১৪ শতাংশ সংবাদে পুরোপুরি বিশ্বাস

  

পিএনএস ডেস্ক : দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি বিশ্বাস করে। বাকি ২৪ শতাংশ মোটামুটি ও ৫৮ শতাংশ সংবাদের কোনো কোনো ঘটনার বিবরণ পাঠকদের মনে সন্দেহ তৈরি করে। প্রকাশিত সংবাদের মাত্র ৮ শতাংশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়। বাকি সংবাদে কোনো না কোনো ঘাটতি থেকে যায়।

বেসরকারি সংগঠন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) পরিচালিত এক গবেষণায় এই মতামত উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের সহায়তায় এ গবেষণা হয়। আজ বৃহস্পতিবার ‘সংবাদবোধ এবং খবরের নীতি-নৈতিকতা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়। পিআইবি, এমআরডিআই ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রাজধানীতে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মিলনায়তনে ওই অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন এমআরডিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুর রহমান।


অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের শীর্ষ সাংবাদিকেরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো সংবাদ ছাপা হবে কি হবে না, তা নিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও বিজ্ঞাপনদাতাদের পক্ষ থেকে প্রভাব তৈরি করা হচ্ছে বলেও মত দেন তাঁরা। গণতন্ত্রের স্বার্থে গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তাঁরা।

গবেষণার জরিপে দেখা গেছে, গণমাধ্যমের যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়, তার ৪৪ শতাংশেই গণমাধ্যমের নীতি-নৈতিকতা অনুসরণ করা হয় না। ২৫ শতাংশ অনুসরণ করা হয়। আর ৩১ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে মত দিয়েছেন। ৯৬ শতাংশ অবশ্য মনে করে, সংবাদমাধ্যমের উচিত নীতি-নৈতিকতা মেনে প্রতিবেদন তৈরি করা।


হাসিবুর রহমান জানান, ঢাকাসহ দেশের ছয়টি এলাকায় ওই জরিপটি করা হয়েছে। এ জন্য তাঁরা ১৪০ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে প্রশ্নমালার ভিত্তিতে মতামত নিয়েছেন। বিষয়ভিত্তিক দলীয় আলোচনা (এফজিডি) করেছেন ৬০টি, ৩৫টি বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ও ৬০টি মতবিনিময় সভা করেছেন। গবেষণায় উঠে আসা সুপারিশ হিসেবে তিনি পাঠক ও সংবাদকর্মীদের মধ্যে মতবিনিময়ের আয়োজন করেন। সংবাদবোধ ও নৈতিকতার বিষয়টিকে পাঠ্য বইতে যোগ করা এবং সংবাদমাধ্যমের মালিক ও ব৵বস্থাপকদের পাঠকদের মতামতগুলো জানানো।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দেওয়া বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশের সংবিধানে গণমাধ্যমের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে দেশবিরোধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ’৭১-এর পরাজিত এই শক্তি যাতে দেশকে পেছনে টেনে ধরার সুযোগ না পায়, সে জন্য গণমাধ্যমকে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি। সংবাদপত্রগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সংবাদপত্র যাতে মালিকদের প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যম না হয়, করপোরেটসের মুখপাত্র না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে যাতে মানুষের অধিকার হনন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, দেশের সংবাদমাধ্যম যতটুকু স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করছে, ততটুকু অন্য অনেক দেশেই নেই। তিনি সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করেন যার সূত্র উল্লেখ করে আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। সরকারের কাছে পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারি।

অনুষ্ঠানে পিআইবির মহাপরিচালক মো. শাহ আলমগীর বলেন, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক বান্দরবানের থানচিতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁর উচিত ছিল সেখানে যাওয়ার আগে ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া। এভাবে আমাদের নিজেদেরও সংবাদ সংগ্রহের ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে জনগণের স্বার্থে সত্য প্রকাশ করা।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, কোনো সংবাদের যদি সূত্র জানা না যায়, তাহলে তা প্রকাশ করাই উচিত না। আর ভুল হলে তা স্বীকার করা উচিত। এতে পাঠকদের আস্থা বাড়ে, কমে না। তবে ভুয়া খবর প্রকাশ আটকানোর নামে গণমাধ্যমকে দমন করা উচিত নয় বলে মত দিয়ে তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশে বাধা আসলে দেশে গুজব বেড়ে যাবে।

টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন বলেন, গণমাধ্যমের ওপর মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনপক্ষ ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার চাপ আছে। এসব অনেক কারণে দেশে জনমুখী সাংবাদিকতা হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বার্তা সংস্থা ইউএনবির নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াতে সুশাসনের অভাব আছে। ফলে এসব গণমাধ্যমে সুসাংবাদিকতা আশা করা কঠিন।

টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্টের প্রধান বার্তা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পরও দেশের কয়েকজন সম্পাদকদের একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছে। ওই সংবাদের একটি প্রতিবাদলিপি ধরিয়ে দিয়ে সাংবাদিকদের কোনো মন্তব্য ছাড়াই তা প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক খ আলী আর রাজি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে, চ্যানেল আই অনলাইন সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খানসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা।

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech