‘নারী ও মা থেকে দেশনেত্রী’

  

পিএনএস (মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স) : নারী শব্দটি সামনে পড়লেই সর্বপ্রথম যে বিষয়টি অন্তস্থ হয় তা হচ্ছে মা’। আবার এই নারীই হচ্ছে বোন, ভগ্নি কিংবা প্রিয়তমা সহযাত্রী বা প্রেরণার প্রেয়সী। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও কিছুটা রক্ষণশীল দেশে যেখানে মৌলিক চাহিদা পূর্ণ করাই সর্বাগ্রে সেখানে নারীকে বিশেষ বিবেচনা প্রদান কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটাই কল্পনাতীত। তবে হ্যাঁ, এতোদসত্ত্বেও নারীকে সম্মান, মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের বিশেষ গুরুত্বটি সামনে আনতে পারাটাই সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতির সুরুচি ও অগ্রগতির পরিচায়ক। কেননা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন,

“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।

সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি যেমন নির্ভর করে একজন যোগ্য নেতার নেতৃত্বের উপর, তেমনি একজন মা’ এর মাতৃত্বেই গড়ে উঠতে পারে একজন যোগ্য ও সার্থক সন্তান। যেমনটি বলেছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট,

“আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও,
আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিব”।

প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ এর স্বাধীনতার প্রায় ২০ বছর পর আমাদের এই বাংলাদেশ এবং এই বাংলাদেশি জাতি পেয়েছিল প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। যিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ, একজন মমতাময়ী মা, মহান মুক্তিযুদ্ধে দুজন নাবালক সন্তানসহ নির্যাতিত নারী মুক্তিযোদ্ধা, বিশ্ববেহায়া স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে টানা প্রায় ৯ বছর গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানকারী একমাত্র আপসহীন নেত্রী।

এদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন মা’ এবং দৃঢ়চেতা নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর মাতৃত্বের মমত্ববোধ আর রাজপথে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত আপসহীন মনোভাব দিয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন এদেশে নারীর ক্ষমতায়ন তথা নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির গুরুত্বটি।

বেগম খালেদা জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের যেখানে অর্ধেকই নারী সেখানে নারীদের উন্নয়ন ব্যতীত কোনভাবেই এদেশ তথা এদেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তাই, তিনি প্রথমেই গুরুত্ব দেন শিক্ষা তথা নারী শিক্ষার উপর আর সেজন্যই তিনি প্রথমে এস এস সি এবং পরবর্তীতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করলেন এবং নারী শিক্ষার বিস্তারে প্রণোদনা হিসেবে উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করলেন। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলেন। দরিদ্র শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলেন। সারাদেশে হাজার হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা নির্মাণ ও পুন:নির্মাণ করলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে কম্পিউটার শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে সমাবর্তন উৎসব চালু করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সেশনজট দূর করা হয়। গণশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা হয়। বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের বেতনের অনুদান প্রথমে ৮০ ভাগে বৃদ্ধি এবং পরে সরকারী তহবিল থেকে পূর্ণ বেতন প্রদান প্রবর্তন করা হয়। শিক্ষকদের টাইমস্কেল দেয়া হয়। মহিলাদের জন্য পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়া উচ্চশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠন ও সকল বয়সের মানুষের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করলেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের মধ্য দিয়ে। নারীদের উচ্চশিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের নিমিত্তে বেগম খালেদা জিয়া’র দূরদৃষ্টি এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়-ই চট্টগ্রামে ১০৪ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’। দেশে সর্বপ্রথম বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আরো কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত ও প্রশ্নফাঁসবিহীন পরীক্ষা-ও নিশ্চিত করেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া খেতাবপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা তারমন বিবি (বীর প্রতীক) কে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদান ও ভাতার ব্যবস্থা করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম প্রতিষ্ঠিত মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সম্প্রসারিত করে গঠন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রিয়তম স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সংস্কৃতি জগতে শিশু মেধা অন্বেষণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ ‘নতুন কুঁড়ি’ পুনঃ প্রচলন করেন।

নারীর নির্যাতন প্রতিরোধে যৌতুক প্রথা নিরুৎসাহিত করতে নিলেন কঠোর পদক্ষেপ, নারীর প্রতি এসিড সন্ত্রাস রুখে দিতে করলেন কঠোর শাস্তির বিধান, নারী ও শিশু-পাচার রোধেও নিলেন কঠোর ব্যবস্থা। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে জোর প্রচেষ্টা রাখলেন। গ্রাম সরকার, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, জাতীয় সংসদে সর্বত্র নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করলেন। চাকুরি ক্ষেত্রে অধিক হারে নারীর প্রবেশের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিশেষ কিছু চাকুরির ক্ষেত্রে নারীর কোটা বৃদ্ধি করলেন (প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে) এবং একইসাথে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করেছেন বেগম খালেদা জিয়া।

বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন যে, ‘গ্রামের উন্নয়ন মানেই সারা দেশের উন্নয়ন’। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উৎসাহ দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার, সমবায় আন্দোলনকে সহায়তা প্রদান করলেন। নারীদের ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়ে আগ্রহী ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মে নিয়োজিত নারীদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদান ব্যবস্থা চালু করলেন। দরিদ্র নারীদেরকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ব্লাকবেঙ্গল ছাগল প্রদান ও হস্তশিল্পের নানা উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণসহ গৃহহীনদের জন্য তৈরি করে দিলেন কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস গার্মেন্ট শিল্প স্থাপন ও প্রসারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানকে অনুসরণ করেই এশিল্পে নারীর কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেন বেগম খালেদা জিয়া।

একজন নারী ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন নেতৃত্ব বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১-৯৬ সময়কালে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করেন।
১৯৯৬ সালে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করার নজীর স্থাপনও করেন।

আমাদের জাতীয় বীরত্ব ও গর্বের প্রতীক মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-ও প্রতিষ্ঠা করেন এই মহীয়সী নারীনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পেছনে যেমন একজন নারীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে ; হোক সে মা, কিংবা বোন, ভগিনী, প্রিয়তমা প্রেয়সী স্ত্রী। তেমনই, বাংলাদেশ নামক এই স্বাধীন-সার্বভৌম বদ্বীপের গণতন্ত্র, উন্নয়ন, উৎপাদন ও সমৃদ্ধির ইতিহাসে নিজগুণে প্রজ্জ্বলিত একটি নাম বেগম খালেদা জিয়া ; যিনি তাঁর নারীত্ব, মাতৃত্ব, আপসহীন মনোভাব, অসীম সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে বিনির্মাণ করেছেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্থায়ী ভিত্তি এবং ফলশ্রুতিতে, আপামর জনগণের ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়েছেন বিপুল জনপ্রিয় দেশনেত্রী হিসেবে।

“আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০” এর এই দিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করছি দেশের ইতিহাসে একমাত্র অপরাজেয় নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীন বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র প্রতি। একইসাথে, অবিলম্বে এই মহীয়সী নারীনেত্রীর নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।

লেখক : মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স (এম.ফিল গবেষক), যুগ্ম আহ্বায়ক জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন