৩৮ তম বিসিএস ক্যাডার চয়েজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  

পিএনএস (মাইদুল ইসলাম প্রধান ) : আলোচনার একেবারে শুরুতেই ক্যাডার চয়েজ নিয়ে কয়েকটি গ্রুপ করে দিচ্ছি, খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ুন:-

গ্রুপ- এ;
১) বিসিএস পররাষ্ট্র।

নোট: পররাষ্ট্র চয়েজ দিলে প্রথমেই দিবেন, না দিলে তালিকা থেকেই বাদ দিন। নিচে দিলে লস নাই; তবে সেটা বেহুদা দেয়া হবে।

গ্রুপ-বি;
২) বিসিএস প্রশাসন/পুলিশ।
৩) বিসিএস পুলিশ/প্রশাসন।

নোট: এখানে যার যেটা বেশি পছন্দ সেটা সে আগে দিবেন; এতে কোন সমস্যা নাই।

গ্রুপ- সি;
৪) বিসিএস নিরীক্ষা ও হিসাব/ইকনমিক/কর।
৫) বিসিএস কর/ ইকনমিক/নিরীক্ষা ও হিসাব।
৬) বিসিএস ইকনমিক/কর/ নিরীক্ষা ও হিসাব।

নোট: এই তিনটির মধ্যে যেটি বেশি পছন্দ সেটি আগে দিন। এভাবে পরেরগুলো দিন; কোনো অসুবিধা হবে না।

গ্রুপ-ডি;
৭) বিসিএস সড়ক ও জনপথ/গণপূর্ত/স্বাস্থ্য/রেলওয়ে প্রকৌশল।

নোট: এখানে শুধু অপেক্ষাকৃত ভাল প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল যাদের তারাই দিবেন (উল্লেখ করেই দিয়েছি)। এর কারণ যে ক্যাডারগুলো আমি এর নিচে রেখেছি তার থেকে আপনাদের উল্লিখিত নিজেদের ক্যাডারগুলোই ভাল হবে।

আর হ্যা, এগুলোর মধ্য থেকে যদি কেউ শুধু এই প্রফেশনাল ক্যাডারেই থাকতে চায় তবে সে নির্দ্বিধায় কেবল একটি চয়েজই রাখবে।

গ্রুপ-ই;
৮) বিসিএস আনসার।
৯) বিসিএস খাদ্য।
১০) বিসিএস তথ্য (ক)/(খ)/ (গ)।
১১) বিসিএস রেলওয়ে পরিবহন।
১২) বিসিএস সমবায়।
১৩) বিসিএস ডাক।
১৪) বিসিএস পরিবার পরিকল্পনা।
১৫) বিসিএস শিক্ষা/কৃষি/সমমান।

নোট: এই গ্রুপের সব ক্যাডারই অলমোস্ট সেইম। সামান্য একটু যা কম বেশি হয় তার জন্য আমি ৮-১৫ পর্যন্ত যেভাবে দিয়েছি সেভাবেই রাখবেন।

এবার অধিক ব্যাখ্যা:

গ্রুপ-এ;
বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রমোশন গ্রোথ সবচেয়ে ভাল (আমার ক্লাসে হলে, এখানে বেশ কিছু বাস্তব উদাহরণ দেয়া যেতে পারতো)। দেশের বাইরে নানা দেশ ভ্রমণ করা, লাল পাসপোর্ট ব্যাবহার করা থেকে শুরু করে নানা সুবিধা থাকলেও এই ক্যাডার প্রথম পছন্দ অনেকেই দেয় না। কেউ কঠিন ভাইভা বোর্ড ফেস করার ভয়ে, আর কেউ বিদেশে জীবনের গুরুত্ত্বপূর্ণ সময় যাতে কাটাতে না হয় একারণেই তালিকাতে অনেকে এই ক্যাডার রাখে না।

সমাধান:
বিসিএস পররাষ্ট্র প্রথম চয়েজ দিলে ভাইভা খুব কঠিন হবে বা পুরো ভাইভা ইংরেজিতেই হবে এই ধারনা অনেকাংশে সঠিক নয়।
আবার পররাষ্ট্র ক্যাডার প্রথম চয়েজ দিলে পররাষ্ট্র না হলে নিচের অন্য ক্যাডার আর হবে না, এই ধারনা একদমই ভুল।

আমার নিজের তিনটা বিসিএস ভাইভাতে পররাষ্ট্র প্রথম চয়েজ নিয়ে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে। আমার বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে না হয়ে বর্তমানে আমি মন্ত্রণালয়ে তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছি। আব্দুল কাদের নামে আমার এক বন্ধু ২৮ তম বিসিএস এ পররাষ্ট্র প্রথম চয়েজ দিয়ে বিসিএস খাদ্য ক্যাডারে চাকরি করেছে। সুতরাং এই ভয় যেন না থাকে।

পররাষ্ট্র প্রথম চয়েজ দিলে :
১) ভাইভাতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের নানাদিক নিয়ে বেশ কিছুটা দক্ষতা দেখাতে হতে পারে।
২) একাডেমিক রেজাল্টগুলো ভালো থাকলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
৩) ইংরেজি কথোপকথনে দক্ষ হলে কাজে লাগতে পারে, কারণ কিছু কিছু ভাইভা বোর্ডে আপনার ইংরেজি জ্ঞান যাচাই করে দেখতেই পারে।
৪) বৈশিক দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব বা সম্পর্কগুলোতে বাস্তব জ্ঞান থাকলে ভালো হবে।

এগুলোতে যদি কেউ বেশ ভালো করতে পারে, তবে আমি বলবো বিসিএস পররাষ্ট্র চয়েজ নাম্বার এক (১) দিলে ভয়ের কিছু নাই। আপনার জন্যই এই ক্যাডার।

এরপরেও যদি ভয় লাগে তাহলে এটা চয়েজ থেকে একেবারেই ফেলে দিন। মনে রাখবেন উপরে আমার দেয়া চয়েজ লিস্ট থেকে প্রথম ৩ টি চয়েজ ১-৩ এর মধ্যেই রাখবেন। এর বাইরে অন্য কোথাও এদের ফেলবেন না।

গ্রুপ -বি :
যদি কেউ মনে করে পুলিশ বেশি ভালো লাগে, সে পুলিশই সবার উপরে আর প্রশাসন তার নিচেই দিবে। একইভাবে কেউ প্রশাসন উপরে দিলে পুলিশ তার নিচেই দিবে কোন সমস্যা নাই।

আমার তালিকায় পুলিশ না দিয়ে, বিসিএস প্রশাসন উপরে রেখেছি।

কেন?

অনেকগুলো কারণে পুলিশ থেকে প্রশাসন আমার নিকট কিছুটা উপরে,
১) প্রশাসনে পদসংখ্যা ৩০০টি আর পুলিশে পদসংখ্যা ১০০টি।
২) পুলিশের এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা ট্রেইনিং এ অনেকেই জীবনের অর্ধেক আয়ুষ্কাল খুইয়ে আসে। অনেকেই খোলামাঠেই কান্নাকাটি করে পুলিশ ক্যাডার পরিবর্তন করার জন্য।
৩) অন্যদিকে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে এ নিচের দিকে বেশ কিছু ভালো পদ লাভ করা যায়। যেমন: এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, এডিএম, ডিসি পদগুলি বেশ দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক।
৪) পুলিশের ক্ষেত্রে এসপি হওয়ার আগে প্রচুর কষ্ট করতে হবে। প্রতি পদে পদে চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে এসপি হবার পর থেকে পুলিশ ক্যাডারকে আমি প্রশাসন থেকে একটু সামনে এগিয়ে রাখতে চাই। এসপি লেভেলের উপর থেকে পরবর্তি পদায়নগুলি অনেকটাই স্বপ্নের মত লাগবে।

তাহলে বন্ধুরা এখন সিদ্ধান্ত নিন পুলিশ না প্রশাসন আগে দিবেন। যেটাই দিন ক্ষতির কিছু নাই।

গ্রুপ-সি:
দেখুন এই গ্রুপে আমি অবলিগ দিয়ে তিনটি ক্যাডারকে তিনবার করে সাজিয়েছি। বিসিএস অডিট ও বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার দুটির বিশেষত্ব হচ্ছে-

১) এদের পোস্টিং ঢাকায় হয়।
২) প্রমোশন লেভেল ভালো।
৩) ফরেন ট্যুর প্রচুর হয়ে থাকে।
৪) ৯-৫ অফিস সময়, শুক্রবার শনিবার কাজ নাই।
৫) বাংলাদেশ সচিবালয়ে শুরু থেকেই পোস্টিং হতে পারে।

অন্যদিকে, বিসিএস কর ক্যাডারটি বর্তমান কর বা মুসক এর যুগে বেশ ভালো একটি ক্যাডার বলে আমার মনে হয়েছে। এই ক্যাডারে জবের পাশাপাশি খুব অল্প বয়সেই সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষগুলোর সাথে পরিচয়ের দারুন সুযোগ ঘটে। জেলা শহরে পোস্টিং হলেও কাজের ধরণ অনুযায়ী জেলাতেও ভালোই থাকা যাবে। ঢাকাতেও পোস্টিং এর সুযোগ রয়েছে।

পরামর্শ: আমার মতে গ্রুপ- সি থেকে উল্লিখিত ৩টি থেকে যেকোনো ক্যাডার উপরে নিচে করে আপনার নিজের ভালোলাগা অনুযায়ী সাজাতে পারেন।

গ্রুপ -ডি:
লক্ষ্য করুণ এখানে আমি টেকনিক্যাল ক্যাডারগুলো থেকে বিসিএস স্বাস্থ্য/সড়ক ও জনপদ/গণপূর্ত ক্যাডারগুলো অবলিগ করে দিয়েছি। অর্থাৎ কেউ যদি এই ডিপার্টমেণ্টের শিক্ষার্থী হয়েও জেনারেল ক্যাডার ও তার নিজের ক্যাডারটা থেকে যেকোনটায় হলে সেটিসফাইড মনে করে তাহলে এই ৭ নং সিরিয়ালেই তার নিজের টেকনিক্যাল চয়েজটা দিবেন।

তবে, কেউ যদি মনে করে সে শুধু প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডারই হতে চায় তাহলে সে শুধুই প্রফেশনাল ক্যাডারের একটাই চয়েজ দিবে, এতে কোন সমস্যা নাই।

আবার কেউ যদি মনে করে প্রফেশনাল টা হলে ভালো; আর তা না হলে অন্য যেকোন একটা ক্যাডার হলেও হবে অর্থাৎ চাকরি একটা লাগবেই, তারক্ষেত্রে আমার উপরিল্লিখিত চয়েজগুলো থেকে সিরিয়ালি সবগুলোই পুরণ করবে।

গ্রুপ-ই:
যদি পেশি শক্তির কথা বলি এই গ্রুপে সবচেয়ে ভালো ক্যাডার হচ্ছে বিসিএস আনসার। যেখানেই পোস্টিং হোক নিজেকে রাজা রাজা মনে হবে। অনেক আনসার সদস্য আপনার কমান্ডিং এ থাকবে, তাদের বেতন বা টিএ/ডিএ আপনার স্বাক্ষরে হবে। এক্ষেত্রে আপনি নিশ্চিন্তে কর্মক্ষেত্রে আয়েশিভাব নিয়ে কাটাতে পারবেন। আরো কিছু আয়েশি সুবিধা আছে যা বলতে চাই না; জব হলে নিজেই বুঝবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত ভালো একটা ক্যাডারই যদি হবে তাহলে একে এত নিচে কেন দিলাম?

হুম..এর অনেক কারণ আছে-

প্রথমত, এই জবে পুলিশের থেকে বেশি কঠিন ট্রেনিং করতে হয়,
দ্বিতীয়ত, পোস্টিং হবে সামরিক অফিসারের নিয়ন্ত্রণে, এর ফলে মারাত্মক শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত হতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রমোশন লেভেল খুব সুবিধার হয় না।

এগুলো মেনে নিতে পারলে এই ক্যাডার খারাপ না।

এই গ্রুপের অন্যক্যাডার গুলোর মধ্যে খাদ্য তারপর তথ্য এভাবে আমি যেভাবে সাজিয়ে দিয়েছি সেভাবেই সাজাবেন। তবে তথ্য জেনারেল ক্যাডারটি বেশ ভাল একটি ক্যাডার। এখান থেকে জেলা তথ্য অফিসার এরপর মাননীয় মন্ত্রীদের পিআরও হওয়া যায়। পিআরওরা সরাসরি মন্ত্রী মহোদয়ের সাথেই কাজ করেন, মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে থাকেন। তবে এই বিজ্ঞপ্তিতে বিসিএস তথ্য জেনারেল ক্যাডারে মাত্র একটি পদ থাকায় আমি এটিকে নিচে দিয়েছি।

শেষ কিছু কথা:
আমি আমার নিজের চিন্তাভাবনা থেকে যতটুকু বুঝি তাই দিয়ে প্রত্যেকের জন্যই একটা কমন ক্যাডার চয়েজ সাজানোর চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস এতে নতুন ক্যাডার প্রত্যাশীরা কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। তবে একথাটি মনে রাখতে হবে এই চয়েজক্রম কোন বাইবেল না। কারও কাছে অন্যকিছু ভালো মনে হলে সে যেন সেভাবেই দেয়। কেউ পুলিশ বা আনসার না দিতে চাইলে প্রদত্ত সিরিয়াল থেকে ঐদুটি সরিয়ে দিলেই হবে। এভাবে অন্যকোন পদ ভালো না লাগলে সেটিকে সরিয়ে রেখে আমার দেয়া সিরিয়াল ঠিক রাখতে হবে।

তবে; অনেককেই দেখেছি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার পরিবর্তন করে পরের বিসিএস এ বিসিএস পুলিশ বা প্রশাসন বা জেনারেলের অন্য ক্যাডার নিয়ে চলে যায়। আবার, এমন মানুষও আমি পেয়েছি যিনি একবছর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বপালন করে পরে আবার বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চলে এসেছে।

জীবন দৃষ্টিভঙ্গি মানুষভেদে ভিন্নভিন্ন হতেই পারে। জীবন ক্ষণকালের। ভালো থাকাটাই সবার আগে।

যে জীবন যেভাবে যাকে মানায় তার সে জীবনই হউক, এই দোয়া করি।

[লেখক: তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।]
পিএনএস/জে এ মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech