কৃষিঋণে বেসরকারি ব্যাংকের অনীহা, সরকারিতে হয়রানি

  

পিএনএস (আহমেদ জামিল) : কৃষিঋণে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনামূলক নজর কম। সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮ শতাংশ ঋণ কৃষিতে, সেখানে বেসরকারি ব্যাংকের হার ২ শতাংশের কম। যদিও কৃষিতে তুলনামূলক খেলাপী ঋণ অনেক কম। সেক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোতেও অনেক ভোগান্তি পেতে হয় কৃষকদের চলমান ভোগান্তি লাঘব করে সহজ সর্তে ঋণ বিতরণ কার্যকম চালু করা প্রয়োজন।

বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি উন্নয়নের জন্য নানা মুখি কর্মসূচি গ্রহণ করলে সরকারি ব্যাংকগুলোর কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে আসল কৃষককে ঋণ না দিয়ে অনেক জায়গায় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আবার বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও ঋণের পরিমাণ ২ শতাংশের কম। কৃষিঋণের ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও সরকারের কোনো চাপ নেই। বড় ঋণের ১০ শতাংশ খেলাপী হয়ে যায়, এটি নিয়ে ব্যাংকগুলোর ভাবনা কম। কিন্তু মোট ঋণের দুই শতাংশ কৃষিঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের আপত্তি।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ২৯ অক্টোবর এক গবেষণায়ও এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। ‘অ্যাড্রেসিং এগ্রিকালসার থ্রো ভ্যালু চেইন ফাইন্যান্সিং- হাউ টু অ্যাট্রাক্ট ব্যাংকস’ শীর্ষক কর্মশালায় এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। ২৪টি ব্যাংকের তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে বিআইবিএম।

বেসরকারি ব্যাংকে কৃষিঋণের পরিমাণ ২ শতাংশের কম!
এ বিষয়ে দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক পিএনএসকে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষি ঋণের দিকে ঝুঁকতে চায় না। সাধারণত কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে হয়ে থাকে এবং সুদের হারও কম রাখতে হয়। এছাড়া কৃষিঋণের জন্য গ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত শাখাও নেই বেসরকারি ব্যাংকের। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি ব্যাংকে কৃষি ঋণের জন্য বাধ্যবাধকতা থাকলেও নজরদারির অভাবে ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা।

সরকারি ব্যাংকেও কৃষিঋণে হয়রানি
বরিশালের কৃষক আফজাল হোসেন পিএনএসকে তিনি বলেন, জমি চাষ করার জন্য মাত্র দু’লাখ টাকা ঋণের জন্য আবেদন করেন কৃষি ব্যাংকে। ঋণের জন্য জায়গা-জমির প্রয়োজনীয় কাগজ চাইলে সব কিছু দেয়া হয়। এর পরেও তাকে ঋণ দেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয় কোনো সরকারি চাকুরিজীবি তার হয়ে জামানত করেন তাহলে ঋণ দেওেয়া যাবে অনথায় নয়।আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের বংশে কোনো সরকারি চাকুরিজীবি নেই আর অপরিচিত কেউই এর জামিনদার হতে চান না, তাই তিনি ঋণও নিতে পারেননি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈচিত্র্য নেই কৃষি খাতের ব্যাংক ঋণ। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কৃষি ঋণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শষ্য উৎপাদনে মোট কৃষি ঋণের ৫৯ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে। আর প্রাণি সম্পদ এবং পোল্ট্রী ১০ শতাংশ, মৎস্যে ৯ শতাংশ, দারিদ্র্য বিমোচনে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দেওয়া হয়েছে ১ শতাংশ ঋণ। আর শষ্য গুদামজাতকরণে এ হার শূন্যের কোটায়। কৃষি খাতের এ বৈচিত্র্যহীন ঋণ বিতরণের কারণে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে না। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে কৃষিতে ভ্যালু চেইন ফ্যাইন্যান্সের ওপর জোরারোপ করতে বলা হয়েছে বিআইবিএমের প্রতিবেদনে। এছাড়া কৃষিতে তুলনামূলক খেলাপী ঋণ কম বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিআইবিএম এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস. এম. মনিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণ সংক্রান্ত একটি আলাদা গাইডলাইন তৈরি করে দিয়েছে। যাতে কৃষি খাতে সঠিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণ হয়। কৃষি ঋণে ভ্যালু চেইন ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। যাতে দ্রুত এ ধরণের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়।

বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, দেশের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি কৃষি। এ চালিকা শক্তিকে সক্রিয় ও সচল রাখতে হলে ব্যাংকের অর্থায়ন জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ঋণ দিতে হবে।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, উৎপাদন, আমদানি এবং বাজারজাতকরণ ও রফতানিসহ যাবতীয় বিষয় এখন কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব দিক বিবেচনা করে ঋণ দিতে হবে। তিনি বলেন, বড় ঋণ গ্রাহকরা নিয়ে ফেরত দিতে চায় না। আর কৃষি ঋণ ফেরত দেয়। এজন্য খেলাপী পরিমান তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, বড় ঋণের ১০ শতাংশ খেলাপী হয়ে যায়, এটি নিয়ে ব্যাংকগুলোর ভাবনা কম। কিন্তু মোট ঋণের দুই শতাংশ কৃষি ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরণের আপত্তি, যা থাকা উচিত নয়।

বেসিক ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ. মজিদ বলেন, কৃষিকে আরও এগিয়ে নিতে হলে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট সব উপখাতকেই অর্থায়ন করতে হবে। উৎপাদন, বাজারজাতসহ সংশ্লিষ্ট সব উপখাতকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, কৃষি খাতের চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। বাকী সামান্য কিছু বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে চাহিদা পূরণ হচ্ছে, কিন্তু একটি বড় অংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিতরণ হচ্ছে ৯ শতাংশ সুদে কিন্তু ঋণ পরিচালন ব্যয় ১০ শতাংশের বেশি। এজন্য বছর শেষে মূলধন ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা সরকার পূরণ করছে।অথচ তা কৃষকের উপকারে আসছে না।খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকের জন্য ঋণ বিতরণ আরো সহজ করা সময়ের দাবি।

পিএনএস/জ এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech