'ঈদ তো স্যারেগো, ম্যাডামগো। আমগো ঈদ আইবো কোনহান থিকা?'

  

পিএনএস ডেস্ক : রাজধানীরবাসীর একটি বড় অংশ ঈদের কেনাকাটা শেষে পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। মাস জুড়ে চলেছে ধুন্ধুমার কেনাকাটা, চাঁদরাতেও খোলা বিপনিবিতান। কিন্তু সবার জীবনে ঈদ আসে না।

এই যেমন ছিন্নমূল মানুষদের। কঠিন বাস্তবতায় কেউ শৈশবে হারিয়েছেন স্বজন, পড়াশোনা করে একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্নও মাঠে মারা গেছে তাদের।

ঈদে নিজের জন্য নতুন জামা, জুতা কেনা হয় না বহুজনের। অন্যের দেয়া উপহার মিললেই কেবল নতুন কাপড়ের সুবাস নিতে পারে তারা।

রাজধানীর বিভিন্ন ঘুরে দেখা গেছে এমন সুবিধা বঞ্চিতদের। মোহাম্মদপুর এলাকায় কথা হয় সায়মার সঙ্গে। ভাঙারি নামে পরিচিত ফেলে দেয়া জিনিসপত্র কুড়িয়ে কোনো রকমে খাওয়ার টাকা যোগাড় করে কিশোরী মেয়েটি।

বাবা-মায়ের হদিস জানে না, বয়স কতো, সেই ধারণাও নেই। তবে শরীর যতটা বেড়েছে, তাতে বোধ হয় বয়সটা ১২ থেকে ১৪ হওয়ার কথা। ফুটপাতেই বড় হয়েছে মেয়েটি, সেখানেই তার বসবাস।

ঈদে কী করবে- এমন প্রশ্নে সায়মার জবাব হতাশা আর ক্ষোভে পরিপূর্ণ। বলে, ‘ঈদ কি আমগো নাকি? ঈদ তো স্যারেগো, ম্যাডামগো। আমগো ঈদ আইবো কোনহান থিকা? খাইতে পারি না, নতুন কাপুড় কিনমু কী দিয়া? ঈদ-টিদ আমাগো লাইগা আহে না।’

বাবা লাপাত্তা জন্মের আগে। ৪/৫ বছরের বছর বয়সে মাও পালিয়ে গেছে। এখন সুরুজের সঙ্গী কেবল একটা বস্তা আর রাজধানীর পিচ ঢালা রাস্তা। কারওয়ানবাজার এলাকায় সুরুজের দেখা পাওয়া যায়। একাকিত্তের সংসার পেতেছে ১২ বছর বয়সী এই শিশুটিও।

প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে দিন ভর যা আয় হয়, দিন ফুড়তে তার পুরোটাই ফুড়িয়ে যায়। খাওয়াই জোটে না যার, নিত্য বকুনিতে শৈশব যার কাছে দুঃসহ, তার আবার ঈদ কী?

‘বাপ তো আমি হওয়ার আগেই গেছে গা। মায় ফালাইয়া থুইয়া গেছে। বিয়া করছে, না মইরা গেছে জানি না। আমার তো কেউ নাই। কেডা কি দিব? হারাদিন বোতোল টোকাই, যা পাই, তা দিয়া খাই। জামা কিনমু কী দিয়া?- জন্মের পর অমানবিকতা দেখে আসা সুরুজ এই সমাজকেই চ্যালেঞ্জ করে বসল কি না, তাই ভাবার সুযোগ দিল শিশুটির জবাব।

‘অনেকে ঈদের আগে জামা-কাপুড় দেয়। গায়ে যেডি দেখতাছেন তাও মানষে দিছে। এইবার কেউ কিছু দিল না।’

দরিদ্রদের মাঝে ঈদের পোশাক বিতরণ হচ্ছে নিত্য দিনই। তবে সুষম বন্টনের অভাবে সব পথশিশু ও হতদরিদ্ররা বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে ঈদের আনন্দ থেকে।

কত মানুষ ঢাকা ছেড়ে গেল ঈদ করতে, কিন্তু গেলেন না আবদুল করিম। রিকশা চালান তিনি। বাড়ি যেতে মন চায়, কিন্তু উপায় নেই।

কারণ কী? জবাব আসল, ‘বউ- পোলাপান বাড়ি রাইখা ঢাকায় আইছি টাকার লাইগ্যা। বছরের একটা দিন, টাকাই যদি না কামাই তাইলে ঢাকা থাইক্যা লাভটা কি?’

ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছেড়ে গেছেন কমসে কম কোটি মানুষ। তবে ভাটা পরেনি রিকশাচালকদের আয়ে। ঈদের কয়েকদিন সব সড়কে আছে চালানোর সুযোগ। সেই সঙ্গে আছে ঈদের ‘বকশিস’।

তার উপর ভাড়ায় রিক্সা চালান, এমন চালকদের জন্য রিক্সা মালিকদের পক্ষ থেকে আছে নানা সুবিধা। বছরের এই একটা দিন ভাড়ায় রিক্সা চালায় এমন চালকদের থেকে জমা নেন না কোনো কোনো রিকশা মালিক। এই সুবিধা পেয়েছেন করিমও।

শ্রমজীবী মানুষটি বলেন, ‘ঈদের দিন গাড়ি ফ্রি। মাহাজন একটা লুঙ্গিও দিছে। আবার ঈদের দিন সকালে সেমাই, নাস্তা ফ্রি।’

কামরাঙ্গীরচর এলাকার ইজিবাইক চালক আল আমিন বলেন, ‘যারা সারা বছর ভাড়ায় গাড়ি চালায় ঈদের দিন তাগো লাইগা গাড়ি ফ্রি। বছরে একটা দিন তো ড্রাইভাররা ফ্রি পাওয়ার কথাই। কিন্তু এইডা একদিন না দিয়া ঈদের তিন দিন দেওয়া উচিত। ড্রাইভাররা সারা বছর মালিকরে তো কম টাকা দেয় না। এই তিন দিন ড্রাইভাররে মালিক ফ্রি গাড়ি চালাইতে দিব না?’

আল আমনেরও বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করা হবে না। তবে কত মানুষকে তিনি গন্তব্যে যেতে সহায়তা করেছন, সেটি গুণার উপায় নেই। এ নিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি তার আছে।

সূত্র: ঢাকা টাইমস

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech