কে বুঝবে তিনি এত বড় কেলেঙ্কারির আসামি!

  

পিএনএস ডেস্ক : তানভীর মাহমুদ হল-মার্ক কেলেঙ্কারি ও অস্ত্র মামলার আসামি। মামলার হাজিরা দিতে আদালতে আসা তানভীরকে দেখে কে বুঝবে তিনি একজন আসামি।

সরকারি কর্মচারীর ওয়াশরুম ব্যবহার করছেন। পুলিশের সামনেই আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। সিগারেটে টান দিতে দিতে আদালতে আসা তাঁর লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। আদালত কক্ষে অবস্থান করছিলেন স্ত্রী জেসমিন ইসলাম। দুজনেই এ মামলার আসামি।

গতকাল বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর সামনে বেলা পৌনে দুইটার দিকে কথা বলছিলেন তানভীর মাহমুদ। তাঁর পরনে ছিলেন সাদা হাফশার্ট আর অফ হোয়াইট প্যান্ট। হাতে সোনার আংটি। দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি একজন আসামি। আদালত কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কাছে আসা লোকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

এর মধ্যে আদালত কক্ষের ভেতর থেকে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বেরিয়ে এসে তানভীরকে জানালেন, তাঁর জন্য ওয়াশরুম পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। তানভীর তাঁর কাছে আসা লোকদের বাইরে দাঁড় করিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকেন।

ওয়াশরুমটি শুধু আদালতের কর্মচারীদের জন্য। কিছুক্ষণ পর আবার সিগারেট টানতে টানতে বেরিয়ে আসেন তানভীর মাহমুদ। আদালতের বারান্দার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরাও। তাঁরা কিছু বলতে চাইলে তানভীর হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন।

এর মধ্যেই সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পান তানভীর। সঙ্গে সঙ্গে আদালত কক্ষের ভেতর প্রবেশ করেন তিনি।

বিশেষ জজ আদালত-৪-এ তানভীর মাহমুদের কোনো মামলা গতকাল বুধবার শুনানির জন্য ছিল না।

গতকাল বিশেষ জজ আদালত-১-এ দুটি মামলা আর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-৫-এ একটি অস্ত্র মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। নির্ধারিত আদালত কক্ষ বাদ দিয়ে বিশেষ জজ আদালত-৪-এর ভেতরে তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলামও ছিলেন। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিন নারী পুলিশ সদস্য জেসমিন ইসলামকে হাজতখানায় নিয়ে যান।

মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোশারফ বলেন, ‘তানভীর ও ওই একই মামলার আসামি তুষার ও জেসমিন ইসলামকে আনা হয়েছে। তবে কোন আদালতে নেওয়া হয়েছে, তা রেজিস্ট্রার না দেখে বলতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি একজন আসামি অসুস্থ। তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়নি।’

প্রিজন ভ্যানে পাঠানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, তাদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে কী নির্দেশনা রয়েছে বলতে পারব না। মাইক্রোবাসে আনা হয়েছে, তাতে করেই আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন মামলার দুদকের কৌঁসুলি রুহুল ইসলাম বলেন, এ মামলার আসামি সফিজ উদ্দিন আহমেদ অসুস্থ থাকায় তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়নি।

যে কারণে সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। আসামি তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীকে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের বিশেষ কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে কৌঁসুলি রুহুল ইসলাম বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’

বিশেষ জজ আদালত-১-এর পেশকার মো. রবিউর ইসলাম বলেন, একজন আসামি আসেননি। তাই সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। আসামি তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলাম বিশেষ জজ আদালত-৪-এ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

হাজতখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আসামিদের যখন বিশেষ জজ আদালত-৪-এর এজলাস কক্ষে রাখা হয়েছিল, তখন আমি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এক আসামিকে বুঝিয়ে দিতে গিয়েছিলাম।’

বিশেষ জজ আদালত-৪-এর একতলা নিচেই আরেকটি ওয়াশরুম। তার পাশেই পান-সিগারের দোকান নিয়ে বসে আছেন বাচ্চু মিয়া। সঙ্গে সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাছে নাম জিজ্ঞেস করতেই বাচ্চু মিয়া বললেন, ‘ও (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) কথা বলতে পারেন না। আর আমি চোখে দেখি না। তাই কে ওয়াশরুম ব্যবহার করেছে বলতে পারব না। তবে আদালতের কর্মচারীরা এটা ব্যবহার করে থাকেন। মাঝে মাঝে আসামিরা ব্যবহার করে থাকেন।’

আদালত সূত্রে জানা যায়, গতকাল হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা দুটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এ দুটি মামলার বিচার চলছে। মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের ছয়তলায় এজলাস। আর পঞ্চম তলার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৫-এ অস্ত্র মামলার বিচারকাজ চলছে। এ মামলায় সাক্ষী না আসায় আদালত নতুন তারিখ ধার্য করেছেন।

হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১২ সালে ৩৮টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে ১১টি মামলায় অভিযোগপত্র দেয় দুদক। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালে মোট ৩৮টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এর মধ্যে প্রায় ৩৭২ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ২৭টি মামলা করা হয়। ২০১৪ সালে ফান্ডেড (স্বীকৃত বিলের বিপরীতে দায়) ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৬ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়।-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech