ইয়াবা-বদি কাহিনী !

  

পিএনএস (তরিক রহমান) : ‘সাত দিন ধরে ধৈর্য ধরেছি। আজকে পুলিশকে অপমান করা হয়েছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে গোলাগুলি করতে করতে আসবে, তো তাদেরকে কী বল প্রয়োগ করবে না কি চুমু খাবে?’ হুবহু এই কথাটিই একটি টিভি সাক্ষাৎকারে সরাসরি বললেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ায়দুল কাদের।

এই বক্তব্য শুনে একজন বলছেন, ‘শাহজান খান’ থেকে ‘চুমু খান’ ভালো, কেননা চুমু খেতে প্রেম লাগে, আর ধর্ষণ করতে শক্তি লাগে।’

আমি বলি কী, কাদের সাহেব, আপনি কোমলমতি শিশুদের বাঁচতে চাওয়া আন্দোলনে গিয়ে চুমু খেয়ে ক্ষমা চাওয়ার মতো শিক্ষা, সংস্কৃতি বা রুচি অর্জন করতে শিখবেন কী আর এ জনমে?

ইয়াবা বদির হাতে পুরি খাওয়া বরং আপনার স্বাস্থ্য ও জনপ্রিয়তার জন্য ক্ষতিকর। সড়ক মন্ত্রী হিসেবে আপনি যদি ৭ দিন অপেক্ষা না করে পরের দিনই শিশুদের এই সুশৃঙ্খল আন্দোলনে একাত্ম হয়ে, নাটক করে হলেও ওদের দাবি মেনে নিয়ে চুমু খেতেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলকে এতটা কলঙ্কিত হতে হতো না। ওরা চাইছিলো এই অহেতুক মৃত্যুর থেকে বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা নেবে সরকার।

শিশুরা চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছিল কতটা অদক্ষ ড্রাইভারে আর ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ভরে গেছে দেশটা। স্বয়ং আইন প্রণেতা মন্ত্রী থেকে আইন রক্ষাকারী সংস্থার লোকেরা কীভাবে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছেন। ওরা চোখে আঙুল দিয়ে পুরো দেশটাকে দেখিয়েছে।

কাদের সাহেব, কোমলমতি শিশুদের প্রতি পুলিশের আচরণ বাড়াবাড়ি রকমের ছিল। বুঝতে পারেন নাই, এই মাসুম শিশুরা চুমু খেয়ে বড় হয়ে উঠতে চায়। বদির সঙ্গে পুরি খেলে ভোট চলে যায়, আর শিশুদের বকা খেয়েও প্রতিদানে চুমু খেলে ভোট বাড়ে।

জানেন তো, জনতাই সকল ক্ষমতার উৎস? রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক এই জনগণ। আপনি যখন মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন থেকে এই মহান জনগণের শপথধারী একজন সেবক মাত্র। তাদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে আপনার সরকার বাধ্য।

দুটি স্কুল ড্রেস পরা শিশুকেই শুধু থেতলে দেয় নাই ওই উচ্ছৃঙ্খল বাস। সব মা-বাবার আদরের ধনটিকেই যেন থেতলে যেতে দেখেছে সবাই। শিশুদের প্রতি আমাদের পরম অনুভূতিকে থেতলে দিয়েছে এই ঘটনা। দেশের প্রায় ছয় কোটি সুবিধাপ্রাপ্ত ফেসবুকবাসী এ বিভৎস দৃশ্য দেখে যখন বাকরুদ্ধ, তখন একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর নির্বোধের মতো ‘ড্যাম কেয়ার’ হাসি দেখে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা।

বাধ্য হয়ে মানুষ পথে নামে। প্রতিবাদে পথে পথে নেমে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে স্কুল ড্রেস পরা ছেলে মেয়ে। তাদের দাবি নিরাপদ সড়ক পথ। তারা অদক্ষ বাস-ট্রাক ড্রাইভারের হাতে মাংসপিণ্ড হতে চায় না।

জানেন তো, বিতর্কিত ভোট বলে এমনিতেই বিরুদ্ধ পক্ষ মুখিয়ে আছে। কেন শিশুদের ন্যায্য দাবি সেবক হিসেবে মেনে নিয়ে পথে এসে চুমু না খেয়ে ‘গুজব’ বাহিনীর হাতে পরিস্থিতি তুলে দিলেন?

সড়ক পরবিহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর হিসেবে প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক র্দুঘটনায় প্রাণ হারান কমপক্ষে ৩০ জন। সে অনুযায়ী বছরে নিহতের সংখ্যা দাড়ায় ১০ হাজার ৮শ’ জন। আবার বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বছরে ১২ হাজার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী, ২০ হাজার মানুষ সড়ক র্দুঘটনায় মারা যান।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরসিংখ্যান অনুযায়ী, সড়ক র্দুঘটনায় প্রতি বছর ১২ হাজার মানুষ মারা যান। এভাবে মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকছে। ওবায়দুল কাদের সাহেব, লজ্জাবোধ থাকলে, চুমু খেয়ে এই অদক্ষতার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারতেন। তাতে প্রেম, জনপ্রিয়তা বা ভোট বাড়তে পারতো। ডিজিটাল বাংলাদেশের মেধাবী প্রজন্ম কিন্তু এনালগ বলে আপনাকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দেবে। এভাবে গায়ের জোরে কথা বললে তারাও কিন্তু চুমু দিবে না।

এক অসহায় ল্যাংটা রাজা আমাদের!
সেই যে এক দুষ্টু প্রকৌশলী, রাজাকে পৃথিবীর সেরা স্বর্ণের পোশাক পরিয়ে দেবেন বলে রাজ কোষের স্বর্ণ ও মুদ্রা মেরে দেয়ার গল্পটা মনে পড়ছে। সোনা টাকা মেরে টেরে খাওয়ার পরে, রাজাকে জনসম্মুখে ল্যাংটা করে বলছেন, রাজা এক আশ্চর্য শোনার পোশাক পরে আছেন।

যিনি রাজার এই অতি সূক্ষ্ম পোশাক দেখতে পাবেন না, তিনি রাজাকার!
এরপরে সব চামচা, চামুন্ডা, মন্ত্রী টন্ত্রী উলঙ্গ রাজার পোশাকের ভুয়া প্রসংশায় পঞ্চমুখ। কেউই আর রাজাকে সত্যিটা বলছেন না।

অতঃপর, নির্ভীক ছাত্ররা পথে নেমে দেখিয়ে দিলেন রাজা আসলেই ল্যাংটা হয়ে পড়েছেন। আইন প্রণেতা, আইন রক্ষাকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা কেউই আইনের তোয়াক্কা করছে না।

ছাত্ররা হাতেনাতে দেখিয়ে দিলো কতটা খামখেয়ালীপনা আর যাচ্ছে না তাই অবস্থায় ফিটনেসবিহীন বাস-ট্রাক চলছে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ড্রাইভার।
পুলিশের গাড়ি, সাংবাদিকের গাড়ির নেই কোনও কাগজপত্র। এই চিত্র শুধু এই আওয়ামী লীগের আমলের নয়। বিগত সরকারের আমলেও ছিল। শুনেছি গত সরকারের আমলে এভাবেই ২৫ হাজার ভুয়া ড্রাইভারকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে চলছে এদের পথে আটকিয়ে ট্রাফিক পুলিশের বাড়তি আয়ের বাণিজ্য!

জনগণের বেশিরভাগ যখন দুর্নীতিপ্রবণ তখন পরিস্থিতির রাতারাতি পরিবর্তন আসলেই সম্ভব নয়।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমি জানি এসব পরিস্থিতিতে কতটা অসহায় আপনি। এই দীর্ঘ দিনের বিশৃঙ্খলা দূর হতে সময় লাগবে, যতক্ষণ না আমরা সবাই নিজের ভেতর থেকে সচেতন হয়ে উঠবো। আপনার সোনার বাংলাদেশের শিশু কিশোরেরা যে সত্যকে উন্মোচিত করেছে তাকে সাধুবাদ জানান।

দোহাই, প্রতিদিন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে ফেসবুকে চামচা শ্রেণির বাইরে সৈয়দ আশরাফ বা সরলসোজা প্রেসিডেন্টের মত চরিত্রের আরো মানুষগুলোকে দায়িত্বে আনুন।

শুনেছি ও দেখছি, নেতৃত্বের পরিবর্তনে আপনি ধীরে ধীরে কাজটি এগিয়ে আনছেন। শুনেছি এবার দুর্নীতি প্রবণ নেতাদের আগাম চিঠিতে জানিয়েছেন এবার আপনি তাদের রাখবেন সাইড বেঞ্চে। যদিও পুরোটা পারবেন না নানা জটিলতায়। কিন্তু প্রিয় বোনটি আমার, মাঠে এসে আপনার আগামীর সোনার বাংলাদেশকে বোঝানোর দায়িত্ব ওই লোভী, গোঁয়াড় ওবায়দুল কাদের টাইপের কিংবা ছাত্রলীগকে দিলে হবে না।

এতে জাতির পিতার কষ্টে গড়া দলটি ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের পরিবারগুলো অসহায় হয়ে পড়বে।
গুজব পুঁজি করে নিরীহ শিশুদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসতে চাওয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে যাবে দেশটা। ছাত্রদের চুমু খান, ওদের বাবা-মার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে দেশটাকে শান্ত করুন, জনপ্রিয় থাকুন, শিশুদের বাবা-মার অন্তর জয় করুন। আর ধীরে ধীরে এ সব খানদের কালো পর্দা সরিয়ে মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলুন।

আমরা জানি, জাতির পিতা একবার যার সঙ্গে দেখা হতো, নাম শুনে ভুলতেন না। ১০ বছর পরে দেখা হলেও তিনি নাম ধরে ডেকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। এভাবে তিনি মানুষের অন্তরে স্থান নিয়েছিলেন, এভাবেই বাংলাদেশের নাম হয়ে উঠেছিল শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের জাতির পিতার সম্মান রক্ষা করুন, উলঙ্গ বাংলাদেশে ভালোবাসার, প্রেমের ও চুমুর সংস্কৃতি দিয়ে রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটান।

আপনিতো সেই প্রধানমন্ত্রী, যিনি ঈদের দিনে পথের শিশুদের মধ্যে রাসেলকে খুঁজে নেন। কবির চোখের ছানি কাটাতে প্রসাদে ডেকে কবিতা শুনে চিকিৎসায় সাহায্য করেন। এখনও আপন সন্তানের জন্য রান্নাঘরে খুন্তি ধরেন।

কবি সাহিত্যিকদের শীতের পিঠার নেমন্তন্য করতে ভোলেন নাই।
এবার পুরো বাংলাদেশকে পরম মমতায় ধারণ করুন। রাজনীতিতে মমতা আর চুমুর সংস্কৃতিকেও উৎসাহিত করুন। তবেই আপনি ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পাবেন।
পদ্মা সেতুর মত সাহসী পদক্ষেপ আপনাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। বাঙালি সাহস পছন্দ করে, বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আপনিই সেটা দেখিয়েছেন। শত খারাপরে মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অনেক পরিকল্পনাও নিয়েছেন।
ব্যাংক বীমার অনেক প্রসঙ্গ আছে, মানুষ এখনও কিছু বলছে না, কিন্তু চুমুর বিকল্প পথে এগোলে পরিস্থিতির ভালো হবে বলে মনে হয় না। তাই প্রজন্মের সাথে থাকুন।

এক বালতি দুধের মধ্যে এক চিমটি গুজব
প্রজন্ম চত্বরের সেই গণজাগরণকে বানানো হলো বিরিয়ানীর আখড়া। নাস্তিকের বেলেল্পনা। খেপিয়ে তোলা হলো মাদ্রাসার ছাত্রদের।এরপরে সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পেলো সমগ্র বাংলাদেশ। মসজিদে মসজিদে ধর্মান্ধ মানুষদেরকে বিশ্বাস করিয়ে দেওয়া হলো যে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে। এভাবে জামাতি গুজবের গুয়ের দুর্গন্ধ আমরা পেতে শুরু করলাম। একাত্তরেও গুজবের মাধ্যমে রাজাকার মানে, ধর্ম রক্ষার লড়াকু সৈনিক গুজব রটানো হয়েছিল।

দলটি তার রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টে বাম ঘরানার স্টাইল রপ্ত করেছে। যেহেতু নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যানার নাই, তাই এরা এখন জনমানুষের সাথে মিশে যায়। এরপরে ১ বালতি দুধের ভেতর একচিমটি গু ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণের আন্দোলনকে নিয়ে যায় নোংরামীতে। সফেদ চেহারার মতলববাজ লোক, বোরখায় ঢাকা নারীর কণ্ঠে বিশ্বাসযোগ্য করে গুজব প্রচার করা হয়। এর ফলে কোটা আন্দোলনের মতো দাবি হয়ে যায় ফিকে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়ে যায় ক্ষমতা দখলের ব্যবহারের মাধ্যম।
যেখানে কোমলমতি শিশুদের মানবিক একশান, পুলিশের বোকামীতে ছাত্রদের সাহসী উচ্চারণ ‘চ্যাটের বাল’ বলে ফেলা আন্দোলন, শিশুদের ওপর বেশ কয়েকটি মারাত্মক পুলিশী অপরাধ করা আন্দোলন হয়ে পড়ে নিছক দাঙ্গা-হাঙ্গামা। ধর্ষণ বা চারটি হত্যাকাণ্ডের গুজবের থেকে কোনও ক্রমেই ছোট ছিল না এই আন্দোলনের খণ্ডচিত্র। যে ছবিগুলো ইতিহাসে স্থান নেবার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু জাতে অসৎ, মিথ্যুক, গুজব রটনাকারীদের পিঠে চেপে জামাতি-বিএনপি দেশে আগুন লাগিয়ে আলু পোড়াতে চাইলো।

এ আন্দোলন এখন সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আজ এক সহকর্মী বললো, তিনি যে বাসে অফিসে এসছেন তার সামনের গ্লাসটি ভাঙা। ঠিক না করেই পথে নেমে এসছে। ফলে দুশ্চরিত্র রাজনৈতিকেরা, লাশ আর ধর্ষণ সন্ধানী কৌশল মানুষকে আবারও বিব্রত করে দিয়ে, কুচক্রীর চেহারা উন্মোচিত করে যায়। হয়তো আগামীতে সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য দাবিতে পথে নামতে আগ্রহ হারাতে পারে।

ফলে, রাজনৈতিক সুস্থ ধারার বিপক্ষে গুজবের আশ্রয়ে, তথ্য বিকৃত করে, তারা নিজেদের অবস্থান হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে নিজেদের পুরনো চেহারা উন্মোচিত করে যাচ্ছেন।

বিপ্লবের সাবমেরিন ঠেকে যায় নাব্যতা হারানো নদীর চরে
মুক্তিযুদ্ধা পরিবারের সন্তান আমি। কিন্তু একসময় বাম রাজনীতির সংস্পর্শে এসে মুগ্ধ হই। এখানে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, পুঁজির চরিত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি, গ্যাট, ভ্যাট, দেশের জন্য একটি কার্যকর শিক্ষানীতি, কত কিছুই না শিখেছি এ ইশকুলে। রাশিয়ার সাহিত্য, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বই, প্রায় নামমাত্র মূল্যে বিতরণ করা হতো।

ম্যাক্সিম গোর্কীর মা, বা অস্তভস্কির ইস্পাত বা ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট জ্ঞান তৃষ্ণায় পড়েছি। যেন রাজনীতি শেখার স্কুল সেটা। এখনও এখানে দেশের গণমানুষের কথা এরা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে পারলো না এদের বিপ্লবের স্বপ্নের নীতি।

এক সময় কমরেডরা সোনালী বিড়ি খেতে খেতে রাশিয়ার থেকে অস্ত্রভর্তি সাবমেরিন আসাবে, সে গল্প বলতেন। বিপ্লব হবে সে বিষয়ে চকচকে চোখে স্বপ্ন দেখাতেন। সময় পাল্টে দিয়েছে আমাদের নদীগুলাকে। চর পড়ে কোনও নদীতেই আর ডুবন্ত সাবমেরিনের এসে ওঠার সম্ভাবনা নাই।

কিন্তু কমরেডরা এখনও স্বপ্ন দেখেন। এখনও মানুষের মধ্যে বিদ্রোহের সামান্য আগুন পেলেই তাকে ফঁ দিয়ে জালিমের রাজত্ব পুড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে মানুষের ছোট ছোট সাফল্য যে একদিন বড় পরিবর্তন আনতে পারে, সে সত্য অনুভবের ক্ষমতা মনে হচ্ছে হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন। তাই, প্রজন্ম চত্বর, বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মত প্রকৃত জাগরণের ক্রমশ সচেতন হওয়া নাগরিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কোথায় থামতে হবে সেটা তারা বুঝতে পারেন না। তারা এখন জামাতি-বামাতি এক কাতারে দাঁড়ানো।

মানুষের আন্দোলনে তারা মিশতে গেলে তারা মানুষকে তার ছোট ছোট প্রকৃত দাবিগুলোকে তুচ্ছ করে ফেলেন।
বলে রাখা ভালো, বস্তুর অধিক মুক্তিতে আমার বিশ্বাস। মনে করি প্রকৃত পরিবর্তন কোনও ভিন দেশি সাবমেরিন আনবে না। বরং প্রকৃত পরিবর্তন আসে ধীরে, অন্তর জগতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়। আমি এখন রেভ্যুলেশন অপেক্ষা এভ্যুলেশনে বিশ্বাস করি।

মনে করি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মুছে যাচ্ছে ভয়, তারা এখন ক্রিকেট খেলতে নামে জেতার প্রত্যয়ে। তারা এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখে। তারা মন্ত্রীর গাড়িকে ঘুরিয়ে দিতে জানে, আইনের পক্ষে দাঁড়িয়ে।

গতকাল আন্দোলনের অবস্থা বুঝতে ঢাকা চক্কর খেলাম সহকর্মীর বাইকে চেপে। আসাদগেট, ফার্মগেট, বনানী, মিরপুর এমনকি শাহবাগও ছিল গড়িতে ভরপুর। যেন কিছুই হয়নি। বসুন্ধরার গেটে ছাত্ররা অবরোধে রেখেছিল। রামপুরা ছিল অস্থির। মূলত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক আন্দোলনগুলোকে এখন পিটিয়ে উঠিয়ে দেওয়া হবে। কেননা আন্দোলন এখন ইগো আর সরকার পতনের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে বলে সব মহল মনে করছে।

সাধারণ মানুষ টিভি পর্দায় আর ফেসবুকে বুঁদ হয়ে উত্তেজিত ও অসহায় ভাইরাল। হয়তো এরপরে আসবে নতুন ভাইরাল ইস্যু, ততক্ষণে ফেসবুকেই অপেক্ষা করুন।

একজন মানুষ ম্যাচিউরড হতে ৪০ বছরকে একটি মাইলফলক ধরা হয়। বাংলাদেশ, একটি জাতির ম্যাচিউরড হতে ৪৭ বছর, যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের বিকাশ কম নয়।

উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমরা এদেশের তুলনা করে হতাশ হই। সে দেশগুলোর স্থানীয় পুঁজি দাঁড়িয়ে আছে মূলত কর্পোরেটগুলোর নিয়ন্ত্রণে টাইম-টেবিল মেনে চলে জীবন।

ট্যাক্স-ভ্যাট, থাসডেনাইট, আর একাকী জীবনে ওরা নিজের মতো করে জীবন দেখে। আমাদের মতো পারিবারিক বন্ধন ওদের দৃঢ় নয়। তাই শত নিরাপত্তার মধ্যেও ওদের মানুষেরা সুখী মানুষের জরিপে আমাদের থেকেও পিছিয়ে।

এদেশের স্থানীয় পুঁজির বিস্তারের যুগ চলছে। এ ধারায় পুঁজি জমতে গেলে, বিশৃঙ্খলার অবস্থা থাকে। পৃথিবীর সব দেশেই এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।

বৃটিশ কলোনির যুগে, বিভিন্ন দেশে ওরা জবর দখল করে সম্পদ জমা করেছে। ব্লাকফুট রেড ইন্ডিয়ানদের মাঝে হত্যার উৎসব চালিয়ে বারুদ আর ওয়াইনের বিণিমধ্যে স্বর্ণ লুট করেছে। এখনও যুদ্ধ বিগ্রহ চলে সম্পদ দখলের মূল সত্যকে কেন্দ্র করে। এই বিশৃঙ্খলা পৃথিবীর মানুষেরা কত দিনে বেরিয়ে আসবে, ঠিক জানি না।

বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল পোরিয়ে এসেছে।এখন কেবল সচেতন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা বিস্তারের পর্ব। এবারও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব বয়স্কদের থেকে জনঘনিষ্ট হয়ে দেশের হাল ধরছে। আগামীতেও আসবে। নেতিবাচক হিসেবে নিলেও সত্য, ক্রিকেটার হিরোরা অংশ নিতে চায় দেশ পরিচালনায়। আমি আশাবাদী সবকিছুতেই।

আপাতত, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তরুণদের নেতৃত্বে পথে সুশৃঙ্খল যানবাহন দেখেই আশাবাদী।
বন্ধুর গায়ে আঘাত লাগলে ওরা কিন্তু পরিয়ে দেবে ক্ষমতার মসনদ।
কিন্তু আজও ছাত্রদের আক্রমণ করা হয়েছে, তারা যে দলেরই হোক, ওরা ছাত্রই। সামনে নির্বাচন, সময়টা অবশ্যই স্পর্শকাতর। ছাত্রদের গায়ে আঘাত লাগলে ওরা বন্ধুর রক্তের বদলা নিতে দলমত মানে না, আপনি তো জানেন।

আন্দোলনের মাইলফলক পেরিয়ে আসা দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যদি বিরুদ্ধ পক্ষও একটি লাশের উপস্থাপন করায় তাহলেও সরকার প্রধান হিসেবে সে দায় এড়াতে পারবেন না।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সাধারণ সম্পাদককে সেদিন খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। পরিস্থিতি আপনার হাতে নেন। আপনার দরদী স্বভাবে দেশটাকে শান্ত করেন। না হলে জনবিচ্ছিন্ন হতে হতে শূন্যের কোঠায় দাঁড়াবেন।

মানুষের জন্য সংগ্রাম আর রাজনীতি করা দলটিকে নিয়ে মানুষের পাশেই থাকুন।
আজ বসুন্ধরায় আহত, মার খাওয়া ছাত্রদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। ওরা এক একজন যেন অগ্নির দলা। ওদেরকে আঘাত করে আগুন না বাড়ানোই হবে প্রজ্ঞার। কেননা ছাত্রদের আগুন ছড়িয়ে পড়লে আর থামাতে পারবেন না। তাই নমনীয় হন, আপনার যা কিছু সাফল্য, তাকে এভাবে ধ্বংস হতে দেবেন না।

লেখক: তরিক রহমান, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, দৈনিক যুগান্তর
সূত্র- যুগান্তর

পিএনএস/হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech