জাবিতে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে শিক্ষার্থীর কান নষ্ট হওয়ার পথে

  

পিএনএস ডেস্ক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে এক শিক্ষার্থীর কান নষ্ট হওয়ার পথে। ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬তম ব্যাচের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের রাজন মিয়া।

বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) ওই শিক্ষার্থী ‘আমরাই জাহাঙ্গীরনগর’ নামের একটি গ্রুপে পোস্ট দিয়ে জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫ ব্যাচের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের রাকিব হাসান সুমন ও একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সাকিব জামান অন্তু এই দুইজন আমার কানে থাপ্পড় দিয়েছিলো। যার জন্য আমার কান ফেটে গেছে এখনো আমি এই কানের সমস্যার জন্য মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত।’

এই পোস্ট দেয়ার পর রাজনের বিরুদ্ধেও র‌্যাগিং ও মারধরের অভিযোগ তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থী।

এদিকে এর আগের দিন বুধবার একই গ্রুপে পোস্ট দিয়ে রাজন তার নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন।

পোস্টটি পাঠকদের জন্য হুবহুব তুলে ধরা হলো- ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে পা রাখি তখন অনেক ইচ্ছা হয়েছিলো জীবনে কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু গণরুম আমার জীবনের অনেক ইচ্ছা নিয়ে গেছে। রাত অনেক হয়েছিলো ৪৫ব্যাচের ভাইয়েরা (সংঘববদ্ধ র‌্যাগার গ্রুপ) আমাদের ফাপর দিচ্ছিলো। তখন তারা কি একটা বলেছিলো আমাকে; আমি বুঝতে পারিনি।

তারপর আমার সাথে যা হলো তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারবো না। দুইজন ভাই একে একে ১০ থেকে ১২ টা থাপ্পড় দিয়েছিলো আমার কানে। তারপর আমি আর কানে শুনতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে ভাইদের আমি বলি- ‘ভাই খুব লাগছে’। ভাইয়েরা তখন বলে- আজকে তোরে মেরে ফেলবো।

এভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কিছু সময় পর আমাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে, তখন আবার একজন ভাই আমাকে থাপ্পড় দেয়। মেডিকেলে নেয়ার সময় আমাকে ‘পরামর্শ’ দেয়, ডাক্তার যদি কিছু জানতে চায় তাহলে বলবি, ‘এমনিতে ব্যথা পাইছি’।

এরপর আমাকে ক্যাম্পাসের মেডিকেলে নেয়া হলো। সেখানকার ডাক্তার আমাকে দেখে বললেন- এখানে হবে না, সাভারের এনাম মেডিকেলে নিতে হবে। তখন আমি আরো ভয় পেয়ে গেছিলাম। পরে যখন এনাম মেডিকেলে নেয়া হয় ডাক্তার বলে,‘কানটা ফেটে গেছে ঔষধ দিয়ে দিচ্ছি, যদি ভালো না হয় তাহলে অপারেশন করতে হবে।’

এভাবে কিছুদিন গেলো। কান আর ঠিক হলো না। আবার গেলাম মেডিকেলে, ডাক্তার সেই আগের কথাই বলছে।

এর মধ্যে কিছু বড় ভাই আমাকে ডেকে বলছে, নির্যাতনের এসব কথা সাংবাদিকদেরকে বললে তাদের কিছু হবে না। আর তুই হলেও থাকতে পারবি না। আমার ডিপার্টমেন্টের এক বড় ভাই একদিন শুধু আমার সাথে গেছে ডাক্তার এর কাছে, তার পকেটের ৮০০ টাকাও খরচ হয়েছে মনে হয়। এর মধ্যে বাড়িতে গেলাম। বাড়ি গিয়ে কানে তুলা দিয়ে ঘুরি। মা-বাবা, বন্ধুরা সবাই জানতে চাই কি হয়ছে? আমি বলি- একবার পড়ে গেছিলাম, ঠিক হয়ে যাবে। তারপর কাউকে কিছু না বলে আমাদের কিশোরগঞ্জে ডাক্তার দেখালাম। ওই ডাক্তারও এনাম মেডিকেলের ডাক্তার যা বলছে তাই-ই বললো।

আবার ক্যাম্পাসে আসলাম। আসার পরে ক্লাসে যাই কানে তুলা দিয়ে। এটা যে নিজের কাছে কি কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। তারপর ডিপার্টমেন্টের শিক্ষাসফর শুরু হলো, ঐ জায়গায় গিয়েও কানে তুলা দিয়ে ঘুরতে হয়ছে আমাকে। সত্যি খুব কষ্ট হয় আমার কানটা নিয়ে, এখনো ঠিক হয় নাই আমার কানটা। কানের ভিতরে কেমন জানি একটা শব্দ হয় যার জন্য ঘুমালেও শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। এই কানের পিছনে যে টাকার মেডিসিন গেছে আমার- তা কেবল আল্লাহই জানে। কোথায় ঐ সব সিনিয়র, যারা আমার কানটা নষ্ট করে দিছে! তারা তো এখন কেউ আমার পাশে থাকে নি! আমিও একটা ছাত্র, আমার বাবার কাছ থেকেও মাস শেষে টাকা চেয়ে আনতে হয়।

কিছু বলবো না জাহাঙ্গীরনগর’কে, শুধু বলবো ক্যাম্পাসে এসে মনে হয়েছিলো অনেক কিছু পেয়ে গেয়েছি কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর মনে হয়েছিলো আমি হয়তো মারা যাচ্ছি। একটা কথা বলি সিনিয়র আমিও হয়েছিলাম। কোথায় আমি তো আমার কোনো জুনিয়রের গায়ে হাত দেই নাই। তাতে কি সম্মান করবে না আমাকে তাদের গায়ে হাত দেই নাই বলে? সম্মানটা নিতে হয় যে কোনো মানুষের কাছ থেকে সে ছোট বা বড় হোক।

কথায় আছে- শিক্ষা নাকি পরিবার থেকে নিয়ে আসে, যার পরিবার যেমন তার শিক্ষাটাও তেমন। সমস্যা নাই আমার কানটা যেমন আছে তেমন হয়তো থাকবে না। একদিন ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঐ সব সিনিয়রদের সাথে যতোই হাসি মুখে কথা বলি না কেন, তারা কোনো দিন আমার চোখে ভালো মানুষ প্রকাশ পাবে না। একজন মানুষকে কষ্ট দেয়ার আগে নিজের ব্যাপারে ১০০বার ভাবা দরকার।

সবশেষে বলি- অনেকে বলবেন ঐ সময় কেনো এঘটনা প্রকাশ করি নাই। তখন প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকজন বড় ভাই আর শিক্ষক এর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছিলাম। যার জন্য সাহস করে বলা হয়নি কথাগুলো। সবশেষে মাফ চেয়ে নিচ্ছি আমার কোনো কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে। সব সিনিয়র এক না, কিছু কিছু সিনিয়র আছে যাদের দেখলে কথা বলতে যাই নিজে থেকে। আজ ১০০ডিগ্রীর বেশি জ্বর নিয়ে কথা গুলো লিখে ফেলছি। অনেক দিন ধরে মনে হচ্ছিলো আমি অপরাধী, যদি এই কথা গুলো প্রকাশ না করি। তাহলে ঐসব সিনিয়রদের সম্পর্কে মানুষ জানতে পারবে না। আজকে অনেক ভালো লাগতাছে যে মনের কষ্টগুলো প্রকাশ করতে পারছি।

প্রিয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমি ৪৬ ব্যাচের একজন ছাত্র আপনারদের কাছে আমার উপর এই নির্যাতন এর বিচার চাচ্ছি।’’

এই পোস্ট দেয়ার পর ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবি করেন। তবে মাহবুবুর রহমান রিমন নামের এক শিক্ষার্থী পোস্ট দিয়ে রাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, রাজন রাতে গণরুমে গিয়ে তাদেরকে মারধর করেছে।

এদিকে রাজন যে দুই শিক্ষার্থীর নামে অভিযোগ করেছেন, তারা জানিয়েছেন, এমন কোন ঘটনার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই।’

এ বিষয়ে জাবি প্রক্টর আসম ফিরোজ-উর হাসান বলেন, ‘রাজন এখন হলে থাকে না, ক্যাম্পাস সংলগ্ন গেরুয়ায় থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ পোস্টটি দেয়ার পরে আমি নিজ থেকে তার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছি। সে আমার সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ছাত্র শোনার পরে তার বিষয়টি সে জানানোর আগেই, আমি নিজ থেকে জানার চেষ্টা করেছি। শুনলাম সে এখনও অসুস্থ্য। র‌্যাগিংয়ের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। অভিযোগপত্র পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা হবে।’

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech