রাজনৈতিক সংস্কৃতি : নামে কত কী আসে যায়! - পাঠকের চিঠি - Premier News Syndicate Limited (PNS)

রাজনৈতিক সংস্কৃতি : নামে কত কী আসে যায়!

  

পিএনএস (মহিউদ্দিন আহমদ) : স্কুলে আমাদের দ্বীনিয়াতের এক শিক্ষক একটি সংস্কৃত শ্লোক প্রায়ই আওড়াতেন। তার মর্মার্থ হলো, মানুষের চিত্ত-বিত্ত, জীবন-যৌবন সবই চলে যাবে, থাকবে শুধু যশ ও কীর্তি। অর্থাৎ ভালো কাজ করলে সেই কাজ থেকে যাবে, মানুষ তাঁকে মনে রাখবে। জীবৎকালে মানুষ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষ তাঁকে মনে রাখে। কারণ, ওই প্রতিষ্ঠান মানুষের অনেক উপকারে আসে।

কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা তৈরির সময় কারও কারও মনে একধরনের পরিমিতিবোধ কাজ করে। তাঁরা প্রিয়জনের নামে অনেক স্থাপনা তৈরি করেন, নিজের নামে করেন না। তবে সবার মধ্যে এই বোধ কাজ করে না। এ ক্ষেত্রে আমরা দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহার নাম স্মরণ করতে পারি। তাঁর তৈরি ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজ, কুমুদিনী হাসপাতালসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো টিকে আছে। বারডেম হাসপাতাল আরেকটি ভালো উদাহরণ। তাঁর মৃত্যুর পর প্রিয়জনেরা এর নামকরণ করেছেন এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইব্রাহিমের নামে। ডা. ইব্রাহিম নিজে এর নামকরণ করেননি।

জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করে নিজের নামে অনেক কিছু করার প্রবণতা দেখা যায় স্বৈরশাসকদের মধ্যে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করেছেন এক দশক। তাঁর সময় আঞ্চলিক বৈষম্য অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বাঙালিদের সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে তিনি দিয়েছিলেন ‘দ্বিতীয় রাজধানী’, নামকরণ করেছিলেন নিজের নামে-আইয়ুবনগর। ওটা টেকেনি।

উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের জোয়ারে আইয়ুব খান ভেসে গিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জনসভায় বঙ্গবন্ধু আইয়ুবনগরের নাম বদলে শেরেবাংলা নগর এবং রেসকোর্সের নাম বদলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নামই টিকে আছে। আইয়ুব খানের নাম-নিশানা এখন খোদ পাকিস্তানেও নেই। এমনকি তাঁর বানানো সাধের শহর ইসলামাবাদে তাঁর নামে একটি কানাগলিও নেই। পতিত শাসকদের পরিণতি এমনই হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি ভালোবেসে বাংলাদেশের রাজধানীর নাম রেখেছিল মুজিবনগর। প্রবাসী সরকারের সব চিঠিপত্র ‘মুজিবনগর’ থেকেই প্রকাশিত ও বিতরণ করা হতো। ঢাকার জিন্নাহ অ্যাভিনিউ নামটি পাল্টে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ নামটিও জনগণের দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নামে তৈরি হয়েছিল সামরিক বাহিনীর একটি ইউনিট-মুজিব ব্যাটারি। দেশের হাল ধরার পর তিনি নিজের নামে কোনো স্থাপনা তৈরির চিন্তা মাথায় আনেননি। চাইলে কেউ না করতেন না।

এ দেশে ক্ষমতায় থেকে জনগণের টাকায় নিজের নাম জাহির করার রেওয়াজ চালু করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাঁর নামে একটি জায়গার নামকরণ হয়েছিল এরশাদনগর। কুর্মিটোলায় একটি স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয়েছিল এরশাদ আর্মি স্টেডিয়াম। ১৯৯০ সালে তাঁর পতনের পর ওই স্টেডিয়ামের নাম থেকে ‘এরশাদ’ শব্দটি ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

মানুষের নামে সরকারি উদ্যোগে কোনো জায়গা বা স্থাপনার নাম রাখার দৃষ্টান্ত অনেক পুরোনো। তবে সচরাচর এটা রাখা হয় মৃত ব্যক্তির নামে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ঘোড়াশাল সার কারখানা তাঁর নামে রাখা হয়। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও তাঁর নামে রাখা হয়েছিল। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকার বিমানবন্দর থেকে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জিয়ার নাম হটিয়ে দেয়।

আবার যমুনা সেতুর নাম ১৯৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু সেতু রেখেছিল। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার এটি বদলে আবার যমুনা সেতু নামকরণ করেছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ পুনরুদ্ধার করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।’ ৯৬ এর আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নাম রেখেছিল ২৬ মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী এম এ হান্নানের নামে।

২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার ওটা পাল্টে নাম রাখল হজরত শাহ আমানত (রা.) বিমানবন্দর। পীর-আউলিয়ার নাম কোনো স্থাপনার সঙ্গে জুড়ে দিলে তা বদলানোর বুকের পাটা কারও নেই। ১৯৮২ সালে বিচারপতি সাত্তারের সরকার ঢাকা বিমানবন্দরের নাম রেখেছিল জিয়ার নামে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বুদ্ধি করে সেখানে হজরত শাহজালালের (রা.) নাম বসিয়ে দেয়।

নামকরণের হাত থেকে মাঠ-ঘাটও বাদ যায়নি। সংসদ ভবনের উত্তর দিকের মাঠটির নাম এরশাদ সাহেবের আমলে ছিল চন্দ্রিমা উদ্যান। ৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার তার নামকরণ করে জিয়া উদ্যান। ৯৬ সালে জিয়ার নাম পাল্টে আবার হলো চন্দ্রিমা। এ যেন পিলো পাসিংয়ের খেলা এবং শেষমেশ এটা রাজনীতির খেলা। নিজের নামে ঢোল পেটানোর এবং প্রতিপক্ষের নাম মুছে ফেলার খেলা।

নিজের নাম জাহির করার খায়েশ গণতান্ত্রিক জমানার জীবিত নেতাদের মধ্যেও আছে। হঠাৎ একদিন ঢাকার রাস্তায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের গায়ে দেখা গেল-‘ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহার’। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে টাকা দিয়ে বাস কিনে উপহার দেননি। এগুলো কেনা হয়েছিল জনগণের টাকায়, যাকে সচরাচর সরকারি টাকা হিসেবে প্রচার করা হয়। আমি জানি না, রাজকোষ থেকে টাকা নিয়ে কোনো সভ্য দেশের জীবিত সরকারপ্রধানের নামে এসব করা হয় কি না। ওই সময় খালেদা জিয়ার নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য আবাসিক হলও করা হয়েছিল। এটা কি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুপারিশে করা হয়েছিল, নাকি এটা সরকারি কর্মকর্তাদের অতি-উৎসাহের ফল, তা জানতে আমি খুবই আগ্রহী।

যখনই কোনো নেতা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে যান, তাঁর চারপাশে মৌ-লোভী একদল মোসাহেব-চাটুকার জুটে যান। তাঁরা সব সময় ক্ষমতাসীন নেতার কানে একটা কথাই ঢেলে দেন, আপনার মতো মহাপুরুষ এ দেশে গত হাজার বছরে আসেননি। আপনি ছাড়া এ দেশ অচল। এটা শুনতে শুনতে নেতা হয়তো একসময় ভাবতে থাকেন-আমি অপরিহার্য। যে আমাকে চায় না, সে জনগণের শত্রু, দেশের শত্রু।

যখন খালেদা জিয়ার নামে একটি আবাসিক হল করার প্রস্তাব এল এবং তিনি এতে রাজি হলেন, তিনি কি একবারও ভাবলেন না, এ দেশে নারী জাগরণ কিংবা নারীশিক্ষার পথিকৃৎদের কি আকাল পড়েছে? আমাদের দেশ তো বীরের দেশ। আমাদের আছেন সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ। কোনো কোনো সেনানিবাসে তাঁদের নামে ছোটখাটো রাস্তা কিংবা তোরণ আছে। কিন্তু কোনো বীরশ্রেষ্ঠের নামে কোনো সেনানিবাস নেই। এ দেশে সেনানিবাস তৈরি হচ্ছে একটার পর একটা। কিন্তু নামকরণের সময় বীরশ্রেষ্ঠদের কথা মনে হয় না।

চাটুকার প্রসঙ্গ যখন এল, তখন দুটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। ঘটনা দুটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষমতাধর নেতা। তাঁর পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট ছিল। একটা সময় ছিল, যখন তাঁর কথায় মানুষ উঠত আর বসত। ভয়ে নয়, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।

সাংবাদিকদের মধ্যে মোসাহেবের অভাব ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গণমাধ্যমের কতটুকু কাছাকাছি যেতে হয় এবং কতটুকু দূরত্ব রাখা দরকার এই বিবেচনাবোধ তাঁর মধ্যে ছিল। অপরটি ১৯৭৫ সালের কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন আবদুল মতিন চৌধুরী। তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন অনুরাগী, এতে কোনো সন্দেহ নেই, এতে দোষেরও কিছু নেই। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, বঙ্গবন্ধুকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেওয়া হবে। প্রস্তাবটি শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি তো চ্যান্সেলর, আমি তো এটা নিতে পারি না।’ বিনয়ের সঙ্গেই তিনি তাঁর অপারগতা জানিয়েছিলেন। এ রকম পরিমিতিবোধ সবার মধ্যে দেখা যায় না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বড় মাপের নেতা। তিনি জানতেন, পুরো দেশটাই তাঁর। এর ভেতরে ছোটখাটো স্থাপনায় নিজের নাম জুড়ে দেওয়ার লোভ তিনি করেননি। সকাল-সন্ধ্যা তাঁর নাম জপ করলেই কি তাঁকে সম্মান জানানো হয়? আমরা তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করি না কেন? আত্মপ্রচার আর প্রতিহিংসার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে গণমানুষের জন্য কাজ করার কথা ভাবি না কেন? কাজ দিয়েই তো মানুষ বিচার করবে!

[প্রথম আলোর সৌজন্য: মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক
mohi2005@gmail.com]

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech