ক্লোনিং : দিশেহারা ডিজিটাল দেশবাসী

  

পিএনএস (শান্তা ফারজানা) : ‘হ্যালো, ওয়াহিদুল বলছি। তোমরাতো এখন অফিসে। আমি একটু ব্যস্ত আছি। আমি একটি নাম্বার পাঠাচ্ছি। সেই নাম্বারে দ্রুত ১০,০০০ টাকা পাঠিয়ে দাও।ওকে...।’ এভাবেই সরকারি কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর ক্লোন করে টাকা দাবি করেছে একটি প্রতারক চক্র।

এতদিন গরু বা মেষ ক্লোন হওয়ার কথা আমরা শুনেছি কিন্তু এবার শোনা যাচ্ছে, সিম ক্লোন করে একই নাম্বার অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারে।সাম্প্রতিক ওয়েবসাইট হ্যাক করার ঘটনা প্রচুর ঘটলেও মোবাইল ফোনের সিম হ্যাক করার ঘটনা একেবারেই নতুন। কোনও মোবাইল ফোনের একই নাম্বার ও তথ্যাদি ব্যবহার করে নকল কোনো ইউজার ওই সিমটির সুবিধা নিলে বিষয়টিকে বলা হচ্ছে ক্লোনিং।

উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ক্লোন’ হলো কোনো জীব বা কোষ বা বৃহৎ জৈব অণুর হুবহু নকল। ১৯৯৬ সালে স্কটল্যান্ডের গবেষক ড. আয়ান উইলমুট প্রথমে একটি ভেড়ার ক্লোনিং করেন।

মোবাইল ফোনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিম (সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিফিকেশন মডিউল) কার্ড। একটি সিম যেটি আপনি ব্যবহার করছেন সেই সিম টি যদি অন্য কেউ ব্যবহার করে কিংবা এক নাম্বার যদি দেখেন এক সাথে দুইজন ব্যবহার করে কিংবা হঠাৎ করে যদি দেখেন আপনার সেল ফোনের কানেকশন নাম্বার থেকে ব্যালান্স কোন কারন ছাড়া কমে যাচ্ছে তবে আপনি সিম ক্লোনের শিকার। তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় ক্লোনিং হলো- মোবাইল সিম নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তন করে কাউকে কল দেওয়া। এক্ষেত্রে অপারেটর পরিবর্তন করা হলেও কলগ্রহীতার মোবাইল সেটে সেভ করা ব্যক্তির নাম দেখাবে। তবে যদি নম্বরটি সেভ না থাকে তাহলে কলগ্রহীতার কাছে অপরিচিত নম্বর হিসেবে দেখাবে।

সিম ক্লোনিং হতে হলে সাধারণত মিসড কল আসে। যেভাবে ইনফরমেশান হ্যাক করে হ্যাকাররা প্রথমে আপনাকে +৯২, #৯০ ও #০৯ এই তিন ধরনের কোড আছে শুরুতে এমন নাম্বার থেকে কল বা মিসকল দিবে নাম্বারে। শুরুতে এই কোড আছে এমন নাম্বার থেকে আসা কল রিসিভ করলে বা মিসকলের জবাবে ফিরতি কল করলেই মোবাইলের সব তথ্য জালিয়াতের কাছে চলে যায়।অচেনা নাম্বার থেকে কল সেন্টারের কর্মী সেজে কথা বলে জালিয়াতরা।

সংযোগ নির্বিঘ্ন আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে গ্রাহককে তাঁর মোবাইলে #০৯ বা #৯০ চাপতে বলা হয়। এই নম্বরগুলো চাপার পর যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, সেই নম্বরে উল্টো কল যায় এবং সিম ক্লোন হয়ে যায়।উল্লেখিত কোড গুলো থেকে আসা কল ধরতে না পেরে কেউ যদি ওই নাম্বারে কল দেন তাহলে এ নাম্বার ক্লোন হয়ে যাবে।

সিম নম্বর ক্লোনের মাধ্যমে প্রতারণা ও ফাঁদে ফেলার জাল বুনছে এক শ্রেণীর অপরাধ চক্র। আবার জনসাধারণ বা বিশিষ্টজনদেরসিম ক্লোনিং মাধ্যমে প্রতারণা, ব্লাকমেইলিং, হমকিও দিচ্ছে প্রতারক, জঙ্গী অপরাধীরা। এসব প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে টাকা লেনদেন না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলেন, কারও কাছে এ রকম ফোন গেলে তাঁরা যেন আইনের আশ্রয় নেন।

ক্লোন সিম ব্যবহার করে নানা অপরাধমূলক কাজ করা সম্ভব। তবে মোবাইল ফোন অপারেটররা দাবি করছেন, তারা এখনো এরকম কোনো অভিযোগ পাননি। বাংলাদেশে ৬টি মোবাইল ফোন অপারেটরের এখন গ্রাহক সংখ্যা ৯ কোটি ৩০ লাখ। মোবাইল ফোনের গ্রাহক দিন দিন বাড়ার পাশাপাশি সচেতনতার অভাবে ঝুঁকিও বাড়ছে। পরিমাণে কম হলেও বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের সিম ক্লোন করা হচ্ছে। সচেতন না হলে তা আরো বেড়ে যেতে পারে। মূলত প্রচারণার অভাবে গ্রাহকরা ক্লোন করা সিম সম্পর্কে তেমন সচেতন নন।

মোবাইল ফোনের ব্যালেন্স হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া অথবা একই ফোন নম্বর দুজন ব্যবহার করলে বুঝতে হবে সিম ক্লোন হয়েছে। আর এখন মূল সিম ছাড়াই কম্পিউটারের মাধ্যমে মিসড কল দিয়ে সিম ক্লোন করা সম্ভব। কোনো গ্রাহক যদি অপরিচিত ফোন থেকে পাওয়া মিসড কলে কল ব্যাক করেন তাহলে তার সিম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোনের সিমের সঙ্গে ফোন সেটটিও ক্লোন হতে পারে। আর সেট ক্লোন হলে মেমোরিতে থাকা সব তথ্য চলে যেতে পারে অন্যের হাতে। তাই অপরিচিত মোবাইল ফোন থেকে আসা মিসড কলের জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্য মোবাইল ফোন গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।

একটু অসাবধান হলেই যে কেউ সিম ক্লোনিং এর শিকার হতে পারেন। শিকার হলে তাহলে যা করবেন, তা হল-
নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।বিষয়টি যদি তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এর আওতায় পড়ে তাহলে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এর সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে থানায় অভিযোগ দায়ের করুন বা প্রয়োজনে সাধারন ডায়েরি করে রাখতে পারেন।যদি থানায় কোনো কারণে অভিযোগ গ্রহণ না করে তাহলে নিকটস্থ বিচারক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কমপ্লেইন্ট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।যদি কোনো কারনে তাও সম্ভব না হয় তাহলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এর আওতায় নিয়ন্ত্রক, সিসিএ বরাবর অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।নিয়ন্ত্রক, সিসিএ বরাবর অভিযোগ দায়ের এর ক্ষেত্রে সরাসরি ডাকযোগে বা ই-মেইলের মাধ্যমেও অভিযোগ দায়ের করা যাবে। আসুন আমরা সবাই সাবধানতা অবলম্বন করি, ক্লোনিং মুক্ত যোগাযোগ গড়ি।

শান্তা ফারজানা : সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি ও মহাসচিব, সেভ দ্য রোড


পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech