ইউএনও নবাবগঞ্জকে লাল সালাম

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : রাজনীতিবিদ আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক। মাঠ-ময়দানসহ কার্যক্ষেত্রে সেটার খুব একটা প্রমাণ মিলছে না। অনেকটা কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই অবস্থা। তবে ব্যতিক্রম যে কেউ নেই, সেটা তো হলফ করে বলা যায় না। এখনো রাজনীতিবিদ আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে নীতি ও আদর্শবান দুচারজন আছেন, যাদের কারণে সমাজটা এখনো টিকে আছে।

দিনাজপুরের আশুড়ার বিলে কচুরিপানা পরিষ্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গলাপানিতে নামেন নবাবগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মশিউর রহমান। ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত নবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক আশুড়ার বিলে এ অভিযান চালান তিনি। এ সময় তিনি নিজেই পানিতে নেমে পড়েন। একসময়ের লাল-সাদা শাপলা ও পদ্ময় ভরপুর দৃষ্টিনন্দন বিলটি অবৈধ দখলদারদের কারণে হারিয়ে ফেলে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য। বাঁশের বেড়া আর কচুরিপানা দিয়ে বিলটি ভরে গেছে। তাই বিল পরিষ্কার ও দখলদারদের হাত থেকে আশুড়ার বিলকে উদ্ধারের জন্য সপ্তাহজুড়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন তিনি।

বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও তিনি যেভাবে চাইছিলেন, ঠিক সেভাবে কাজটি হচ্ছিল না। ২১ সেপ্টেম্বর তাই নিজেই নেমে পড়েন বিলে। টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা বিলের কাদা-পানিতে পরিষ্কার করেন কচুরিপানা। উচ্ছেদ করেন অবৈধ স্থাপনাগুলো। স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিলে নামতে দেখে স্থানীয় প্রশাসনের অন্য কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারাসহ জনসাধারণও নেমে পড়েন বিলে। তারাও যোগ দেন পরিষ্কারের-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে। মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামীম হোসেন সাংবাদিকদের জানান, ৩৬০ হেক্টর এলাকাজুড়ে আশুরা বিল। এখানে দেশীয় মাছ লাল খলশে, কাকিলা, ধেধলসহ বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ পাওয়া যায়।

অভিযানে অংশ নেওয়া নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিলের কাদা পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবেন তা স্বপনও ভাবিনি। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী বিলটি এক সময় উত্তরাঞ্চলের ভ্রমণ-পিপাসুদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ছিল। দখলদারদের কারণে বিলটির ঐতিহ্য হারিয়েছে। এটি রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় লোকজনের ছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মশিউর রহমানের ব্যতিক্রমী অভিযান তাদের চোখ খুলে দিয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মশিউর রহমান বলেন, জাতীয় উদ্যানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এ বিলটি দেশের অমূল্য সম্পদ। একসময় এ বিলজুড়ে ফুটত লাল-সাদা শাপলা ও পদ্ম ফুল। শীতে অতিথি পাখিরা আসত। পাখির কলরবে মুখরিত থাকত এই এলাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে একদল প্রভাবশালী মানুষ বিলটি দখলে নিয়েছিল। বিলটিকে বাঁশের বেড়া, মাচা দিয়ে অসংখ্য ভাগে ভাগ করে ফেলেছিল। কচুরিপানায় ভরে গিয়েছিল পুরো বিল। হারিয়ে গেছে শাপলা, পদ্ম ফুল। শীতকালে ধান চাষ করায় ফসলে কীটনাশক ব্যবহারে হারিয়ে গেছে বহু দেশী প্রজাতির মাছ। তাই অতিথি পাখি এখন আর আসে না।

আশুড়ার বিলে কচুরিপানা পরিষ্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিলজুড়ে লাগানো হচ্ছে শাপলা, পদ্ম। ফিরিয়ে আনা হবে বিলটির হারানো ঐতিহ্য। আর এ জন্যই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তাৎক্ষণিকভাবে বিলের পানিকে নেমে এটি পরিষ্কার ও দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধারে স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে বিলে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনেন। পাশাপাশি লাল পদ্ম লাগিয়ে এটির সৌন্দর্য ফিরে আনার যে উদ্যোগ নেন, এটাকে স্বাগত জানানো প্রতিটি সচেতন মানুষের কর্তব্য। ভালো কাজকে ভালো না বললে মানুষ কাজ করে পরিতৃপ্ত হবেন কী করে। যে কোনো কাজের যৌক্তিক মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও প্রসংশা কাজের গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয় বৈকি। কিন্ত যারা এমনটা করেন, তারা কখনো সেটা ভেবে করেন না। দায়বোধ থেকে তা করেন বটে।

ছোটকালে প্রঅয় প্রতি বর্ষায় পুকুরে এবং বাড়ির পাশের খালে কচুরিপানা পরিষ্কার করেছি। সেটা করতে জন্মদাতা বাবা বাধ্য করতেন। পাট পচানোর জন্য জাগ দিয়ে উপরে অনেক উঁচু করে কচুরিপানা দিতে হতো। সেটাও করেছিলাম। এমনকি কচুরিপানার বড় একটা ঢিবি তৈরি করে পচিয়ে তাতে লাঊয়ের বীজ লাগাতেন বাবা। এ কাজগুলো করতে গিয়ে কচুরিপানার কারণে পচা পানিতে চুলকানির কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে নানা ধরনের পোকার উৎপাত এবং সাপের উপস্থিতির বিষয়। এখন কোটি টাকা দিলেও আমাকে দিয়ে সে কাজ করা কঠিন হবে বৈকি। অথচ অফিসের এসি রুমের আরাম কেদারা ছেড়ে, বিলের গলাপানিতে নেমে যিনি কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজে অংশ নিলেন এবং দখলদারদের কবল থেকে স্থাপনা উচ্ছেদে ভূমিকা রেখেছেন, তাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। তার এ অম্লান ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় বটে।

বিলের পানির স্বাভাবিক গতি, প্রকৃতি সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মশিউর রহমানের অবদান স্মরণীয় বৈকি। পরিবেশবিদদের পক্ষ থেকে তাকে লাল সালাম। তিনি প্রমাণ করলেন প্রকৃত অর্থেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক। আর এটা করে তিনি ছোট হননি; বরং বিসিএস ক্যাডারের মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, তারা কিনা পারেন। সব বিষয়ে সমান দক্ষ। সে জন্য তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করছি। আমাদের প্রশাসনে মশিউর রহমানের মতো অনন্য সাধারণ মানুষের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, ততই দেশ ও জাতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech