মুহাম্মদ (স)-এর ওপর যেসব পদ্ধতিতে ওহি নাজিল হয়েছিল

  

পিএনএস ডেস্ক: ‘আলিফ লাম মিম। এটি সেই গ্রন্থ যাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহভীরুদের জন্য এটি পথনির্দেশিকা।’ (সূরা বাকারা: ১-২)। পবিত্র কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর এ গ্রন্থ নাজিল হয়েছে। সময় ও প্রয়োজনের আলোকে কখনও অল্প পরিমাণে আবার কখনও বেশি পরিমাণে। এভাবে প্রায় ২৩ বছর লেগেছে পূর্ণ কোরআন নাজিল হতে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, কোরআন কীভাবে নাজিল হতো? ওহির মাধ্যমে। তা ঠিক। কিন্তু ওহির ধরন-রকম কেমন ছিল তা যদি জানা যেত! পাঠক! ওহির ধরন সম্পর্কে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে স্পষ্টভাবে। চলুন! জেনে নিই ওহি কীভাবে আসত।

রাসুল (সা.) এর কাছে ওহি নাজিল হতো মোট সাত পদ্ধতিতে:

প্রথম. ‘সিলসিলাতুল জারস’ তথা ঘণ্টা ধ্বনির পদ্ধতি : হারেস ইবনে হিশাম (রা.) রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ওহি আসে ঘণ্টার আওয়াজের মতো। এটা আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর।’ (বুখারি : ১/২)। মুহাদ্দিসরা বলেন, ঘণ্টার ধ্বনি বলে ফেরেশতাদের আগমনের কথা বোঝানো হয়েছে। ফেরেশতাদের পাখার ‘ফড়ফড়’ শব্দ বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘণ্টার মত ঢং ঢং বা ঝন ঝন আওয়াজ হতো। ইমাম খাত্তাবি (রহ.) বলেন, ‘এখানে ওহিকেই ঘণ্টার ধ্বনির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঘণ্টা যেমন বিরামহীনভাবে বাজতে থাকে, তেমনি বিরামহীনভাবে ওহি নাজিল হতে থাকে। আর হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন রাসুল (সা.)।’ শায়খ মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবি আরেকটি কারণ যোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঘণ্টার আওয়াজ কোন দিক থেকে আসে তা নির্ণয় করা যেমন কঠিন, তেমনি ওহি নাজিল হয় কীভাবে তা নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়ত।’ (ফাতহুল বারি : ১/১৬)।

দ্বিতীয়. ‘তামছিলুল মালাকি রজুলান’ তথা মানবাকৃতিতে ফেরেশতার আগমন পদ্ধতি: রাসুল (সা.) এর কাছে ওহির ফেরেশতা হজরত জিবরাঈল (আ.) মানবাকৃতিতে আসতেন। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কখনও কখনও ফেরেশতা মানবাকৃতি ধারণ করে আমার কাছে আসত। এ পদ্ধতিটি আমার জন্য সহজ ছিল।’ (আল ইতকান : ১/৪৬)। সাহাবিদের মধ্যে দাহয়িয়াতুল কালবি (রা.) এর সুরতে জিবরাঈল (আ.) আসতেন। এর কারণ হিসেবে মুহাদ্দিসরা বলেন, ‘এ সাহাবি অত্যধিক সুদর্শন ছিলেন। এতই সুন্দর ছিলেন যে, কখনও কখনও মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে চলতেন।’ (উমদাতুল কারি : ১/৪৭)। তাছাড়া একবার অপরিচিত লোকের বেশে জিবরাঈল (আ.) রাসুল (সা.) এর কাছে এসেছিলেন বলে হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস বুখারিতে এসেছে।

তৃতীয়. ‘ওহিয়ে কালবি’ তথা অন্তরে ঢেলে দেয়া পদ্ধতি: এটি একটি বিশেষ পদ্ধতি। নবীদের অন্তরে কিছু কথা আল্লাহপাক সরাসরি ঢেলে দেন। আবার জিবরাঈল (আ.) এর মাধ্যমেও ঢেলে দেন। এ ক্ষেত্রে জিবরাঈল (আ.) কে সামনে আসার দরকার হতো না। আবার কোনো কথা বলারও প্রয়োজন হতো না। এ পদ্ধতির একটি উদাহরণ হলো, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরিল (আ.) আমার অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিই তার রিজিক পূর্ণ না করা পর্যন্ত পৃথিবী ত্যাগ করবে না।’ (মুসতাদরাকাতুল হাকেম : ২/৪)।

চতুর্থ. ‘কালামুল ওহি’ বা আল্লাহর বাণী পদ্ধতি: আল্লাহ তাআ’লা সরাসরি নবীর সঙ্গে কথা বলতেন এ পদ্ধতিতে। তবে এ কথার ধ্বনি কোনো সৃষ্টির সঙ্গে মিল নেই। যিনি শোনেন শুধু তিনিই এর প্রকৃতি উপলব্ধি করতে পারেন। এটি ওহির মধ্যে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। কেননা এখানে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি তার নবীর সঙ্গে কথা বলেন। এ পদ্ধতিতে হজরত মুসা (আ.) এর ওপরও ওহি আসত। (মাদাজেুস সালেকিন : ১/৩৭)।

পঞ্চম. ‘ওহিয়ে মালাকি’ ফেরেশতার মাধ্যমে প্রেরিত ওহি পদ্ধতি: ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) এর মাধ্যমে প্রেরিত ওহিকে ওহিয়ে মালাকি বলে। কখনও ফেরেশতা পর্দার আড়ালে থেকে ওহি বলে চলে যান। আবার কখনও সামনে থেকে ওহি শুনিয়ে দেন। ফেরেশতা কখনও মানবাকৃতিতে আসেন। আবার কখনও নিজ সুরতে আসেন।

রাসুল (সা.) হজরত জিবরাঈল (আ.)-কে মোট তিনবার নিজ আকৃতিতে দেখেছিলেন। নবুয়তের প্রথম দিকে একবার। মিরাজের রাতে একবার। আরেকবার নবীজি (সা.) নিজেই জিবরাঈল (আ.) এর আকৃতি দেখতে চেয়েছিলেন। (উলুমুল কোরআন ওয়া উলুমুত তাফসির : ৩২)।

ষষ্ঠ. ‘রুইয়া সালিহা’ তথা সত্য স্বপ্ন পদ্ধতি: স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবীদের তার নির্দেশ জানিয়ে দিতেন। যেমন ইবরাহিম (আ.) কে স্বপ্নে বলে দিয়েছেন ছেলে ইসমাঈল (আ.) কে কোরবানি করতে হবে। আবার আমাদের নবী (সা.) স্বপ্নের মাধ্যমে ওমরা করার নির্দেশ পেয়েছিলেন। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনা ঘটে। (শরহে ফায়জুল কাবির : ২৪)। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ঘমুন্ত অবস্থায় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে রাসুল (সা.) এর ওপর ওহির সূচনা হয়। ওই সময় স্বপ্নযোগে তিনি যা প্রত্যক্ষ করতেন, সকালে তা সত্য হয়ে ধরা দিত।’ (বুখারি : ১/২)।

সপ্তম. জিবরাঈল ছাড়া অন্য ফেরেশতার পদ্ধতি: নবুয়তের শুরুর দিকে কয়েক বছর, বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে তিন বছর জিবরাঈল (আ.) ওহি নিয়ে আসেননি। তখন হজরত ইসরাফিল (আ.) ওহি নিয়ে আসতেন। তবে ইসরাফিল (আ.) কি কোরআন নিয়ে আসতেন নাকি সাধারণ নির্দেশনা নিয়ে আসতেন- এ বিষয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। একদল মুহাদ্দিস ও মুফাসসির বলেনে, ‘ইসরাফিল (আ.) এক-দুইটি সূরা নিয়ে এসেছেন।’ আরেক দল মুহাদ্দিস ও মুফাসসির বলেন, ‘না, সম্পূর্ণ কোরআন জিবরাঈল (আ.) এর মাধ্যমেই অবতীর্ণ হয়েছে।’ তাই ইসরাফিল (আ.) কর্তৃক সূরা নাজিলের বিষয়টি তারা সঠিক মনে করেন না। (ফাতহুল বারি : ১/২২-২৩)।

পিএনএস/আল-আমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech