বৈশাখের সেকাল-একাল এবং ইসলাম ধর্মের বিধি-নিষেধ

  

পিএনএস, এইচ. এম নুর আলম : বৈশাখ পালন এখন জনসমাজে একটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে।জন্মদিন পালনের মতো নামেমাত্র একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশাখের দিন শুধু হাতি-কুলা সমন্বিত সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবি পড়ে রঙ মাখামাখি করেই মনে করি দিবসটির যথাযোগ্য মর্যাদা দিচ্ছি। বৈশাখ আসলেই অপসংস্কৃতির পুকুরে গা ভাসিযে দিয়ে একদিনের জন্য মিছে বাঙালি সাজার অভিনয় করি। সেদিনও আমাদের দেশীয় বিশুদ্ধ সঙ্গীত শোভা পায় না বরং পাশ্চাত্য সঙ্গীত দিয়েই মনের খোরাক যোগাই। শোভা পায় না আমাদের শুদ্ধ সংস্কৃতি।শুধু বৈশাখের নামে অতি উৎসাহী তরুণ-তরুণীদের লাগাম ছাড়া সংস্কৃতিপনা আর রঙ মাখামাখি, হাতি-ঘোড়া সাজিয়ে রথযাত্রা, উল্কি আঁকা এবং ভুতুজেলা বাজিয়ে অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্যই থাকে না। বাঙালি সংস্কৃতির নামে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রীতি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। রঙের হলি খেলা, রথ যাত্রা, ঢোল বাজানো এসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতির অংশ বটে যেখানে মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান মিলেই বাঙালি। জনসংখ্যার আধিক্যের দিক থেকে মুসলিমদের সংস্কৃতি ঠাঁই পায়নি বাঙালি সমাজে।ব্যাপারটি এমন হয়ে গেছে যে, বাঙালি বলতে সনাতনদের অধিকাংশ সংস্কৃতি-ই গ্রহনযোগ্য হচ্ছে সমাজে। বৈশাখী সংস্কৃতি তার থেকে আলাদা নয়। তবে, ভাববার বিষয়-মুসলিম সমাজ বৈশাখী সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখে। আদৌ মুসলিম সমাজে বৈশাখ উদযাপন কতটা গ্রহণযোগ্যতা আছে? অথবা মুসলিম মুনীষিরা এ ব্যাপারে কী বলেন।এর আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন-আসলে বৈশাখ কীভাবে এলো আর এ সমস্ত সংস্কৃতি পূর্বে ছিলো কী না। দেখে নিই, ইতিহাস কী বলে বৈশাখের ব্যাপারে।

পহেলা বৈশাখের ইতিহাসঃ ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করে। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আকবরের শাসনামলে হারেমের অভ্যন্তরের রাজপুত এবং হিন্দু রানীদের প্ররোচনা এবং তৎকালিন হিন্দুদের আবেদনে ও সে এক বিকল্প সন খুঁজছিল। হিন্দুদের অভিযোগ ছিল, যেহেতু হিজরি সন অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে সেহেতু তাদের পুজা অচ্চনায় সমস্যা হচ্ছে। আনন্দনাথ রায়ও ঠিক এমনটাই বলেছিল - 'আকবর বাদশাহর রাজত্বকালে হিন্দু সম্প্রদায় বাদশাহের কাছে জ্ঞাপন করে, আমাদের ধর্মকর্ম সম্পর্কীয় অনুষ্ঠানে হিজরি সন ব্যবহার করতে ইচ্ছা করি না। আপনি আমাদের জন্য পৃথক সন নির্দিষ্ট করে দিন। আকবর হিন্দু প্রজার মনোরঞ্জনার্থে হিজরি সন থেকে দশ-এগার বছর কমিয়ে এলাহি সন নামে একটি সনের প্রচলন করেন। যা আমাদের বঙ্গদেশের সন বলে চলে আসছে।[' সুত্রঃ বারভূঁইয়া, লেখক – আনন্দরায়।]
সুতরাং এখানে বোঝা যাচ্ছে হিন্দুদের পুজা এবং আকবরের আর্থিক উপকার তথা ব্যাবসায়িক চিন্তা ভাবনার জন্যই এই বাংলা সনের উৎপত্তি । সুতরাং এটা কিভাবে বাঙ্গালীর হাজার বছরের প্রাণের উৎসব হয় ?

পয়লা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতি কি না : সংস্কৃতি সম্পর্কে এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ই.বি টেইলর প্রদত্ত সংজ্ঞাটি শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা হিসেবে এখনো প্রণিধানযোগ্য। তার মতে ‘সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজস্থ মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস (ধর্ম-দর্শন) কলা, নীতি-নিয়ম, সংস্কার ও অন্যান্য যে কোনো বিষয় দক্ষতার এক জটিল সমাবেশ, যা একজন সদস্য হিসেবে মানুষ অর্জন করে।’ এর বিপরীত দিকগুলো যেমন অজ্ঞতা ও মূর্খতা, অন্ধবিশ্বাস, যুক্তি ও বিজ্ঞানবর্জিত ধ্যান-ধারণা, অমানবিক ও অনৈতিক যাবতীয় কর্মনীতি ও নিয়ম এসবই এক কথায় অপসংস্কৃতি, উৎস তার ধর্ম বা চেতনা যাই হোক না কেন। পয়লা বৈশাখে সংস্কৃতির নামে যে একটা সম্প্রদায়ের সকল নিয়ম-রীতি পালন করা হয় তাহলে বাঙালি বলতে যদি বাংলাদেশে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী হয় তাহলে এখানে তো মুসলমানও বাস করে । তাহলে শুধু একট সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য হবে কেন?? নিচের উৎসবগুলো দেখে বিশ্লেষণ করা যাক বাঙালির সংস্কৃতির।

১। পুন্যাহঃ পুণ্যাহ মূলত সংস্কৃত শব্দ। অর্থ ভালো কাজের সুফল পাবার দিন। জমিদার প্রথার সময় বছরের সূচনার দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করা হতো। আসলে পুণ্যাহ ছিল জমিদারদের দিক থেকে আর্থিক স্বার্থ উদ্ধারের কৌশল।

২। হিন্দুদের ঘটপূজা: হিন্দুরা পহেলা বৈশাখের দিনে একটি মাটির ঘড়া বা ঘটের ওপর ছবি, স্বস্তিকাচিহ্ন ইত্যাদি এঁকে তার পূজা করে থাকে।

৩। গণেশ পূজা: হিন্দুদের নিয়ম হচ্ছে, যে কোন কাজ শুরু করার সময়ে গণেশপূজা করে শুরু করা। পহেলা বৈশাখ যেহেতু বছরের প্রথম দিন, সেহেতু হিন্দু ব্যবসায়ীরা এই দিনে নতুন বছরের ব্যবসা শুরু করার জন্য গণেশপূজা করে তারপর হালখাতা খুলে থাকে।

৪। সিদ্ধেশ্বরী পূজা / বউমেলা: সোনারগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে যার নাম বউমেলা, এটি স্থানীয়ভাবে "বটতলার মেলা" নামেও পরিচি। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজোর জন্য এখানে সমবেত হয়।

বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা- অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে।

৫। ঘোড়ামেলা: সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিত এবং সে মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তার স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা।

৬। চৈত্রসংক্রান্তি পূজা-অর্চনা/ নীলপূজা/চড়কপূজা/গম্ভীরাপূজা/ কুমীরের পূজা/অগ্নিনৃত্যঃ চড়ক পূজা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব। চৈত্রের শেষ দিনে তথা চৈত্রসংক্রান্তিতে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলে। এ পূজার অপর নাম নীল পূজা। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়কপূজারই রকমফের। চড়ক পূজা চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়। আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। এতে পানিভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ রাখা হয়, যা পূজারিদের কাছে "বুড়োশিব" নামে পরিচিত। পতিত ব্রাহ্মণ এ পূজার পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে। পূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ হলো কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুঁড়ির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা এবং দানো- বারানো বা হাজারা পূজা করা।

৭। ত্রিপুরাদের বৈশুখ/মারমাদের সাংগ্রাই ও পানি উৎসব/চাকমাদের বিজু উৎসব, সম্মিলিত উৎসবের নাম বৈসাবী |

৮। মঙ্গল শোভাযাত্রাঃ মঙ্গল শোভাযাত্রা মানে হোলও মঙ্গল কামনা করে অশুভ বিতারনের জন্য যে যাত্রা। এই শোভাযাত্রায় সব সময় বিভিন্ন দেবদেবীর বাহন থাকে যা একজন মুসলিম কখনোই মেনে নিবে না। যেমন: লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস, গণেশের বাহন ইঁদুর, দুর্গার বাহন সিংহ, মনসার বাহন সাপ, কার্ত্তিকের বাহন ময়ূর, মহাদেবের বাহন ষাড়, যমরাজের বাহন কুকুর, ইন্দ্রের বাহন হাতি, ব্রক্ষ্মর বাহন পাতিহাঁস, বিশ্বকর্মার বাহন ঢেকি, শীতলার গাধা ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে, পহেলা বৈশাখে হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা ও উপলক্ষ বিদ্যমান, কিন্তু মুসলমানদের কোনো অনুষ্ঠান এই দিনে নাই।

যার মানে দাঁড়ায়, পহেলা বৈশাখ হলো একান্তই হিন্দুদের নিজস্ব দিবস, নিজস্ব উৎসব। উপরের যেসব উৎসবের বর্ণনা দেয়া হয়েছে পহেলা বৈশাখের, তা মূলত গ্রাম্য হিন্দুদের উৎসব। ঘটা করে প্রথম বাংলা নববর্ষ পালন করা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় । ব্রিটিশরাজের বিজয় কামনা কে ১৯১৭ সালে পহেলা বৈশাখে হোমকীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করে কলকাতার হিন্দু মহল । আবার যখন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বাজল, তখন হিন্দু সুবিধাবাদী গোষ্ঠি ১৯৩৮ সালে উৎসব করে পহেলা বৈশাখ পালন করে । পূজায় পূজায় ইংরেজদের জন্য বিজয় কামনা করে । (সূত্র: প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে বাংলা বর্ষবরণ, মুহাম্মাদ লুত্ফুর হক, দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০০৮)
উপরি-উক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে এই পহেলা বৈশাখে যে যে উৎসব পালন করা হয় তা কখনোই বাংলাদেশীদের কোন উৎসব ছিল না, এটা হলো হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবের একটি দিন। শুধু মুলসমানদের বেলায় এক অদ্ভুত প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, ‘তুমি মুসলমানই থাকবে না বাঙালি হবে’?
ইসলামের দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ তথা নববর্ষ পালন জায়েজ কী-না?

উৎসব ধর্ম পালনের অংশঃ
উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষ্যগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে তাতে রয়েছে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় সংস্কার ও ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হতো ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ্য ছিল, ঐ দিন খ্রিষ্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট এ মর্মে ঐশী বাণী প্রেরিত হয় যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্র জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এ দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন ‘সাবাত’ হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলরে মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন। ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” [বুখারী: ৯৫২; মুসলিম: ৮৯২]

এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৪৮) ‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি অনুষ্ঠান [সময় ও স্থান] নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ (সূরা আল-হাজ্জ্ব, ২২:৬৭)

অতএব, অমুসলিমদের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কোন সুযোগ কুরআন অনুসারী কোন মুসলমানের জন্য নেই। তাদের উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করার অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা।

নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে ইসলামের চেতনা : ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দাদা তাঁর পিতাকে পারস্যের নওরোযের দিন (নববর্ষের দিন) আলী রা.-এর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়াও পেশ করেছিলেন। (হাদিয়াটি ছিল নওরোয উপলক্ষে। ফলে) আলী রা. বললেন, ‘‘নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম’’ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। (আখবারু আবি হানিফা,সয়মারী) অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব নিকাশ করবে এবং নব উদ্যমে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে। ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলীর (র.) এ ফতোয়া দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, নববর্ষ উপলক্ষে পরষ্পরে উপহার বা প্রেজেন্টশন আদান প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময় নাজায়িয।

নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান ইসলামে নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। তাই এক জন মুসলমানের কাছে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ কোন গুরুত্ব ও তাৎপর্য নেই। আর এ চেতনা ও বিশ্বাস থেকেই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি।

ইদানিং পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পদ্ধতিগুলো দেখলে প্রতীয়মান হয়, তারা বিশ্বাস করে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার সম্পর্ক রয়েছে।


সূর্যকে স্বাগত ও বৈশাখকে সম্বোধন করে স্বাগত জানানো : নববর্ষ উদযাপনের আর এক কর্মসূচি থাকে বছরের প্রথম প্রহরে প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানানো ও রবি ঠাকুর রচিত বৈশাখ গান গাওয়া। এ ধরনের কর্মকান্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র। যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনিভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির প্রতি আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “কাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কুরআনে তুলে ধরেছেন:
“আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…” (সূরা আল নামল, ২৭:২৪)

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে গানগেয়ে বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, আর কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন জাতির সূর্যকে সিজদা করা, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য এগুলোর মধ্যে চেতনা ও বিশ্বাসগত কোন পার্থক্য নেই, বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার শয়তানী উদ্যোগ। বিশ্ব কবি তার ধর্ম বিশ্বাস থেকে তার বৈশাখ কবিতাতে ভৈরব রুদ্র বৈশাখের কাছে মিনতি করে অনেক কিছু চেয়েছেন। সেটা তার ধর্ম বিশ্বাস। কিন্তু এক জন মুসলমান কিভাবে নিজ ধর্ম বিশ্বাসকে এড়িয়ে যেয়ে কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু চায়?

নর-নারীর অবাধ মেলামেশা: পহেলা বৈশাখ বা অন্য কোনো উপলক্ষে ছেলে-মেয়েদের বেপর্দা ও বেহায়পনার সুযোগ দিবেন না। অবাধ মেলামেশার সুযোগ দিবেন না। তাদেরকে বুঝান ও নিয়ন্ত্রণ করুন। আপনি মসজিদে নামায আদায় করছেন আর আপনার ছেলে-মেয়ে পহেলা বৈশাখের নামে বেহায়াভাবে শোভাযাত্রা, মিছিল বা উৎসব করে বেড়াচ্ছে। আপনার ছেলে-মেয়ের পাপের জন্য আপনার আমলনামায় গোনাহ জমা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়। অন্য পাপ আর অশ্লীলতার পার্থক্য হলো, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকে ‘‘দাইউস’’ বলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। মাদকাসক্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং দাইউস, যে তার পরিবারের মধ্যে ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দেয়”। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)

ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো স্বার্থে অনেক মুসলিম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলা-মেশা ও বেহায়াপনার পথ খুলে দেওয়ার জন্য মিছিল, শোভাযাত্রা, মেলা ইত্যাদিতে অবস্থান নেন। অশ্লীলতা প্রসারের ভয়ঙ্কর পাপ ছাড়াও ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা শুনুনঃ ‘‘যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন যা তোমরা জান না।’’ (সূরা ২৪ নূর: ১৯ আয়াত) ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের কাসিকাল ট্রিকগুলোর একটি। যেটাকে কুরআনে “ফাহিশাহ” শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে। ‘‘সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ [ব্যভিচার, অবাধ মেলামেশা, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি] করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে (ইসলাম সম্বন্ধে) এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।” (সূরা বাক্বারাহ্, ২:১৬৮-১৬৯)। ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এ আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। দেখা, ছোঁয়া, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে। তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য এমন সকল স্থান থেকে শতহাত দূরে থাকা কর্তব্য, যে সকল স্থানে দেখা, ছোঁয়া, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহারঃ নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।” [বুখারী:৫৫৯০]

বৈশাখ বর্ষবরণ কি আবহমান কালের বাঙালীর সংস্কৃতি (?)
অনেকেই পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ, শোভাযাত্রা ইত্যাদিকে বাঙালীর আবহমান কালের সংস্কৃতি বলে থাকেন। অথচ, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা ১৯৬৭ সাল থেকে এবং শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সাল থেকে। তাহলে এ আয়োজনকে কিভাবে বাঙালীর সংস্কৃতি দাবি করা হয়? আজ থেকে ১০০ বছর আগের বাঙালী কোন মা, বধু, কণ্যা কী স্বপ্ন দেখতেন যে, কোন পর পুরুষ তার শরীরের লোভনীয় অঙ্গে আলপনা এঁকে দিবে, সে কোন পর পুরুষকে মুখে তোলে ইলিশ-পান্তা খাওয়াবে? বিগত হাজার বছরের বাঙালী নারী সমাজ পরপুরুষের সান্নিধ্যকে ঘৃণা করে এসেছে। বাঙালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য হচ্ছে পর্দা ও শালীনতা বোধের গর্বিত ইতিহাস। ছেলে-মেয়ে এক সাথে বটতলায় বসা বাঙালীর সংস্কৃতি নয়। হ্যাঁ, শরৎ চন্দ্রের ভাষায় ভাষা মিলিয়ে কেউ যদি বলেন, ‘আজ বিকেলে বাঙালী বনাম মুসলমান ছেলেদের মাঝে ফুটবল খেলা হবে’ তবে তিনি বর্ষবরণের প্রচলিত আয়োজনগুলোকে বলতে পারেন বাঙালী সংস্কৃতি। কিন্তু একজন মুসলমান কখনো বর্ষবরণের এ আয়োজনগুলোকে “আমাদের সংস্কৃতি” বলতে পারে না।

মুসলিমরা ভাষায় বাঙালী, এ কথা সত্য। এর চেয়েও বড় সত্য কথা হচ্ছে, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে একত্ববাদে বিশ্বাসী ।আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ইসলামের বাইরে যেয়ে অন্য কিছুর চর্চা করবে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।” (আলে ইমরান ৩:৮৫) । রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে সে তাদের অন্তুর্ভূক্ত।” (আবূ দাউদ:৪০৩৩)।

পহেলা বৈশাখকে উৎসব দিবসের মর্যাদা দিয়ে সার্বজনীন উৎসবের নামে ইদানিং যা হয়ে থাকে তা বাঙালি মুসলিমদের ঈমান ও ইবাদাতের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ; কুফুর ও শিরিকে পরিপূর্ণ। শেষে বলা যায়, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার, সকলের নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশ সাংবাদিক।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল




 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech