সাগর–মহাসাগরে অক্সিজেন কমছে

  

পিএনএস ডেস্ক : ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাইয়ের বিখ্যাত মেরিনা সৈকত বিষাক্ত সাদা ফেনায় ঢেকে গিয়েছিল গত সপ্তাহে। বঙ্গোপসাগরের এই সাদা ফেনার জন্য মানবসৃষ্ট দূষণকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু বঙ্গোপসাগরই নয়, বিশ্বজুড়েই সামুদ্রিক পরিবেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাব পড়েছে। সমুদ্র অক্সিজেন হারাচ্ছে। এতে করে ঝুঁকিতে পড়ছে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ববাসীর ওপর।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) এক প্রতিবেদনে এই সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। স্পেনের মাদ্রিদে চলমান জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে গতকাল শনিবার ‘সমুদ্রের অক্সিজেন হারানো: সবার সমস্যা; কারণ, প্রভাব, পরিণতি ও সমাধান’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। সুইডেনের সরকার এই গবেষণায় অর্থায়ন করেছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর কাজ করে।


প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রের অক্সিজেন হারানোর প্রভাব হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এই সমস্যার প্রধান কারণ হলো স্থল থেকে সমুদ্রে মেশা বিভিন্ন রাসায়নিক ও পয়োবর্জ্য এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট নাইট্রোজেন। এসব কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে। উষ্ণায়নের ফলে ১৯৬০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে সাগর-মহাসাগরের পানি গড়ে ২ শতাংশ অক্সিজেন হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গ্রীষ্মমণ্ডলের কোনো কোনো জায়গায় অক্সিজেন হারানোর এই হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রেকর্ড করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সমুদ্রগুলো আর সামান্য অক্সিজেন হারালেও তার জীবতাত্ত্বিক ও জৈবভূরাসায়নিক প্রভাব হবে মারাত্মক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ষাটের দশকে বিশ্বের সমুদ্রগুলোর মাত্র ৪৫টি জায়গায় অক্সিজেনের মাত্রা কম ছিল। ২০১০ সালে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০তে। আইইউসিএন বলেছে, সমুদ্রের পরিবেশ দূষিত হয়ে ওঠার জন্য উপকূলবর্তী কারখানা ও কৃষিজমিতে ব্যবহার হওয়া রাসায়নিক অন্যতম দায়ী। এর ফলে প্রতিনিয়ত সমুদ্রের পানিতে ফসফরাস, নাইট্রোজেনের মতো উপাদান মিশছে। অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় সমুদ্র এখন আরও বেশি পরিমাণে তাপ ধরে রাখছে। অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানি অক্সিজেন কম ধরে রাখতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রে ক্রমবর্ধমান এই অক্সিজেন ঘাটতির কারণে এরই মধ্যে টুনা, মার্লিন, হাঙরের মতো বড় ও দ্রুতগামী মাছের প্রজাতিগুলো হুমকিতে পড়েছে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পাওয়ায় এসব প্রজাতির মাছ সমুদ্রের উপরিভাগে উঠে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু এই উপরিভাগে মিশছে মানবসৃষ্ট দূষণের নানা উপাদান। ফলে মাছের ওই প্রজাতিগুলো আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, এভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রের জলরাশি ৩ থেকে ৪ শতাংশ অক্সিজেন হারাবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এই হার হবে আরও বেশি। সমুদ্রের উপরিভাগের প্রথম এক কিলোমিটারে এই অক্সিজেন ঘাটতির প্রভাব পড়বে, যেখানে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য রয়েছে।

আইইউসিএনের বৈশ্বিক সামুদ্রিক ও মেরু কর্মসূচির সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও সংরক্ষণ বিভাগের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও প্রতিবেদনের সহলেখক ড্যান ল্যাফোলে বলেন, সমুদ্রের পানি একদিকে অক্সিজেন হারাচ্ছে, অন্যদিকে অম্লীয় হয়ে উঠছে, মানবজাতিসহ পুরো বিশ্বের ওপর যার প্রভাব হবে ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি এড়াতে অবশ্যই গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষিজমিতে রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে হবে, কলকারখানার ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিকসহ মানবসৃষ্ট দূষণ ব্যাপক হারে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

আইইউসিএনের বৈশ্বিক সামুদ্রিক ও মেরু কর্মসূচির পরিচালক মিনা এপস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে সমুদ্র যে হারে অক্সিজেন হারাচ্ছে, তা ভয়াবহ। ১৯৬০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে অক্সিজেন হারানোর এই হার চার গুণ বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, স্পেনের মাদ্রিদে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

পিএনএস-জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন