বিনায়ক বি করিম

  

পিএনএস (আব্দুল করিম কিম) :দেশে তখন ক্রান্তিকাল চলছে। পঁচাত্তর পরবর্তী বাস্তবতা। সামরিক শাসন আর স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পৃষ্ট স্বদেশ। রাজবাড়ী জেলায় নাট্য উৎসবে যোগ দিতে ঢাকা থেকে এসেছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আরও কিছু তারকা ব্যক্তিত্ব। উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে সৈয়দ হক-এর সঙ্গে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)-এর পরিচয় ঘটে। সদ্য পরিচিত হওয়া পুলিশ সুপার, সৈয়দ হক'কে তাঁর সরকারী বাসভবনে একবেলা ডাল-ভাত খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিলেন।

সৈয়দ শামসুল হক ঢাকা থেকে আসা অন্যান্য অতিথিকে নিয়ে পরদিন এসপি সাহেবের সরকারী বাসভবনে ডাল-ভাত খেতে গেলেন। এসপি সাহেবের সদাহাস্য স্ত্রী তাঁদের স্বাগত জানিয়ে বৈঠক খানায় বসালেন। অতিথিদের নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলছে। হঠাৎ দেয়ালে টানানো একটি প্রতিকৃতিতে সবার চোখ পরে। সৈয়দ হক'সহ অন্যান্যরা প্রতিকৃতিটি এখানে সগৌরবে সাঁটানো দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে যার নাম সরকারী কর্মকর্তারা মুখে আনতে ভয় করেন তাঁর প্রতিকৃতি সরকারী বাসভবনের বৈঠকখানায়? এটা কী করে সম্ভব?

সৈয়দ হক-এর প্রশ্নের মুখে এসপি সাহেব বললেন, জাতির পিতার ছবি যদি ঘরে না রাখতে পারি তাহলে কিসের জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? সৈয়দ হক বললেন, এ খবর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে আপনার বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসপি সাহেব বললেন, জাতির পিতার ছবি ঘরে রাখা যদি অপরাধ হয়, আর সে অপরাধে আমাকে শাস্তি দেয়া হয়, তা হলে আপনারা কী আমার পাশে দাঁড়াবেন না?

সৈয়দ হক পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঢাকা ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে তিনি আয়োজক নাট্য সংগঠকদের সাথে কথা বলে এই এসপি সাহেব সম্পর্কে আরও তথ্য নিলেন। সে সময়'সাপ্তাহিক বিচিন্তা'য় সৈয়দ শামসুল হক নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর কলামে এই এসপি সাহেবের সাহসিকতার কথা তিনি তুলে ধরেন।

১৯৮৬ সালে এই এসপি সাহেব ছিলেন বরিশাল জেলা পুলিশের এডিশনাল পুলিশ সুপার। সংসদের বিরোধীদলের নেত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তখন বরিশাল সফরে যান। বরিশাল সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে সরকারের লাল চোখ উপেক্ষা করে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে তিনি গার্ড অব অনার প্রদান করেন। যা তখনকার পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এর খেসারত হিসাবে তৎক্ষণাৎ তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়িতে বদলি করে দেয়া হয়। তবুও তাঁকে দমানো যায়নি। তিনি আবারো জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ালেন।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে শেখ হাসিনার উপর এক ভয়াবহ হামলা হয়। শেখ হাসিনা তখনও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী। তাঁর নেতৃত্বে লালদিঘি ময়দানে গণ মিছিল হওয়ার কথা। লালদীঘি ময়দানে যাওয়ার পথে, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গাড়িবহরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ-বিডিআর। এ ঘটনায় অল্পের জন্য শেখ হাসিনার জীবন রক্ষা হলেও নিহত হন ২৪ জন, আহতের সংখ্যা দুই শতাধিক। যা 'চট্টগ্রাম গণহত্যা' নামে আওয়ামীলীগ প্রতি বছর স্মরণ করে।

১৯৯৩ সালের ২৪ জানুয়ারি এ হামলার পাঁচ বছরপূর্তিতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামীলীগের জনসভা আহ্বান করা হয়। সেই জনসভায় প্রধান অতিথি হিসাবে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেয়ার কথা। সেই 'এসপি সাহেব' তখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (হেডকোয়ার্টার)। লালদীঘি ময়দানে শেখ হাসিনার নিরপত্তার ভার সেই এসপি সাহেব নিজে নিলেন। জনসভা চলাকালে হঠাৎ করে দুর্বৃত্তরা গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা শুরু করে। এতে ৫০ জন আহত হন। হামলা চলাকালে সেই এসপি সাহেবের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়। এ ঘটনার পরপর তাঁকে বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বারবুনিয়া এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন-এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) হিসাবে বদলী করে দেয়।

মুক্তিযোদ্ধা এই এসপি সাহেবের নাম 'সৈয়দ বজলুল করিম'। সবাই 'বি করিম' নামেই চেনে। ১৯৪৮ সালের ১৬ জুলাই মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক সৈয়দ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মৌলভীবাজার সরকারী বালক বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তৎকালীন মৌলবাজার মহকুমায় ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসাবে ৬৯-এর গণ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। সেক্টর-৪ এর অধীনে সৈয়দ বজলুল করিম (মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং- ০৫০৪০১০১৪৩) তৎকালীন সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। মৌলভীবাজার মহকুমার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ব্যারিস্টার মুত্তাকিম চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী, আজিজুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধ শেষে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ বজলুল করিম'কে মৌলভীবাজার গণসংযোগ কমিটির সেক্রেটারি হিসাবে নিয়োগ দেন।

এ সময় তিনি যুব-উদ্যোক্তা হিসাবে শমশেরনগরে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু রাজনৈতিক গুরু 'গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী'র (পরবর্তীতে সংসদ সদস্য) পরামর্শে তিনি ১৯৭৩ সালের বিসিএস (পুলিশ ক্যাডার) পরীক্ষায় অংশ নেন। সৈয়দ বজলুল করিম বিসিএস (পুলিশ ক্যাডার) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১৯৭৪ সালে সারদা পুলিশ একাডেমী থেকে ট্রেনিং সম্পন্ন করে বাংলাদেশ পুলিশে এএসপি পদ মর্যাদায় চাকুরী জীবন শুরু করেন। মৌলভীবাজারের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে চাকুরী জীবনে দেশের নানাপ্রান্তে ঘুরে বেড়ালেও স্বাধীনতা সংগ্রামের সহযোদ্ধাদের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। বিশেষ করে তাঁর সহযোদ্ধা ও বন্ধু সৈয়দ মহসিন আলী'র সাথে সবসময় যোগাযোগ থাকতো। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামীলীগ বিরোধীদের একচেটিয়া দাপট ছিল। সিলেট বিভাগের যে কোন অঞ্চল থেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষ ন্যায়সঙ্গত পুলিশী সাহায্য পাওয়ার জন্য তাঁর সাহায্যপ্রার্থী হলে তিনি সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করতেন।

১৯৯৫ সাল। বিএনপি সরকারের আমলে তাঁকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক করা হয়। সে সময় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বার গণআন্দোলন চলছে।ফ ঢাকায় মেয়র হানিফের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'জনতার মঞ্চ'। সচিবালয়ে আমানুল্লাহ আমান-এর অপ্রীতিকর ঘটনার পর থেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠছেন। কিন্তু সাহস করে গণদাবীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারছেন না। সেই সময় বি করিম পুলিশ ক্যাডার থেকে 'জনতার মঞ্চ'-এ যোগ দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ সাহসিক ভূমিকা রাখেন। সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রিয় মানুষ 'বি করিম স্যার'-এর আন্দোলনে যোগদান তখন সরকারের ভিত কাপিয়ে দেয়। যে পুলিশকে এতদিন আন্দোলন দমন করতে ব্যাবহার করা হয়েছে সেই পুলিশের কর্মকর্তা জনতার মঞ্চ-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে বললেন, ‘সকল পুলিশ ভাইদের কাছে আহ্বান আপনারা ১৫ই ফেব্রুয়ারির অবৈধ নির্বাচনে গঠিত সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে জনতার পাশে দাঁড়ান । জনতার অর্থে কেনা আর একটি গুলিও জনতার ওপর ছুঁড়বেন না।’ পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও মানুষের ব্যাপক সমর্থনের ফলে 'জনতার মঞ্চ' শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দেয়। প্রতিষ্ঠিত হয় শেখ হাসিনার 'নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’। সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জয় লাভ করে দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বি করিম'কে ঢাকা মহানগরীর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান (ডিসি ডিবি) হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এবার আদর্শের বলে বলীয়ান হয়ে নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য সে দায়িত্ব পালনকালে সুইডেন আসলাম, প্রকাশ, বিকাশ,জাসদ বাবু সহ আরো বহু সন্ত্রাসীকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালে তিনি অর্জন করেন পুলিশ বিভাগের সর্বচ্চো পদক "বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল"। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা'র কাছ থেকে এই পদক গ্রহণ জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে করেন 'বি করিম'। চাকুরী জীবনে তিনি যখন যে এলাকাতে গিয়েছেন সেখানকার মাটি ও মানুষের হৃদয় জয় করে নিতেন। যে কোন মানুষ সরাসরি তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে সাহায্য নিতে পারতো । অধঃস্থন কর্মকর্তাদের সাথেও তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তাই পুলিশ বিভাগে একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, কর্তব্যপরায়ণ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসাবে এই পদক তাঁর বহুপূর্বেই পাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু এরশাদ বা খালেদা জিয়া সরকারের আমলে তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সৈয়দ বজলুল করিম সব সময় কোন না কোন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। পুলিশী কার্যক্রমের বাইরে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও উৎসাহী। বরিশাল-এর 'শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার' আজও তাঁকে সম্মানের সাথে স্মরণ করে। খেলাধুলায় তাঁর আগ্রহ থাকার কারণেই 'আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাব' তাঁকে তিন বার সভাপতি নির্বাচিত করে। তিনি অসংখ্য সামাজিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচন-চক্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে 'জামায়াত-বিএনপি জোট'। সরকারের মন্ত্রীপরিষদে স্হান পায় কুখ্যাত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদ। সে সময় তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এ,আই,জি(এসিস্ট্যান্ট ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ) হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। জামাত নিয়ন্ত্রিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর হামলা করা হল। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের তালিকা করে ওএসডি করা শুরু হল। তখন কানাঘুষা চলছে অনেককেই বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হবে। সেই তোড়জোড়ের মধ্যে বি করিম সাহেব একদিন রিজাইন লেটার লিখে আইজিপি সাহেবের টেবিলে নিয়ে গেলেন। ঐ রিজাইন লেটারে তিনি লিখেছিলেন, 'যেহেতু আমি ৭১-এর রণাঙ্গনের সৈনিক সেহেতু রাজাকার মন্ত্রীদের অধীনে আমি চাকুরী করতে পারবো না। মন্ত্রীসভায় কুখ্যাত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী ও আলি আহসান মুজাহিদ যোগদান করায় আমি স্ব-ইচ্ছায় চাকুরী থেকে ইস্তফা দিচ্ছি।'

ইস্তফাপত্রে মন্ত্রী মুজাহিদ ও নিজামীর নাম উল্লেখ থাকায় কর্তৃপক্ষ সে ইস্তফাপত্র গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। জনতার মঞ্চ-এ যোগদানের অপরাধে 'মহিউদ্দিন খান আলমগীর'কে ১ নাম্বার ও 'সৈয়দ বজলুল করিম'কে ৪ নাম্বার আসামী করে মোট ৭ জন সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধ্যে আলোচিত 'জনতার মঞ্চ মামলা'ও দায়ের করা হয়। ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত চার দলীয় জোটের দায়ের করা মামলায় তাঁকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হত। এ সময়ে দেশজুড়ে বাংলা ভাই-জেএমবির উত্থান, আহসানউল্লাহ মাস্টার, শাহ এ এস এম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড, ২১শে আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় রাষ্ট্রীয় মদদে গ্রেনেড হামলা সহ হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক নজিরবিহীন দুর্নীতিতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি চরম খারাপ হয়ে ওঠে । সরকার দুই টার্মের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় ষড়যন্ত্রমুলক পরিবর্তন করে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চলমান পরিস্থিতিতে দেশে সেনা সমর্থক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

আওয়ামীলীগ-বিএনপি সহ প্রধান রাজনৈতিক দল সমূহের প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দের নামে একের পর এক দুর্নীতির মামলা দায়ের হতে থাকে। এমনকি দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। দুই নেতৃকে রাজনীতি থেকে মায়নাস করতে 'মাইনাস টু' ফর্মুলা’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রধান দুই দলের কিছু নেতাকে 'মীরজাফর' বানানোর চক্রান্ত চলতে থাকে। সেই চক্রান্তে অনেকেই জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে জড়িয়ে পড়েন। সেনা সমর্থক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে ক্লিন ইমেজের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সাবেক আমলাদের দিয়ে 'কিংস পার্টি' গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলে সৈয়দ বজলুল করিম'কে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি এমন উদ্যোগে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। তিনি সে সময়ে ঢাকার মিরপুরে স্থানীয় আওয়ামীলীগের উদ্যোগে জনসভার আয়োজন করেন। মিরপুরে আওয়ামীলীগের কারাবন্দী নেতা কামাল আহমেদ মজুমদারের অনুপস্থিতিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করতে দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান সাহেবকে প্রধান অতিথি করে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে কঠোর ভাষায় সেনা সমর্থক মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সমালোচনা করা হয়। সভা থেকে অবিলম্বে শেখ হাসিনার মুক্তি ও জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।

২০০৮ সালে সেনা সমর্থক সরকার জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ-এর কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য করা হয় সৈয়দ বজলুল করিম'কে। কমিটির সদস্য হিসাবে তিনি সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে মহাজোট মনোনীত দলীয় প্রার্থীদের জন্য নিরলস ভাবে ছুটে বেড়ান। সেই নির্বাচনে সিলেট বিভাগের সবকয়টি আসনে শেখ হাসিনা মনোনীত মহাজোটের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে। সেই সরকারে সিলেটের কৃতি সন্তান আবুল মা'ল আব্দুল মুহিত'কে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রীর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন সৈয়দ বজলুল করিম'কে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক-এর পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সুনামের সাথে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংক-এর পরিচালকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ আসে। কিন্তু বি করিম-এর নিষ্ঠা ও সততার জন্য এমন অভিযোগের সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকের সেবা পৌছাতে দেশব্যাপী ছুটে বেড়ান। কৃষি ঋণ, ক্ষুদ্র ঋণ, নারী উদ্যোগতাদের জন্য ঋণ, সংখ্যালঘুদের ঋণ প্রদানে অহেতুক হয়রানি বন্ধ ইত্যাদি নানা বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছার বাস্তবায়ন দেখতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ বজলুল করিম'কে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া-কমলগঞ্জ একাংশ) সংসদীয় আসনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে। ২৯ নভেম্বর ২০১৩ ইং আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সেই তালিকায় মৌলভীবাজার-২ আসনে সৈয়দ বজলুল করিমের নাম ঘোষণা হয়। ২রা ডিসেম্বর ২০১৩ দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দেন। এক সময়ের কর্মক্ষেত্র শমশের নগরসহ মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া-কমলগঞ্জ একাংশ) সংসদীয় আসনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দলীয় কর্মীসভা অব্যাহত রাখেন। মৌলভীবাজার-২ আসনে বি করিমের মনোনয়ন লাভ স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

এদিকে নির্বাচন প্রতিহত করা ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার নামে জামাত-বিএনপি জোট দেশজুড়ে হরতাল-অবরোধ অব্যাহত রাখে। জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচীর নামে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালায়। এ অবস্থায় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হয়। জাতীয় পার্টির সাথে শেষ মুহূর্তে হয় নির্বাচনী বোঝাপড়া। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে মৌলভীবাজার-২ আসন আওয়ামীলীগকে ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। নেত্রীর পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থী সৈয়দ বজলুল করিম-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বৃহত্তর স্বার্থে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। ১৩ই ডিসেম্বর মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টির নাম-পরিচয়হীন প্রার্থীর জন্য তিনি নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। যদিও শেষ পর্যন্ত এই আসনে আওয়ামীলীগের স্থানীয় পর্যায়ের এক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মহাজোটের প্রার্থীকে পরাজিত করে। অনেকেই মনে করেন 'বি করিম' প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে নির্বাচনী মাঠে থাকলে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে সুনিশ্চিত ভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আজীবন সৈনিক সৈয়দ বজলুল করিম জননেত্রী শেখ হাসিনা'র ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।

২০১৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করলে মৌলভীবাজার-২ আসনের সাংসদ মাটি ও মানুষের নেতা সৈয়দ মহসিন আলী'কে সমাজসেবা মন্ত্রী হিসাবে শপথ পাঠ করানো হয়। জামাত-বিএনপি জোট ২০০১ সালে কুখ্যাত রাজাকার আলী আহসান মুজাহিদ'কে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব দিয়ে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ে ক্ষোভের যে আগুন জ্বালায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী'কে সেই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী করায় বি করিম আনন্দে চোখের জল ফেলে শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। মৌলভীবাজার জেলার তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামীলীগের ভিত অনেক মজবুত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন প্রকৃত নেতাকর্মীরা রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সৈয়দ মহসিন আলীর মন্ত্রিত্ব জেলার রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনে।

সৈয়দ মহসিন আলী জেলার রাজনীতিতে সৈয়দ বজলুল করিম'কে সম্পৃক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনিও সৈয়দ মহসিন আলীকে শুধু বন্ধু হিসাবে নয়, আপন ভাই হিসাবে দেখতেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলীয় নির্দেশে সৈয়দ বজলুল করিম মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া-কমলগঞ্জ একাংশ) আসনের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করতে এলাকার গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। নিয়মিত দলীয় সভা-সমাবেশে উপস্থিত থেকে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন। সৈয়দ বজলুল করিম বিগত দুই বছর থেকে মৌলভীবাজারেই মাসের অর্ধেক সময় অতিবাহিত করেন। শহরের কোর্টরোডের বনশ্রী আবাসিক এলাকায় নিজের বাসভবন থেকে জেলার রাজনীতিতে তাঁর নিয়মিত অংশগ্রহণ নেতাকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে। ২০১৪ সালের মার্চ মাস থেকে রাষ্ট্রীয় জনতা ব্যাংক-এর পরিচালক পদে তাঁকে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করে জনতা ব্যাংক-এর সেবা সিলেট বিভাগের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সৈয়দ বজলুল করিম মৌলভীবাজার-২ আসনে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। দলের সিদ্ধান্ত তাঁর অনুকূলে গেলে আওয়ামী আদর্শের বিনায়ক এক বি করিমের জীবনও পূর্ণতা পাবে।

লেখক : আব্দুল করিম কিম, সমন্বয়ক, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech