সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস

  

পিএনএস ডেস্ক: সড়কে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে’ প্রাণহানি ঘটালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। পাস করা আইনে কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এবং সেই দুর্ঘটনায় কেউ আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রাণহানির দায়ে অভিযুক্তদের অপরাধ জামিনযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দুর্ঘটনাজনিত অন্যান্য অপরাধ আপসে মীমাংসার জন্য পুলিশকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

বুধবার রাতে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিলে জনমত যাচাই-বাছাই ও কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন বিরোধীদল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ, ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম মিলন, বেগম নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, বেগম মাহজাবীন মোরশেদ, বেগম রওশন আরা মান্নান ও শামীম হায়দার পাটোয়ারী। কিন্তু তাদের সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। তারা বিলের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সেগুলো গৃহীত হয়নি।

বিল পাসের আগে ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার শাস্তির বিষয়টি সম্পর্কে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘অনেকে বলেন ডেলিভারেটলি কিলিংয়ের (ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড) ক্ষেত্রে কী শাস্তি হবে? এটা কি পাঁচ বছরেই থাকবে? আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। কেউ ডেলিভারেটলি কিলিং করলে প্যানাল কোডের ৩০২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কাজেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট । তাছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও আছে। সব কিছু মিলিয়ে শাস্তিটা কম নয়। অপরাধ অনুযায়ীই শাস্তি সেভাবে হবে।’

দীর্ঘ এক বছর ঝুলে থাকার পর আলোচিত এই নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়। রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয়। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি বিলটি পাসের সুপারিশ করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করেছে বলে এই বিলটি তড়িঘড়ি করে সংসদে আনা হয়েছে- এটা ঠিক নয়। বিলটি দেড় বছর আগে মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ৫৭ পৃষ্ঠার এই বিল এক দিনে আসেনি। অনেক আলাপ-আলোচনার সোনালী ফসল এই বিলটি।’

এর আগে বিলের ওপর আনীত জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

আইনের পাঁচ দফায় আনীত সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়, অনুমতিপত্র ছাড়া গণপরিবহণ চালানো যাবে না। এর সঙ্গে ‘অনুমতিপত্র অহস্তান্তরয়োগ্য হবে এবং অনুপতিপত্রের অধীন রুটে পরিচালিত গণপরিবহণের দায়ভার অনুপতিপত্রের অধিকারীর ওপর ন্যস্ত হবে-৫ (২) দফায় যুক্ত হবে। এছাড়া আরও তিনটি শব্দগত সংশোধনী গৃহীত হয়। অপরাপর সংশোধনীগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

বিলে অপরাধ, বিচার ও দণ্ড অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে পেনাল কোডের ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৮৯-এ ভিন্নতর কিছু না থাকলে, সাব ইনসপেক্টর বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা আদলতে অবহিত করলে এ আইনের অধীনে সব অপরাধ আমলযোগ্য হবে। তবে আইনের ৮৪ (মোটরযানের কারিগরি ত্রুটি), ৯৮ (ওভারলোডিং ও বেপরোয়াগতি মোটরযান চালানো) ও ১০৫ (দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধসমূহ ছাড়া অপর সব অপরাধ জামিনযোগ্য হবে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ বা সমমর্যাদার কর্মকর্তাকে এ আইনের ৬৬ (ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো), ৭২ (রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মোটরযান চালালে), ৭৫ মোটরযানের ফিটনেস না থাকলে), ৮৭ (মোটরযানের গতি অনিয়ন্ত্রিত হলে), ৮৯ (ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে) এবং ৯২ (নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করে গাড়ি চালালে) ধারায় বর্ণিত অপরাধসমূহ আপস মিমাংসা করতে পারবেন।

এছাড়া অপরাধসমূহ নির্ধারিত টার্মিনাল চার্জ ব্যতীত পাবলিক প্লেসে মোটরযান চলাচলের জন্য অবৈধভাবে কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না, করলে প্যানাল কোডের অধীন চাঁদাবাজির অপরাধ বলে গণ্য হবে। তবে বিলে মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। চাঁদার অর্থ মোটরযান দুঘর্টনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা খরচ বাবদ প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এজন্য সরকার কর্তৃক আর্থিক সহায়তা তহবিল পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হবে। সরকার ট্রাস্টির চেয়ারম্যান নিয়োগ করবেন এবং এটি একটি স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান হবে।

বিলে আরও বলা হয়, লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। শ্রম আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চুক্তিছাড়া কাউকে কন্ডাক্টর নিয়োগ করতে পারবে না। গণপরিবহন পরিচালনার জন্য সরকারি গেজেট দ্বারা প্রতিটি মহানগর, বিভাগ এবং জেলায় একটি করে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি গঠিত হবে। কমিটিতে পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক প্রতিনিধি থাকবেন। কমিটি রুট পারমিট প্রদান করবেন।

পিএনএস/হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech