মুহিতের দেখানো পথেই হাঁটছেন কামাল

  


পিএনএস ডেস্ক: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার যে বাজেটটি উপস্থাপন করেছেন, সেটি বলতে গেলে সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাজেটেরই ধারাবাহিকতা, কিন্তু এবারের বাজেট বক্তৃতাটি বেশি সংক্ষিপ্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে গিয়ে মুস্তফা কামাল ও তাঁর মন্ত্রণালয়ের টিম খুব মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে পারেনি। আমরা যারা বাজেট বক্তৃতা থেকে আগামী অর্থবছরের অর্থনীতির সম্ভাব্য গতি–প্রকৃতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে অভ্যস্ত, তঁাদেরও বেশ অতৃপ্ত থাকতে হয়েছে বাজেট বক্তৃতার দুর্বল উপস্থাপনার কারণে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অঙ্গীকারই ঘোষিত হয়েছে। ধারাবাহিকতার যে বিষয়গুলো বেশি প্রণিধানযোগ্য, সেগুলো হলো:

১. আবুল মাল আবদুল মুহিত অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী প্রাক্কলিত বাজেট বরাদ্দ নির্ধারণ করার রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ৯৫,০০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দিয়ে শুরু করেছিলেন ২০০৯-১০ অর্থবছরে এবং ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ঘোষণা করেছিলেন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য। এবার মুস্তফা কামাল ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছেন, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪,৪২,৫৪০ কোটি টাকার চেয়ে ৮০,৬৪৯ কোটি টাকা (১৮.২২ শতাংশ) বেশি। টাকার অঙ্কে বাজেট বরাদ্দের এহেন ‘বছর বছর উল্লম্ফন’ আপাতদৃষ্টিতে মাত্রাতিরিক্ত মনে হলেও অস্বাভাবিক নয়। দেশের অর্থনীতি ‘উড্ডীয়মান স্তরে’ (টেক-অফ) দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল অবস্থানে থাকায় সরকারি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধিকেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়াতে হবে। বিশেষত, বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ যেহেতু সরকারি খাতের বিনিয়োগকে দ্রুত বাড়ানোর দর্শনে বিশ্বাসী, তাই শেখ হাসিনার সরকার মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাতকে বাড়ানোর জন্য প্রাইভেট খাতের বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও গতিশীলতা সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে। গত ১০ বছরে এর সুফল পেয়েছে জনগণ। বরং আমি বলব, কর-জিডিপির অনুপাত এবং রাজস্ব-জিডিপির অনুপাতকে গত ১০ বছরে আরও অনেক বেশি বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। এ দুটি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে এখনো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, শুধু ভুটান আমাদের পেছনে রয়েছে।

আগামী অর্থবছরে ২,১১,৬৮৩ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষিত হয়েছে, যার মধ্যে ২,০২,৭২১ কোটি টাকা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ। অতএব, সরকারের উন্নয়ন বাজেট জিডিপির শতাংশ হিসাবে ৮.৩৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা খুবই যৌক্তিক। সমস্যা হলো, গত ১০ বছরের বাজেটের মতো আগামী বছরের বাজেটও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাবে না রাজস্ব সংগ্রহে বড়সড় ঘাটতি হওয়ার কারণে। আরও দুঃখজনক হলো উন্নয়ন বাজেটের ব্যয়-বরাদ্দ নিয়ে প্রতিবছর যে লুটপাটের মচ্ছব চলে, তাতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মান দিন দিন খারাপ হয়েই চলেছে। সাংসদ, নেতা-কর্মী, আমলাতন্ত্র ও সর্বস্তরের প্রকল্প-পাইপলাইনের খাই মেটাতে ব্যয়-বরাদ্দের বড় অংশ বঙ্গবন্ধু-কথিত ‘চাটার দলের’ পেটে চলে যাওয়া এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

২. প্রতি বাজেটেই যে রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়, তাতে বছরের শেষে বিরাট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটকে ৪,৪২,৫৪০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু সেটাও এই রাজস্ব ঘাটতির কারণে এ বছর মানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অর্জনের সম্ভাবনা নেই। আগামী অর্থবছরে এই রাজস্ব ঘাটতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। অতএব, ২০১৯-২০ অর্থবছরে যে ১,৪৫,৩৮০ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলিত হয়েছে, প্রকৃত ঘাটতি তার চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত হচ্ছে। এমনিতেই ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশি সূত্র থেকে ৬৮,০১৬ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের যে প্রাক্কলন ঘোষিত হয়েছে, সেটার জন্য ‘সাপ্লায়ারস ক্রেডিটের’ প্রবাহ অনেক বেড়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তার সঙ্গে যদি রাজস্ব ঘাটতির বর্ধিত অঙ্ক যোগ হয়ে যায়, তাহলে অর্থনীতি ক্রমেই ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি থেকে সরকার ৭৭,৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নিলে সেটাও কোনো সুখবর হবে না। বিশেষত, ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৭,৩৬৩ কোটি ঋণ সরকার নিলে প্রাইভেট খাতের ঋণ সরবরাহে টান পড়বে। বছরের শেষে গিয়ে দেখা যাবে, সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাক্কলিত ৩০,০০০ কোটির চেয়ে অনেক বেশি ঋণ নিতে হবে সরকারকে।

৩. এবারের বাজেটেও আয়বৈষম্য কমানোর কোনো তাগিদ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং মূল্য সংযোজন করের মাধ্যমে বাজেটে মধ্যবিত্ত জনগণকে টার্গেট করা হলেও সমাজের উচ্চবিত্ত গোষ্ঠীর জন্য করব্যবস্থায় অনেক রকম ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আয়কর সারচার্জের সিলিং বৃদ্ধি, জমির রেজিস্ট্রেশন হার হ্রাস এবং মূল্য সংযোজন করের নানাবিধ হারের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর ব্যবসায়ীবান্ধব মানসিকতার অনেক আলামত খুঁজে পাওয়া যাবে।

৪. কালোটাকা সাদা করার জন্য এবার অনেকগুলো সুবিধা রাখা হয়েছে। মুহিতের সব কটি বাজেটেও কালোটাকা সাদা করার অনেক ব্যবস্থা রাখা হতো, কিন্তু এবারের বাজেটে কালোটাকাকে যেভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেটা অনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বলা চলে। অসততাকে মেনে নেওয়া এক কথা, আর তাকে উৎসাহিত করা আরেক কথা!

বাজেটের কয়েকটি প্রধান প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হলো প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করার জন্য ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদানের প্রস্তাব, পুঁজিবাজারের মুনাফা উৎসাহিত করার জন্য লভ্যাংশের কর অবকাশ ২৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকায় নির্ধারণ এবং দ্বৈতকর পরিহারের প্রস্তাব, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বাজেটের ১৫.২ শতাংশ (জিডিপির ৩.০৪ শতাংশ) বরাদ্দ এবং ৫০ লা খের কম টার্নওভারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মূসক থেকে অব্যাহতির প্রস্তাব। বাজেটের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা সম্পর্কে বাজেট বক্তৃতায় যেহেতু কিছুই বলা হয়নি, তাই মিডিয়ায় বাজেটের খুঁটিনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর ক্রমেই দেখা যাচ্ছে কর না বাড়িয়ে শুধু করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর যে কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সেটা অসত্য ভাষণ ছাড়া কিছুই নয়। তবে তাঁর কিছু কিছু প্রস্তাবকে আমি ইতিবাচক বলব। বিড়ি-সিগারেটের কর বৃদ্ধি, মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর কর বৃদ্ধি, গুঁড়ো দুধে কর বৃদ্ধি, পোলট্রি ফিড, পশু ও মৎস্য খাদ্য উপকরণের কর হ্রাস, কৃষি যন্ত্রপাতির কর হ্রাস—এগুলো ভালো প্রস্তাব। কিন্তু এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব, চিনির দাম বাড়ানো এবং ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো সমর্থনযোগ্য নয়। বাজেট বক্তৃতায় সবার জন্য পেনশন চালুর প্রয়াস নেওয়া হবে বলা হয়েছে, শস্যবিমা চালুর পাইলট প্রকল্প নেওয়া হবে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কঠোর হস্তে দমনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। আমরা একবুক প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব সরকার সত্যি সত্যি কাজগুলো করে কি না, তা দেখার জন্য। অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর যেভাবে ঋণখেলাপিদের প্রতি দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে শুরু করেছিলেন, তাতে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস! মহামান্য হাইকোর্ট তাঁর খামখেয়ালিপনাকে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন!

ড. মইনুল ইসলাম : অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক


পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech