রাজীবের বফর্সের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে মোদির রাফাল

  



পিএনএস ডেস্ক: ব্যবধান পুরো তিন দশকের। প্রথমটা কামান, দ্বিতীয়টা বিমান। প্রথমটা পতন ঘটিয়েছিল সেই সময়কার ভারত সরকারের। দ্বিতীয়টা প্রবল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এই সময়কার ভারত সরকারকে। বফর্সের মতো রাফালও তিন দশক পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বুকে মৃত্যুবাণের আঘাত হানবে কি? লোকসভা ভোটের মাত্র দুই-আড়াই মাস আগে এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠেছে। বফর্সের মতো রাফালও যদি সরকার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মানতেই হবে, ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে।

বফর্সের সঙ্গে রাফালের যত মিলই থাকুক, অমিলও কিন্তু কম নয়। মিল-অমিলের সেই তুল্যমূল্য বিচারের ওপরই ঝুলে রয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকারের ভাগ্য।

তিন দশক আগে ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধীর সরকার সুইডেনের এ বি বফর্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় ১৫৫ মিলিমিটার ব্যাসার্ধের অত্যাধুনিক হাউইৎজার কামান কিনতে। ঠিক হয় ৪১০টা কামান কেনা হবে। খরচ পড়বে প্রায় দেড় হাজার কোটি রুপি। পরের বছর, ১৯৮৭ সালে সুইডিশ রেডিও এক খবরে জানায়, ভারতকে ওই কামান বেচতে এ বি বফর্স কোম্পানি ৬০ কোটি রুপির মতো ঘুষ দিয়েছে। কাজটা করেছেন মিডলম্যান। এ অর্থ দিয়েছেন ভারতীয় রাজনীতিক ও আমলাদের।

সেই সময় ভারতীয় সংসদে কংগ্রেসের ধারেকাছে কেউ ছিল না। ইন্দিরা হত্যার রোষের আগুনে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়া বিরোধীরা নির্বিষ। ৪১২ আসন জিতে ক্ষমতায় আসা রাজীব গান্ধীর ধপধপে সাদা কুর্তায় দুর্নীতির কালির ছিটেফোঁটা দাগ নেই। অথচ সুইডিশ রেডিওর তোলা অভিযোগ কাঁপিয়ে দিল রাজীবের সরকারকে। এবং তিনি হেলে পড়লেন যখন সুইডিশ সংবাদপত্র ‘ড্যাগেন্স নাইহেটার’ দাবি করল, ঘুষের সেই টাকা মিডলম্যান মারফত পৌঁছেছে শাসক দল কংগ্রেসের কাছে।

ক্রমে ক্রমে জানা গেল সেই মিডলম্যানের নাম। ওট্টাভিও কোয়াত্রুচি ইতালির নাগরিক। রাজীব-পত্নী সোনিয়া গান্ধীর পারিবারিকভাবে পরিচিত।

প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী অর্থমন্ত্রী করেছিলেন তাঁরই রাজ্যের (উত্তর প্রদেশ) উচ্চাভিলাষী মান্ডার সাবেক রাজা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংকে। সিদ্ধান্তটা যে কত বড় ভুল, রাজীব তা বুঝতে পারলেন ঘরের শত্রু হিসেবে বিশ্বনাথই যখন চাবুকটা হাতে তুলে নিলেন। অর্থ থেকে প্রতিরক্ষায় সরিয়েও মান্ডারাজের হাত থেকে নিস্তার পাননি রাজীব। ১৯৮৯ সালের ভোটে সেই মান্ডারাজের হাতেই পতন ঘটে তাঁর। পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হিরো থেকে জিরোয় নেমে আসতে হয়েছিল ‘মিস্টার ক্লিন’ রাজীবকে।

রাফালের আঘাতে নরেন্দ্র মোদির ভাগ্যের চাকাও কি ওইভাবে ঘুরতে চলেছে?

সেই প্রশ্নে যাওয়ার আগে বফর্স ও রাফালের মিলগুলো দেখা যাক। প্রথমত, দুটোই প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত চুক্তি। একটি কামান, অন্যটি যুদ্ধবিমান। দ্বিতীয়ত, ৩০ বছর আগে একার ক্ষমতায় দলকে মসনদে বসিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। ৩০ বছর পর সেই কৃতিত্বের অধিকারী নরেন্দ্র মোদিও। ২৮২ আসন জিতে নিজের ক্ষমতাতেই সরকার গড়ার অধিকারী হন তিনি। তৃতীয়ত, দুজনই চমৎকার ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন। চতুর্থত, দুই নেতাকেই মুখোমুখি হতে হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগের। বফর্সের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল দালালির, যা থেকে লাভবান নাকি কংগ্রেস, রাফালের ক্ষেত্রে অভিযোগ দুর্নীতির, যার সঙ্গে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নাকি জড়িত। কারণ, তিনি আগের চুক্তি অগ্রাহ্য করে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো নতুন চুক্তি করেছেন, বেশি দাম দিয়ে কম বিমান কিনেছেন এবং তা করার মধ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন কাছের শিল্পপতি অনিল আম্বানিকে, যিনি ডুবে রয়েছেন আকণ্ঠ দেনায়। পঞ্চমত, রাজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ঘুষ খেয়ে নিম্নমানের কামান কিনে (যা ছিল সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা প্রচার। কার্গিলের যুদ্ধ জয়ের নেপথ্য নায়ক ওই বফর্সই) দেশের সেনানীদের তিনি বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, যা কিনা নিতান্তই দেশদ্রোহের শামিল। মোদির বিরুদ্ধেও অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডকে (হ্যাল) বঞ্চিত করে রাফালের সঙ্গে তিনি চুক্তিবদ্ধ হতে সাহায্য করেছেন অনিল আম্বানির সংস্থাকে। এটাও দেশদ্রোহের শামিল।

এত মিলের মধ্যে অমিলও বিস্তর। রাজীবের বিরুদ্ধে আক্রমণ হেনেছিলেন তাঁরই সরকারের ২ নম্বর স্থানে থাকা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। তাঁকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা একজোট হয়েছিল। মোদির বিরুদ্ধে কিন্তু আক্রমণ এসেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের দিক থেকে। তা ছাড়া, মোদি মন্ত্রিসভার সবাই প্রধানমন্ত্রীর পাশে এককাট্টা দাঁড়িয়ে। রাজীবের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও মোদির বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার সরাসরি কোনো অভিযোগ নেই। রাজীবের বিরুদ্ধাচরণ করা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিল দেশের সব বিরোধী দল। রাফালের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পাশে সেভাবে কিন্তু জড়ো হয়নি অন্য বিরোধীরা। লড়াইটা প্রধানত একাই লড়তে হচ্ছে রাহুল গান্ধীর দলকে। অমিল রয়েছে আরও। ৩০ বছর আগে বিশ্বনাথ প্রতাপকে রাজীবের বিকল্প হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী শীর্ষ নেতারা। ৩০ বছর পর রাফাল বিতর্ক তুঙ্গে উঠলেও অধিকাংশ বিরোধী নেতানেত্রী রাহুলকে সর্বসম্মত নেতার আসনটা ছাড়তে রাজি নন। বরং, আঞ্চলিক রাজনীতির স্বার্থ দেখে কোনো কোনো দল মোদির কাছাকাছি থাকার সিদ্ধান্তে দৃঢ়। মস্ত অমিল অন্য এক ক্ষেত্রেও। তিন দশক আগের রাজীব গান্ধী ছিলেন এক অনিচ্ছুক রাজনীতিক। মায়ের আচমকা মৃত্যুর পর দলের হাল ধরতে যিনি বাধ্য হয়েছিলেন। তুলনায় নরেন্দ্র মোদি রাজনীতিক হিসেবে অনেক বেশি পরিপক্ব। রাজীবের মতো অ্যামেচারিশ মনোভাবের ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। বফর্স বিতর্ক রাজীবকে আত্মরক্ষায় টেনে এনেছিল। তিনি যুগ্ম সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) গড়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাফাল মোদিসহ গোটা দলকে আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। জেপিসি গড়ার ধারকাছ দিয়েও তিনি হাঁটতে রাজি হননি। বরং বারবার সম্মিলিতভাবে এটা প্রমাণে ব্যগ্র যে রাহুল মিথ্যাচারী।

রাজীব গান্ধীর চ্যালেঞ্জার বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের রাজনৈতিক অতীত ছিল নিষ্কলঙ্ক। পারিবারিক বা দলগত কোনো ভালোমন্দের দায় তাঁর ওপর বর্তায়নি। কংগ্রেসকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন নতুন দল ও মোর্চা গঠনের মধ্য দিয়ে। নরেন্দ্র মোদির চ্যালেঞ্জার রাহুল গান্ধীর দলের অতীত কিন্তু বিতর্কমুক্ত নয়। স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময় তাঁর দল কংগ্রেসই এই দেশ শাসন করে এসেছে। ভালো-মন্দের দায় তারা তাই অস্বীকার করতে পারে না। তা ছাড়া, ২০১৪ সালের ভোটে একাধিক দুর্নীতি হিমালয়ের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। ভোটের ইস্যু হয়েছিল কমনওয়েলথ, কয়লা, টু জি। পাশাপাশি চ্যালেঞ্জার হিসেবে অলঙ্ঘনীয় ছিল নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি। রাহুল সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

পাঁচ বছর আগে নরেন্দ্র মোদি ছিলেন অজানা ও অচেনা এক রাজনৈতিক বিস্ময়। কী তিনি করতে পারেন বা পারেন না, সে বিষয়ে কারও কোনো ধারণা ছিল না। পাঁচ বছর পর আজ কিন্তু নরেন্দ্র মোদি অজ্ঞাতকুলশীল নন। চেনা ও জানা এই প্রেক্ষাপটে বফর্সের মতো রাফালও শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে ভারতবাসী আজ তীর্থের কাক সেজে রয়েছে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech