সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে টাকা তছরুপের অভিযোগ

  

পিএনএস, খুলনা সংবাদদাতা : খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথের বিরুদ্ধে কলেজ ফান্ড থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা তছরুপের অভিযোগপত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুদক এবং কম্পোটোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের দপ্তরে পৌঁছেছে গত সপ্তাহে।

পাইওনিয়ার মহিলা কলেজের সচেতন শিক্ষক ও কর্মচারীদের বরাত দিয়ে এ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগে অধ্যক্ষ দীনবন্ধু দেবনাথের স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির একটি খণ্ডচিত্র উত্থাপিত হয়েছে। মূল অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- মিথ্যা-ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সহকর্মীদের এসিআর ও শো-কসের ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ কলেজ ফান্ড থেকে উত্তোলন করেছেন।

সরকারি পরিপত্র এবং কলেজের অভ্যন্তরীণ বণ্টন নীতিমালা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অর্থ প্রাপ্তির অন্যায় দাবিতে অধ্যক্ষ কলেজের অনার্স বিভাগগুলোর অভ্যন্তরীণ বণ্টন বিগত ০১/০৪/২০১৭ ইং হতে অদ্যবধি বন্ধ রেখেছেন। ফলে কলেজের সব শিক্ষক-কর্মচারী মারাত্মকভাবে অর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। বিগত দুই বছরে কলেজের বিভিন্ন আর্থিক কমিটিতে প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথ তার আস্থাভাজন ও পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে অর্থ তছরুপ করেন, যা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং: শিম/অডিট সেল/২৪৩/২০১১/৪৭৫ তাং ৬ জুলাই, ২০১৪ ইং এর পরিপত্রের ৪.৩. (ক) ও (খ) চূড়ান্ত অবমাননা। এছাড়া বিশেষ করে ২৪:১৪ মুসলিম ও হিন্দু শিক্ষক থাকলেও সব অর্থিক কমিটিতে অর্ধেক হিন্দু শিক্ষক ও অর্ধেক মুসলিম শিক্ষক মনোনয়ন দেন। যার প্রমাণ বিগত দুই বছরের বিভিন্ন আর্থিক কমিটি তৈরির ডকুমেন্ট দেখলে পরিষ্কার হবে। পূর্বোক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক অনুযায়ী, অধ্যক্ষ যেকোনো পাবলিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা থেকে সর্বোচ্চ ১০,০০০/- ও ৫,০০০/- সম্মানী বাবদ গ্রহণের সুস্পষ্ট বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও কমিটিতে অতিরিক্ত মিথ্যা সদস্য দেখিয়ে অতিরিক্ত সদস্যের সম্মানি হাতিয়ে নেন অধ্যক্ষ। কলেজের অগ্রভাগে একটি বহুতল ভবনের জন্য সয়েল টেস্ট ও চূড়ান্ত অনুমোদন হলেও সে জায়গায় ফুল বাগানের নামে লাখ লাখ টাকা তছরুপ করেছেন অধ্যক্ষ।

প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথ অধ্যক্ষের কক্ষে একটি দেড় টনের এসি ও ফটোকপি মেশিন এবং ৬টি অকেজো সাউন্ড বক্স ক্রয়ে বাজার মূল্যের তিন গুণ অর্থ ব্যয় দেখিয়েছেন। এছাড়া সরকারের বারবার নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এখনো কলেজে কোনো কার্যকর মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেননি অধ্যক্ষ। কলেজের ইংরেজি, সমাজকল্যাণ ও অর্থনীতি অনার্স খোলার অজুহাত দেখিয়ে বিগত দুই বছরে কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাহিত্য সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের বাজেট থেকে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মিথ্যা ও ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন অধ্যক্ষ। এসএসসির জমা বোর্ড মার্কশিট ফেরত দেওয়ার সময় ছাত্রীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করেন অধ্যক্ষ। এছাড়া ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের সময় ছাত্রীদের কাছ থেকে রশিদবিহীন অর্থ আদায় করা হয়। পাইওনিয়ার কলেজের উপাধ্যক্ষ জনাব জাহানারা ও ক্রয় কমিটির অন্য সদস্যদের ভয় দেখিয়ে মিথ্যা ও ভুয়া ভাউচারে স্বাক্ষর করিয়ে বই ক্রয়, বিজ্ঞানাগারে যন্ত্রপাতি ও দ্রব্যাদি ক্রয়ের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথ।

কলেজের একটি মাত্র হোস্টেল থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হোস্টেল সুপার আসমাউল হুসনা অধ্যক্ষের দুর্নীতিতে আষ্টেপিষ্টে আবাদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ছাত্রীদের নিম্নমানের অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করে প্রায় ৫ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত করেছেন হোন্টেল সুপার। বিনিময়ে হোস্টেল সুপারকে বিভিন্ন আর্থিক কমিটিতে রাখেন অধ্যক্ষ। উল্লেখ্য, হোস্টেল সুপার আসমাউল হুসনার স্বামী জনাব খান দুর্নীতির দায়ে ইতিপূর্বে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেরিত দরখাস্তে বলা হয়, প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথ সরকারি পাইওনিয়া মহিলা কলেজের সরকারি ও বেসরকারি ফান্ড থেকে বিগত ৩টি আর্থিক বছরে প্রায় কোটি টাকা তছরুপ করেছেন। যার প্রমাণ হিসেবে টুটপাড়ার সেন্ট্রাল রোডের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। এছাড়া উপাধ্যক্ষকে অন্ধকারে রেখে অধ্যক্ষের মনোঃপূত ব্যক্তিদ্বয়কে নিয়ে কলেজের সব সিদ্ধান্ত জোরপূর্বক বাস্তাবয়ন করেন। কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য সৃষ্টি করে এক নৈরাজ্যকর পরিবেশ তৈরি করেছেন। অধ্যক্ষের গুপ্তচর হিসেবে পরিচিত ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী মেহেদি হাসানকে প্রতিটি কমিটি থেকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন অধ্যক্ষ। এসবের প্রতিবাদ করায় কলেজের ১১ জন নারী সহকর্মীকে একই দিনে একযোগে বিনা অপরাধে শো-কচ প্রদান করেন। যার মাধ্যমে অধ্যক্ষের নারীর প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব প্রদর্শিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে অধ্যক্ষ স্মারক নম্বরবিহীন কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছেন।

উপরোক্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রফেসর দীনবন্ধু দেবনাথের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, এটা তার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। তিনি আরো বলেন, ‘আমি যা করেছি, তা কলেজের উন্নয়নের জন্য করেছি।’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। তবে কতিপয় শিক্ষক ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপরোক্ত অভিযোগ ও দুর্নীতি সবই সত্য। (চলবে)

পিএনএস/মো. শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech