কাঁদছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা

  

পিএনএস ডেস্ক : জন্ম নিবন্ধন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা একটি অফিসয়াল বৈঠকে বলেছিলেন, আমি মনে করি আমরা যারা বাংলাদেশে আছি তাদের সবার উচিত ৩ শ্রেণীর মানুষকে প্রতিদিন একবার করে হলেও স্যালুট করা। এই তিন শ্রেণীর মানুষ হচ্ছে কৃষক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং গার্মেন্টস শ্রমিক। কারণ, এই তিন শ্রেণীর মানুষ আছে বলেই নিত্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও বাংলাদেশের মানুষ কোনো রকম দু’বেলা খেতে পারছে, কোনো রকম টিকে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

ন্যায্য অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামলে গার্মেন্টস শ্রমিকরা পুলিশের হাতে মার খায়, কৃষক ফলনের ন্যায্য দাম না পেয়ে অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করে। আর প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিমানবন্দরে গিয়ে নাজেহাল হয়, চাঁদা দিতে দেরী হওয়ায় দেশের মাটিতে খুন হয়। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর নানা ঝামেলা পেরিয়ে একটু হলে দেশের মাটিতে শান্তিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা পড়েছে বিপদে। কারণ, বাংলাদেশ সরকার আইন করেছে যে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা জন্ম নিবন্ধন ছাড়া ডিজিটাল পাসপোর্ট বানাতে পারবে না।

প্রথম দিকে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস জন্ম নিবন্ধন ছাড়া ২০ রিয়াল ফি এর বিপরীতে ডিজিটাল পাসপোর্টের জন্য এনালগ পাসপোর্ট জমা নিলেও মাঝে মাঝে বন্ধ করে দেয়।

এদিকে অতিকথন, হুমকি, দূতাবাসে পাসপোর্টের কাজে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের গালাগালিতে পারদর্শী রিয়াদ দূতাবাসের কর্তারা ২৪ নভেম্বর ২০১৫ এর আগে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে পাসপোর্ট দিতে পারবে না তাই আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে মালেশিয়ার প্রতিষ্ঠান আইরিশ বারহাটকে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দায়িত্ব দেয় ডিজিটাল পাসপোর্ট কার্যক্রমের।

রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাসের পাশাপাশি আইরিশ বারহাটও কাজ শুরু করে ডিজিটাল পাসপোর্ট প্রকল্পের। আইরিশ বারহাট কাজ শুরুর দিকে ২০ রিয়াল ফি এর বিনিময়ে এনালগ পাসপোর্টের জমা নিয়ে ডিজিটাল পাসপোর্টের কাজ শুরু করলেও হঠাৎ করে জন্ম নিবন্ধন ছাড়া ডিজিটাল পাসপোর্ট জমা নেয়া বন্ধ করে দেয়। কেন এমন সিদ্ধান্ত? এ নিয়ে আইরিশ কর্মকর্তারা মুখ না খুললেও বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে দূতাবাসের স্পষ্ট নির্দেশনা আইরিশ বারহাট জন্ম নিবন্ধন ছাড়া কোনো এনালগ পাসপোর্ট জমা নিতে পারবে না। তাই আইরিশ বারহাট বাধ্য হয়েছে জন্ম নিবন্ধন ছাড়া হাতে লেখা পাসপোর্ট জমা নেয়।

এদিকে সৌদি আরবের মত বিশাল আয়তনের দেশের ৫০০-২০০০ মাইল দূরের শহর থেকে শত শত রিয়াল খরচ করে রিয়াদে ডিজিটাল পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে আসা হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি পড়েছে বিপদে। শত শত মাইল দূর থেকে আসা সহজ সরল বাংলাদেশিরা পাসপোর্ট জমা দিতে না পেরে কারো চোখে টলমল করছে, কেউ হতবিহ্বল হয়ে যাকেই সামনে পাচ্ছে তাকে জিজ্ঞাসা করছে, আমি এখন কি করব? কারণ, ৯০ ভাগ প্রবাসী বাংলাদেশি জানে না জন্ম নিবন্ধন ছাড়া ডিজিটাল পাসপোর্টের আবেদন জমা দেয়া যায় না।

জানবেই কি করে? বাংলাদেশ সরকার ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়ায় কোনো রকম প্রচারণাই চালায়নি। চালাচ্ছেও না যে, জন্ম নিবন্ধন ছাড়া ডিজিটাল পাসপোর্টের আবেদন জমা দেয়া যায় না।

বাংলাদেশের ডিজিটাল সরকার সমুদ্র বিজয়, কোন মন্ত্রী কি পুরস্কার পেয়েছে, কে ডিজিটাল বাংলাদেশের জনক কত কিছুর প্রচারণা চালায়! অথচ ৩০-৫০ লাখ টাকা খরচ করে ডিজিটাল পাসপোর্টের জন্য ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়ায় কোনো রকম প্রচারণা চালাচ্ছে না।

হঠাৎ করে কেন নিবন্ধন বাংলাদেশ থেকে আনা ছাড়া ডিজিটাল পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে পারবে না প্রবাসী বাংলাদেশিরা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ঠেকাতেই এমন সিদ্ধান্ত। যে দেশে হাজার তিনেক টাকা ঘুষের বিনিময়ে পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশনের সার্টিফিকেট পাওয়া যায় সে দেশ থেকে প্রবাসে বাংলাদেশি দালাল ধরে বাংলাদেশ থেকে যে ২০০/৩০০ রিয়ালের বিনিময়ে অনলাইনে ভেরিফাই করা জন্ম নিবন্ধন আনা যায় তা রোহিঙ্গারা ভাল করেই জানে। শুধু জানে না ডিজিটাল সরকার!

রোহিঙ্গা ঠেকাতে গিয়ে সরকার রোহিঙ্গাদেরই সুযোগ করে দিচ্ছে। দালাল ধরে বাংলাদেশ থেকে জন্ম নিবন্ধন এনে আইরিশ বারহাট কিংবা বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে হাতে লেখা পুরাতন পাসপোর্ট এবং জন্ম নিবন্ধন জমা দিলেই ডিজিটাল পাসপোর্টের আবেদন জমা নিতে বাধ্য দূতাবাস এবং আইরিশ বারহাট। কারণ, জন্ম নিবন্ধন দেয়া ব্যক্তিটি যে সনদ দিয়েছে তা অনলাইনে ভেরিফায়েড আছে কিনা শুধু তা দেখা হয়। যে ঠিকানা থেকে আনা হয়েছে সে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বারকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় না যে অমুক গ্রামের এত নম্বর ওয়ার্ডের তমুক আদৌ সে গ্রামের অধিবাসী কিনা।

বাস্তব সত্যি হচ্ছে, জন্ম নিবন্ধন দিয়ে নয় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি ডিজিটাল পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে পারবে শুধু বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আইরিশ বারহাটের যে অফিসাররা ডিজিটাল পাসপোর্ট জমা নেয় তারা। কারণ, তারা অ্যাপ্লিকেন্টকে নানারকম প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে পারবে ব্যক্তিটি আদৌ বাংলাদেশি কি না।

সরকারের আদৌ বোধদয় ঘটবে কিনা আমরা জানিনা। আমরা এও জানিনা যে সরকার জন্ম নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশিদের ডিজিটাল পাসপোর্ট জমা দেবার সুযোগ করে দিবে কিনা। আমরা শুধু জানি যে, সৌদি আরবের এখনো ডিজিটাল পাসপোর্ট না পাওয়া ২২ লাখের মধ্যে যদি ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি ২৪ নভেম্বরের আগে ডিজিটাল পাসপোর্ট পেতে ব্যর্থ হয় তাহলে রেমিটেন্সে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিদেশের মাটিতে নানা রকম হয়রানির শিকার হবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech