ফরজ নামাজের গুরুত্ব বেশি, নাকি শবে বরাতের?

  

পিএনএস (মো. সোলাইমান) : প্রত্যেক বছর আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিক (দিবাগত) রাতকে শব-ই-বরাত বা লাইলাতুল বরাত পালন করা হয়। আজ রবিবার (২১ এপ্রিল) পবিত্র শব-ই-বরাত বা লাইলাতুল বরাত। এই রাতে ধর্মপ্রিয় মুসলমাগন মহন আল্লাহর সন্তুষ্ঠি অর্জনের
জন্য ফরজ নামাজের পর নফল ইবাদাত বন্দেগী করে থাকেন।

এই রাতের ইবাদাতের ফজিলত অন্যান্য রাতের চেয়ে অনেক বেশি।

হাদিস : হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত, এক রাতে রাসূল (সা.) ঘুম থেকে উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এতো দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে, আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না? এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসূল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে, নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে?

আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

এরপর রাসূল (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের (১৪ তারিক দিবাগত) রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহ প্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।

[(শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫)। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন, এটি উত্তম মুরসাল হাদিস। (শুআবুল ইমান ৩/৩৮৩)।]

অত্র হাদিস দ্বারা প্রমাণিত অন্যান্য রাতের চাইতে শবে বরাতের রাতের ফজিলত অনেক বেশি।

[নিচের অংশটুকু লেখকের ব্যক্তিগত মতামত]

তবে কি? ফরজ নামাজের চাইতে শবে বরাতের গুরুত্ব বেশি?

আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি নিয়ম হচ্ছে শবে বরাত আসলে মসজিদে জায়গা পাওয়া যায় না। কিন্তু দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে দুই তিন কাতারের বেশি লোক হয় না। এর কারন শবে বরাতের রাতে, ধনি-গরিব, ছোট-বড়, নামাজি-বেনামাজি, ফকির-মিসকিন সবাই মসজিদে চলে আসে অধিক সওয়াব বা গোনা মাফের আসায়।

তবে আল্লাহ কি সবাইকে অধিক সওয়াব দিবেন বা সবার গোনা মাফ করেন?

না! আল্লাহ সবাইকে মাফ করেন না। আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিতে পারেন যারা খাছ দিলে আল্লাহর দরবারে পিছনের ভুলের জন্য তওবা করবেন এবং সামনের দিন গুলোতে জেনে বুঝে ভুল করবেন না এমন প্রতিশ্রুতি আল্লাহকে দিবেন।

আল্লাহ তাদেরকেই ক্ষমা করে দিতে পারেন। এবং যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সঠিক ভাবে আদায় করে। তাদের যদি কোনো পাপ থাকে (পাপ কম বেশি সবারই আছে) । আর তারা যদি সে পাপের জন্য ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তাদেরকেও মাফ করে দিতে পারেন।

শবে বরাত আসলে আল্লাহ দিয়েছেন উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য বরকত সরুপ।

কারন আমরা শেষ নবীর উম্মত, আমাদের হায়াত ৬০-৭০ বছর। আর অন্যান্য নবীর উম্মতগণের হায়াত ছিল এক হাজার বছর। তাদের এই দীর্ঘ জীবনে তারা অনেক সওয়াব হাসিল করেছেন। তাই আমরা শেষ নবীর উম্মত হওয়ায় আমদের হায়াত অনেক কম। অতএব আমরা যাতে অল্প হায়াতে অন্যান্য নবীদের উম্মতের সমান সওয়াব হাসিল করতে পারি সে জন্য আল্লাহ বরকত সরুপ আমাদের এই শবে বরাত দান করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেনঃ হে রাসূল (সঃ) আপনি বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ; তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা ঝুমার: আয়াত ৫৩)

(তাই আমি বলব এই শবে বরাত তাদের জন্য যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে এবং যারা শবে বরাতের রাত থেকে পিছনের সকল ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নতুন করে ইসলামিক জীবন যাপন করতে চায় তাদের জন্য আল্লাহ এই রাতের বরকত দিয়ে থাকেন বলে আমি মনে করি।)

কিন্তু আমাদের সমাজে শবে বরাত যেভাবে পালন করা হয় তাতে কোনো লাভ হয় বলে আমি মনে করি না। কারন আমাদের সমাজের মানুষ সারা বছর নামাজ পরে না, সুধ খায়, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মানুষকে কষ্ট দেয়, এই ধরনের লোকদের জন্য কোনো লাভ আছে বলে আমি মনে করি না। কারন শবে বরাতে সারা রাত ইবাদাত করবে পরদিন থেকে আর কোন নামাজের খবর থাকবে না। তাহলে আল্লাহ কি ভাবে এদের রহমত দান করবেন।

আর এক শ্রেণীর লোক আছে যারা শবে বরাতের রাতে ঈশার নামাজ শেষ করে, ভ্যান গাড়ি, মটর বাইক, এইসব নিয়ে পাড়া মহল্লায় ঘুড়ে বেরায়, আর এই মসজিদে দু রাকাত, ঐ মসজিদে চার রাকাত, আরেক মসজিদে ছয় রাকাত, এভাবে নামাজ আদায় করে, এত কোনো লাভ হয় বলে আমি মনে করি না।

তবে যারা এইসব করে, তারা জানে যে শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়লে অনেক সওয়াব তাই তারা নামাজ পড়ে। কিন্তু কি ভাবে পড়লে সওয়াব বা কাদের জন্য সওয়াব এটাতো তারা জানে না। কারন আমাদের সমাজের আলেম ওলামাগণ মানুষকে শবে বরাতের গুরুত্ব ঠিকই বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা পর্দার গুরুত্ব বুঝাতে সক্ষম হয় নাই। যার ফলে আজ আমাদের সমাজের মানুষ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়ে বছরে একবার শবে বরাতের নামাজ পড়ে।
আর যদি আলেম ওলামাগণ চান তাহলে এই সমাজকে ইসলামের সঠিক রূপ দিতে পারবেন। তারা যে ভাবে শবে বরাতের গুরুত্ব মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন, সে ভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, পর্দার বিধান সহ ইসলামের সকল বিধি বিধান বুঝাতে সক্ষম হবেন বলে আমি মনে করি, ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামের সঠিক বুঝ দান করুক, আমিন।

লেখক : (তিতুমীর কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র)

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech