নতুন জোট গঠন নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ

  


পিএনএস ডেস্ক: সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক উত্তাপও ততই বাড়ছে। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। দল ভারী করার জন্য নির্বাচনের আগে ছোট ছোট দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হচ্ছে নতুন জোট। ইতোমধ্যে বামপন্থী আটটি দলের সমন্বয়ে সিপিবির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট হয়েছে। আগামীতেও ডান ও বামপন্থী ছোট ছোট দলগুলো নিয়ে একাধিক জোট গঠন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই জোটগুলো আগামী নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। এসব জোট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিংবা বিরোধী ২০ দলীয় জোটের সাথে আপাতত না গেলেও ভেতরে ভেতরে চলছে নানা সমীকরণ। প্রকাশ্যে তেমন কিছু না বললেও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এ নিয়ে অনেকটা চিন্তিত বলে একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এ দলগুলো মিলে নতুন একটি বাম রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে। নতুন জোট গঠনের ওই একই দিনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় মহাজোটের বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স, সম্মিলিত ইসলামিক জোট, কৃষক শ্রমিক পার্টি, একামত আন্দোলন, জাগো দল, ইসলামিক ফ্রন্ট এবং গণতান্ত্রিক জোটসহ ৯টি দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এরপরের দিন রাতে জরুরি বৈঠকে বসে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি এবং নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গত ডিসেম্বরে গঠিত যুক্তফ্রন্টের নেতারা। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে সমদূরত্ব রেখে জাতীয় ঐক্য গঠনের আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্য দিকে বিএনপিও বর্তমান সরকারকে হটাতে বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা বলছে।

এ নিয়ে এখন দরকষাকষি চললেও বিভিন্ন জোটের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে যে পদ্ধতিতেই জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠুক না কেন তা যে সরকারের পক্ষে না সেটা মোটামুটি স্পষ্ট। নতুন বামপন্থী জোটের বাইরে জাতীয় মুক্তি জোট নামে আরেকটি বামপন্থী জোট সক্রিয় রয়েছে। যাতে রয়েছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট বদরুদ্দিন উমরের জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণফ্রন্টসহ বেশ কয়েকটি দল। এর বাইরেও যেসব বামপন্থিদল আছে তাদের অবস্থানও সরকারের পক্ষে নেই। বিভিন্ন সমাবেশের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান ইতোমধ্যে পরিষ্কার করেছে। ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর এ জোট গঠন এবং নির্বাচন সামনে রেখে নতুন তৎপরতা ক্ষমতাসীনদের ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই জোট গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়। এতে কিছু নেতা আছেন, যারা জনগণের কাছে নিজেদের মূল্য যাচাই করে নেন। আবার অনেক রাজনীতিক আছেন, এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। অনেকেই অনেক এজেন্ডা নিয়েও নামেন। এবারো তেমন কিছু যে একেবারে নেই সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এ দিকে ছোট ছোট দলগুলো মিলে জোট গঠন করছে এবং একাধিক জোট গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এবার যেসব দলগুলো মিলে জোট গঠিত হয়েছে তাদের অধিকাংশই সরকারের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই বিষোদগার করছে। আগামীতে মধ্যম সারির দলগুলো নিয়ে যে জোট গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে তারাও সরকারের সাথে থাকছে না এটাও মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচন খুবই জটিল, কঠিন ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট আসবে বলে তাদের বিশ্বাস। এ ছাড়া বিএনপির মতো একটি বড় দল স্বেচ্ছায় ভোট বর্জন না করলে তাদের ভোট থেকে বিরত রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আর বিএনপি নির্বাচনে এলে হিসাব-নিকাশও পাল্টে যেতে পারে। দীর্ঘ দুই মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সরকারের জেল-জুলুম ও রোষানলের শিকার বিএনপির বিজয়কে কোনোভাবেই সরকার নিরাপদ মনে করছে না। যার ফলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোটের পরিসর বাড়ানোর ব্যাপারে মত রয়েছে। মহাজোটের অংশীদার হিসেবে আছে জাতীয় পার্টি। ওই জোটে যুক্ত হওয়ার তালিকায় রয়েছে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ৯ দলীয় জোট বিএনএ। নাজমুল হুদা মহাজোটে যুক্ত হলে নৈতিকতার প্রশ্নে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের সাথে নাও আসতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ চাইছে বামপন্থীরা তাদের জোটে না আসুক তি নেই। কিন্তু বিএনপির জোটে যেন না যায়। যদি বিএনপির সাথে যুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে রাজনীতির সমীকরণ আওয়ামী লীগের জন্য বেশি জটিল হয়ে যাবে। সেজন্য ছোট ছোট দলগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। আগেভাগেই ওই দলগুলোর বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ঘটা করে গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সিপিবির কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে সিপিবি সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সাথে বৈঠকও করেন।

এর আগে কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টির সভাপতি কাদের সিদ্দিকীসহ আলোচিত বেশ কিছু নেতার সাথে তিনি ফোনে কথা বলেন। এরপরই গত ২৬ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সাথে বৈঠক করেন কাদের সিদ্দিকী। এর কিছুক্ষণ পর নাজমুল হুদা পৃথক বৈঠক করেন। এ ছাড়াও ২০ দলীয় জোটের কিছু দুর্বল এবং অনিবন্ধিত প্রভাবশালী দলের সাথে ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের কথা রয়েছে। যাদের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে না এলেও অন্তত বিএনপির পক্ষে যেন কথা না বলে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু কাজ করা হচ্ছে বলে আভাস দিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। বিভিন্ন দলের সাথে আওয়ামী লীগের আলোচনার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। একজনের সাথে হয়তো সৌজন্য সাাৎ করতে যাচ্ছি, এরসাথে রাজনীতি নেই সেই কথা আমি বলব না। আপনাদের জোটে তাদের চান কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা চাইলে তো হবে না, তারাও তো চাইতে হবে। এই চাওয়াটা তো আমাদের ওপর নির্ভর করবে না। তিনি বলেন, যদি এটা কোনো মেরুকরণের দিকে আগায়, কৌশলগত জোট হয় সেটা তো আর গোপন থাকবে না। কাদের সিদ্দিকীর সাথে বৈঠকের বিষয়ে বলেন, ফাঁকে ফাঁকে তো সব কথাই হয়েছে। রাজনীতির বিষয়ে কথাবার্তা তো হয়েছে। নাথিং ইজ ফাইন্যাল। কোনো সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছাইনি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ছোট ছোট দলগুলো তাদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য নির্বাচনের আগে জোট গঠন করে। আবার ভেঙে যেতেও দেখা গেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বামপন্থী দলগুলোর সাথে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির একটি মিল রয়েছে। তাহলো মৌলবাদীরা যখন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তারাও তখন সোচ্চার হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা সভা সমাবেশে বড় বড় কথা বলে তাদের কোনো জনভিত্তি নেই। কথায় বলে খালি কলস বাজে বেশি।

আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নতুন জোট গঠন প্রসঙ্গে বলেন, প্রথমত দেশী ও আন্তর্জাতিক ফর্মুলার অংশ হিসেবে এসব জোট গঠন হয়। তারা সেইভাবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত : নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ছোট ছোট দলগুলো জোট গঠন করতে পারে। কারণ জনবল না থাকায় ছোট ছোট দলগুলো আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কা থেকে তারা জোট গঠন করতে পারে। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তারা সব সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ তো করেই না বরং ষড়যন্ত্র করে থাকে। তবে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার মতো শক্তি আমাদের আছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক পরিবেশ সব সময় এক রকম থাকে না। এই ঠিক আছে তো, ওই ঠিক নেই। রাজনীতির ঘুঁটি আবার অন্যের কাছেও চলে যায়। তাই আগামী নির্বাচনে বিকল্প হিসেবে এসব জোট তৈরি হচ্ছে। নতুন জোট গঠন হওয়ায় আওয়ামী লীগ সতর্ক। সূত্র: নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech