারেও গেছে।

দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন
২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন আবদুস সালাম। তাঁর মেয়াদেই সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়। ১৫ জুলাই তিনি বলেন, ‘আমার সময়ে রপ্তানির বেশির ভাগ টাকা ফেরত এসেছে। ২০০ কোটি টাকার মতো বাকি আছে। মেয়াদের শেষ সময়ে হজে থাকাকালে ও মেয়াদের পরে যেসব রপ্তানি হয়েছে, তা নিয়েই সমস্যা হয়েছে। শাখা ব্যবস্থাপক নিজেই এসব অপকর্ম করেছেন।’

তাঁর সময়ে রপ্তানি বিল শাখার দায়িত্বে ছিলেন ডিএমডি মোহাম্মদ ফখরুল আলম। গত ১২ জুন ফখরুল আলমকে কৃষি ব্যাংকে বদলি করে সরকার। ৪ জুলাই কৃষি ব্যাংকে নিজ কার্যালয়ে বসে ফখরুল আলম বলেন, ‘যা কিছু হয়েছে, সবই শাখার কর্মকর্তারা করেছেন। আমি শুধু পর্ষদ ও এমডির নির্দেশনা পালন করেছি।’

২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে আব্দুছ ছালাম আজাদ। চলতি মাসে একাধিক দিন এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এই প্রতিবেদক। সবশেষ ১৫ জুলাই তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো রপ্তানি বিলের অর্থ দেশে আসছে না। টাকা আনতে সংশ্লিষ্ট শাখা গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। দায়ের সবই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আর ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে চেয়ারম্যান হন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। গত ৭ ডিসেম্বর তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। ১৫ জুলাই তিনি বলেন, ‘এসব তো পর্ষদে আসে না। এমডি, ডিএমডি পর্যায়েই বিল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এসবের কিছুই আমি জানি না।’

তাঁদের সময়ে ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবলীগ নেতা আবু নাসের প্রমুখ।

ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখার কর্মকর্তারাও এর সুবিধা পেয়েছেন। শাখার কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের চিত্র পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৫-১৭ সালে শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বে থাকা রেজাউল করিমের ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতার বাইরে ৬০ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলনের চিত্র পাওয়া গেছে।

ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
জালিয়াতির মাধ্যমে ক্রিসেন্ট গ্রুপকে সহায়তা করার দায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ১০ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে জনতা ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে আর নগদ সহায়তার ৪০৮ কোটি টাকা কেটে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার বৈদেশিক ব্যবসার লাইসেন্স (এডি লাইসেন্স) স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এসব অনিয়মের মূল কারণ হলো, আগের দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech