করোনায় পোশাক খাতে ভয়াবহ সঙ্কটের আশঙ্কা

  


পিএনএস ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে নানামুখী সঙ্কটে পড়েছে দেশের তৈরী পোশাক খাত। একের পর এক বাতিল হচ্ছে অর্ডার। আসছে না নতুন অর্ডার। বন্ধ হচ্ছে রফতানি। এভাবে চলতে থাকলে পোশাক খাত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে এবং তা সামাল দেয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন এ খাতসংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে গত কয়েক দিন ধরে তৈরী পোশাকের চলমান ক্রয়াদেশে স্থগিতাদেশ আসছিল। শুধু স্থগিতাদেশ নয়, এখন পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি ডলারেরও বেশি ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে।

চীনে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কিছুটা উত্তরণ ঘটলেও ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়াকে ‘মহাসঙ্কট’ হিসেবে দেখছেন দেশের পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ক্রেতারা এখন বিদ্যমান ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। নতুন করে পাওয়া যাচ্ছে না অর্ডারও। আর নির্দিষ্ট সময়ে পোশাক রফতানি (শিপমেন্ট) না হলে অর্থ সঙ্কটে পড়বেন পোশাক মালিকরা। এতে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও ঈদ বোনাস দিতে বেগ পাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বর্তমানে তৈরী পোশাক খাত গভীর সঙ্কটে আছে। একের পর এক পোশাক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনে এ খাত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে।

তিনি বলেন, অর্ডার কমে যাওয়ায় মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া ইতোমধ্যে তাদের কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। কিন্তু আমরা কর্মী ছাঁটাই করব না। কারণ শ্রমিক আমাদের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের কথা চিন্তা করে আমরা ক্রেতাদের বলছি আপনারা অর্ডার বাতিল করবেন না। এখন এ মুহূর্তে যদি ক্রয়াদেশ বাতিল করতে শুরু করে; শিপমেন্ট করতে না দেয় তাহলে শ্রমিকের বেতন-বোনাস নিয়ে সামনে সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে পড়তে হবে।

বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, এ পর্যন্ত বড় বড় ২০টি কারখানা ক্রয়াদেশ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে লিড বায়ার রয়েছে অন্তত সাতজন। প্রত্যেক বায়ার বলছেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে অপেক্ষা করা মানেই এটি বাতিল। কারণ ক্রেতারা কোনো সময় বলেন না আমরা পণ্য কিনব না। তারা বলেন, একটু অপেক্ষা করেন। পরে তৈরি করেন। এখন চাহিদা কম বিক্রি কম। পরে নেবো। কিন্তু সরাসরি কখনই বলেন না আমরা নেবো না। পরে যদি নেয়ও এখনকার দাম দেবে না। ডিসকাউন্ট চাইবে।
এমন পরিস্থিতিতে করণীয় জানতে চাইলে রুবানা হক বলেন, আমরা এ অবস্থা সরকারকে জানিয়েছি। আমাদের নীতিসহায়তা দরকার ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার কথা বলেছি। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

পণ্য তৈরিতে কাঁচামালের সমস্যা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নিট কাপড়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিজেরাই তৈরি করি। এটিতে সমস্যা হচ্ছে না। তবে নন-কটন বেশি দামের পণ্যের কাঁচামাল সঙ্কট আছে। এ ছাড়া পোশাক খাতের যেসব পণ্য আমদানি হয় তার ৪৯ শতাংশ আসে চীন থেকে। যন্ত্রপাতি কাঁচামালের সঙ্কটে গত দেড় মাস বিশাল ধাক্কা খেয়েছি। এটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। কিন্তু এ সময় ক্রেতারা সমস্যা তৈরি করছেন। এতে উভয় সঙ্কটে পড়েছেন পোশাক মালিকরা, জানান রুবানা হক।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরী পোশাক খাতের রফতানি আয় কমেছে। অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম। একই সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

বিজিএমইএ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে পোশাক কারখানা আছে চার হাজার ৫৬০টি। যেখানে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। দেশের মোট রফতানিতে পোশাকের অবদান ৮৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে হোমটেক্স, টেরিটাওয়েলসহ এ খাতের অন্যান্য রফতানির উপখাত হিসাব করলে তৈরী পোশাক খাতের অবদান ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এক দশক ধরে দেশের জিডিপি ৬ শতাংশের ওপর থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান পোশাক খাতের। তৈরী পোশাকের নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দেশের নিট গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা আগে বলেছিলাম চীন থেকে উপকরণ আমদানি বন্ধ থাকায় এক থেকে দেড় মাসের জন্য হয়তো একটা ধাক্কা খাব। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, তা মহাসঙ্কট সৃষ্টি করবে। নিটের ৭০ শতাংশ পণ্য ইউরোপে রফতানি হয়। সেখানে দোকানপাট বন্ধ। ক্রেতারা বিদ্যমান অর্ডার স্থগিত করার কথা বলছেন। আর নতুন করে কোনো অর্ডার তো নেই-ই। সামনে রোজা, ঈদ। রোজায় এমনিতেই আমাদের খরচ বেশি হয়। উৎপাদনও কম হয়। সব মিলিয়ে আমরা মহাসঙ্কটের শঙ্কায় আছি।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু কারখানায় প্রাথমিক উপকরণের অভাব দেখা দিয়েছিল। এর ফলে ঠিকমতো পোশাক পণ্য উৎপাদন করা যায়নি। বিষয়টি এখনো পুরো ঠিক হয়নি। এখন আবার করোনা ইউরোপে ছড়াচ্ছে। এক দেশের সাথে আরেক দেশের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রফতানিতে বিরাট প্রভাব পড়বে। রফতানি আয়ও বিপদের মধ্যে পড়বে বলে মনে করছি।

এ ব্যাপারে গত রোববার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, করোনার কারণে পৃথিবীজুড়েই যোগাযোগ বন্ধ। করোনার ধাক্কা বিশ্বজুড়ে যেমন লেগেছে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ছে। সমস্যা হচ্ছে কিছু কিছু দেশ রফতানি অর্ডার বাতিল করতে চাচ্ছে অথবা রেফার (অন্য দেশে পাঠানো) করতে চাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য কিছু সমস্যার সৃষ্টি করবে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন