বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যেসব দেশ থেকে কয়লা আনা হবে!

  

পিএনএস ডেস্ক :বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দ্রুত কয়লা আমদানি করতে কাজ শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ জন্য গঠিত কমিটি কাজও শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানির কথা ভাবা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে কয়লা আমদানি ও পরিবহন খুব বেশি সহজ কাজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড়পুকুরিয়া খনির উত্তোলিত কয়লার মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়টি হঠাৎ ধরা পড়লে সেখানকার ৫২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট চালু রাখতে এখন বিকল্প হিসেবে কয়লা আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ১২ সদস্যের কমিটি কাজ শুরু করছে। কমিটি সংকট নিরসনে আমদানির পদ্ধতি ঠিক করবে। কয়লা কেনা ও পরিবহনের বিষয়েও সুপারিশ করবে।

এ কমিটি গতকাল রোববার প্রথম বৈঠক করে। জানতে চাইলে কমিটির প্রধান ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহাবুবুর রহমান জানান, শুরুতে উৎস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কীভাবে আমদানি ও পরিবহন করা হবে- সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে আমদানির কাজটি খুব দ্রুত ও সহজ হবে না বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, ভারতের কয়লায় সালফারের পরিমাণ বেশি বলে তা দিয়ে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগে একবার দেশটির কয়লা ব্যবহার করা হলেও তা দিয়ে বেশি দিন এ কেন্দ্র চালানো যায়নি। তাই অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রবন্দর থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত কয়লা পরিবহন খুবই কষ্টসাধ্য। কেননা এখন পর্যন্ত কয়লা পরিবহনের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। দ্রুত আমদানির ক্ষেত্রে এসব বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সাধারণত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি নির্দিষ্ট খনির কয়লার উপাদানের সঙ্গে মিল রেখে নকশা করা হয়। তাই চাইলেই যে কোনো কয়লা এতে ব্যবহার করা যায় না। এর আগে একবার কয়লার সংকট দেখা দিলে ভারত থেকে আমদানি করে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রেটি চালানো হয়েছিল। এতে কেন্দ্রের বয়লারসহ অনেক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিব আহমদ কায়কাউস বলেন, এমন খনি থেকে কয়লা আমদানি করা হবে, যেটির সঙ্গে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার সাদৃশ্য রয়েছে।

বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার দহন দক্ষতা (ক্যালোরিফিক ভ্যালু) প্রতি কেজিতে ২৫ দশমিক ৬৮ মিলিজুলস বা ৬ হাজার ৭২ কিলোক্যালোরি। এতে রয়েছে শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ সালফার, ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ অ্যাশ, ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ ভোলাটাইল ম্যাটার, আর্দ্রতা ১০ শতাংশ ও ফিক্সড কার্বন ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ।

এসব বিষয় বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে তিন দেশ থেকে কয়লা আমদানি করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। অস্ট্রেলিয়ার ৫১ শতাংশ কয়লা উন্নতমানের। পরিবহন ব্যয় কম হলেও ইন্দোনেশিয়ার কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু কম ও আর্দ্রতা বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার ৯৬ শতাংশ উন্নতমানের। সালফারের উপস্থিতি এক শতাংশের নিচে।

বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিট একসঙ্গে চালাতে প্রতিদিন পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পোড়াতে হয়। এখন একটি ইউনিট সংস্কারের জন্য বন্ধ থাকায় প্রতিদিন চার হাজার টন প্রয়োজন। এক মাসের জন্য কেন্দ্র চালাতে কমপক্ষে এক লাখ ২০ হাজার টন কয়লা আমদানি করতে হবে।

এত বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানির পর দিনাজপুর পর্যন্ত কীভাবে পরিবহন করা হবে তা নিয়েও আলোচনা শুরু করেছেন সংশ্নিষ্টরা। কেননা কয়লা পরিবহনের জন্য অবকাঠামো এখনও সেভাবে প্রস্তুত নয়। সাধারণত ২০০ মিটারের জাহাজ ৫০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পরিবহন করতে পারে। এ জন্য বন্দরের কাছাকাছি সাগরে ১০ মিটার গভীরতা থাকা উচিত। ৩০০ মিটার লম্বা জাহাজ ব্যবহার করলে ৮০ হাজার টন কয়লা আনা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে ১২ মিটার গভীরতা থাকতে হবে। আর ৩৫০ থেকে ৪০০ মিটার লম্বা জাহাজে কয়লা আনলে একসঙ্গে দেড় লাখ টন কয়লা আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে সাগরে ১৬ মিটার গভীরতা প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরের গভীরতা এবং রেল দিয়ে পরিবহনের কথা ভাবলে চট্টগ্রাম বন্দর কয়লা আমদানির জন্য উপযুক্ত। চট্টগ্রাম থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত রেলে করে তা পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মোংলা বা পায়রাবন্দর দিয়ে আমদানি করা হলে নৌপথে কয়লা পরিহনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে বন্দরই ব্যবহার করা হোক না কেন, গভীর সমুদ্র থেকে লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা খালাস করতে হবে। তবে মোংলা ও পায়রা এলাকায় লাইটারেজ জাহাজ রাখাও অনেকটাই দুরূহ বলে সংশ্নিষ্টরা মনে করেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বড়পুকুরিয়া থেকে প্রতিটন কয়লা কিনতে সর্বশেষ হিসাবে পিডিবির ব্যয় হয় টনপ্রতি ১৩০ ডলার। আমদানির ক্ষেত্রে এ দাম প্রায় কাছাকাছি হবে বলে ধারণা করছেন তারা।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech