করোনার পর বিশ্বে চলবে কার খবরদারি?

  

পিএনএস (মোস্তফা কামাল) : জানা-অজানা, ঐশ্বরিক বা প্রাকৃতিক, জৈবিক বা রাসায়নিক যা-ই হোক করোনা মহামারিতে দুনিয়া বা মানবকুল ধ্বংস হয়ে যাবে, তেমনটি ভাবছেন না কেউ। যখনই বিদায় নিক, করোনা বিশ্বায়ন ধারণাকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে যাবে। করোনা নামের খুদ্র-অচেনা ভাইরাসটি তো এরইমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে ধনে-জনে শক্তিধর নানা দেশ ও দেশপতিদের এতদিনের খবরদারি একেবারেই ঠুনকা। বিশ্বায়নের পরতে পরতে ফাঁকিবাজিও স্পষ্ট। তাতে বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টানোর একটা বিশ্বাস অনেকের।

করোনা মহামারি কেটে যাওয়ার পর কী দাঁড়াবে বিশ্ব পরিস্থিতি? বিশেষ করে কর্তৃত্ব-খবরদারির দৃশ্যপট কি পাল্টে যাবে?- এ ধরনের কিছু প্রশ্ন ঘুরছে বিভিন্নমহলে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল করোনা সংক্রমণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় সংকট বলেছেন। নিজ দেশের বিবেচনায় নয়, গোটা দুনিয়ার বাস্তবতায়ই তার এই মূল্যায়ন। আইএমএফ জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন পুরোই অনিশ্চিত। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুব খারাপ এক আগামীর প্রস্তুতি নিতে বলেছেন সবাইকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মহামন্দার জেরে গত শতকের প্রথম বৈশ্বিক জোট গঠন হয়। মন্দার কারণে সে সময়ের মানুষ ও প্রশাসন অবাধ বাজারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরেক চিত্র। তখন থেকে দেশে দেশে সামরিক উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিগত খাতে ব্যয়-বরাদ্দ বেড়েছে। এ ধরনের চর্চা দেখা গেছে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা, দেশে দেশে যুদ্ধ-দামামার পরও। তবে, সব বাস্তবে ফলেনি।

এর আগে, বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বকাঠামো বদলে দিয়েছিল গত শতকের দুটি বিশ্বযুদ্ধ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ওই ওলটপালটকে চরমে নিয়ে যায়। এবারের ঘটনা, প্রকৃতি ও প্রেক্ষিত একেবারে ভিন্ন। বিশ্বে নানান ইস্যুতে খবরদারি করা দেশগুলোর নিজের চরকায় তেল দেয়া এবং সংস্থাগুলোর চুপ মেরে ধাকার মধ্য দিয়ে মহামারির পর তাদের অবস্থানের নানা বার্তা দিচ্ছে। তখন তাদের কর্তৃত্বের শোডাউন হবে এখনকার অর্থাৎ করোনা মোকাবিলার সক্ষমতা দৃষ্টে। অস্ত্রবল বা আগের বাহাদুরিতে নয়। আর করোনাযুদ্ধে এরইমধ্যে চরম মার খেয়েছে এতদিনের বিশ্ববাহাদুর যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনীতি, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সেক্টরে বড়াই করা ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সের মতো দেশও নুইয়ে পড়েছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ করোনার পর কোথায় গড়াবে? কে জিতবে এ যুদ্ধে?- তা এরইমধ্যে অনেকটা স্পষ্ট। করোনায় সবার আগে আক্রান্ত হওয়া চীন সবার আগে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। এতদিন ইউরোপ-আমেরিকা তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করত। তাদের একাংশ এখন ভাইরাস ছড়ানোর জন্য চীনসহ ‘বাইরের মানুষ’দের দায়ী করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্প চীনকে দায়ী করেই চলছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে বিশ্ব পরাশক্তি বাড়িয়েই চলছিল যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দশক ধরেই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে সেনা পাঠিয়ে কর্তৃত্ব জাহির করেছে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রকে চীনসহ কয়েকটি দেশ চ্যালেঞ্জ করলেও কুলিয়ে উঠতে পারেনি। করোনা ঢেউ সেখানে একটা ছেদ ফেলেছে।

চীনে যখন করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ তখনও একে ‘চীনাভাইরাস’ বলে পাত্তা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দম্ভ করে বলেছেন ‘বিশ্বের সেরা চিকিৎসাব্যবস্থা তাদের। করোনা কিছুই করতে পারবে না। কয়েকটা ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে’। চীনের পর ইতালি ও স্পেন করোনায় কাবু হয়ে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক হয়নি। সেই পরিণতিতে এখন নাকাল দেশ। হাসপাতালে জায়গা নেই। নার্স-চিকিৎসক সংকট। ওষুধ বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। চীনের কাছ থেকে মাস্ক, চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিলের তোড়ে মরদেহ পরিবহনের ব্যাগ কিনতে হচ্ছে তাদের। কবরস্থানে জায়গা না হওয়ায় পার্কে গণকবর দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন দুর্দশা দেখে পরাশক্তি ও বন্ধু ভেবে এতদিন দেশটিকে তোয়াক্কা করে চলা দেশগুলো এখন পিঠ দেখাচ্ছে। এ পরিস্থিতি চীনকে বিশ্বের খবরদারিত্বে নিয়ে আসার বাস্তবতা তৈরি করেছে। করোনা চিকিৎসায় রাতারাতি হাসপাতাল বানিয়ে ফেলা, সারাদেশের ডাক্তার-নার্সসহ চিকিৎসাকর্মীদের মানুষের চিকিৎসায় জড়ো করা, চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা, সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় কঠোরতার নজির দেখিয়েছে চীন।

তাদের লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, টেস্ট, আইসোলেশন ও চিকিৎসার ফর্মুলা ধার করেছে গোটাবিশ্ব। চীন ঘুরে দাঁড়িয়ে সারাবিশ্বে পাঠাচ্ছে চিকিৎসা সরঞ্জাম। যুক্তরাষ্ট্রের বড় অ্যান্টিবায়োটিকের বাজার চীনের দখলে। সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দেয়ার মতো সব উন্নয়ন পরিকল্পনাও নিয়েছে। পরমাণু অস্ত্রে সমৃদ্ধ এককভাবে বিশ্ব পরাশক্তি না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলা উত্তর কোরিয়াকেও করোনা কাবু করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিডিয়া তা আমলে না নিলেও উত্তর কোরিয়ার করোনা মোকাবিলা দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রমাণ। তা উত্তর কোরিয়াকে আগামীতে বিশ্ব নেতৃত্বে আশাবাদী করতেই পারে। করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে রাশিয়ার সাফল্যও প্রশংসিত। সংক্রমণ শুরুর পরপরই রাশিয়া সেটিকে বেশি দূর যেতে দেয়নি। অল্পসময়ের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে রাশিয়ার জনগণ। এ সক্ষমতা রাশিয়াকে আগামীতে ইতিবাচক কিছু দেখাতে পারে।

ব্যাপক সাফল্য না পেলেও পরাশক্তি ভারত করোনায় ভেঙে পড়েনি যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় শক্তিধরদের মতো। তা বিশ্বের ভবিষ্যৎ অর্থবাণিজ্যে ভারতকে আরও বড় কিছু পাইয়ে দিতেও পারে। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরানের মতো দেশগুলোকে দমিয়ে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের অপরিহার্যতা যে আরও বাড়বে, তা নিশ্চিত বলা যায়। বর্তমান বিশ্বপ্রজন্ম এ রকম সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক দুর্যোগ আর দেখেনি। ডলার-পাউন্ড পকেটে নিয়ে পণ্য না পাওয়ার অভিজ্ঞতা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক নাগরিকের জন্য জীবনে এই প্রথম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সীমান্ত বন্ধ এবং জরুরি অবস্থার মতো গুরুচরণ দশা।

এ পরিস্থিতিতে অনেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালের ‘স্প্যানিশ-ফ্লু’র কথাও স্মরণ করছেন। সেই দুর্যোগে অস্ট্রিয়া আর জার্মানির শক্তিমত্তা হারিয়ে উত্থান ঘটেছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের। ১৯৪৫ সালের মে মাসের আগে-পরের বিশ্ব আলাদা হয়ে গিয়েছিল। করোনাভাইরাস মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি মাত্রায় চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিতে পারে। এই অর্থে করোনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সবচেয়ে বড় ‘রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘটনা’।

এবারের নির্জলা সত্য হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ বিশ্বের মুরব্বি দেশগুলোর নেতারা করোনার ধকলের সময় বিশ্বকে ন্যূনতম নেতৃত্বও দিতে পারেননি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, জি-২০, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বৈশ্বিক সংস্থাগুলোরও হাত গুটানো ভূমিকা। দাপটশালী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি করেছে। মিত্রতা-ঘনিষ্টতা ভেঙে পরস্পরের সীমান্ত বন্ধের কাজে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করেছে।



খোদ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ডলারকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পিছুটানও লুকানো-চাপানো থাকছে না। যা রাজনীতি-অর্থনীতি-কূটনীতিসহ বৈশ্বিক খবরদারির পালাবদলের ইঙ্গিত। অতীত মহামারির ইতিহাসেও অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হওয়ায় বহু রাজত্ব নুয়ে পড়ার নজির রয়েছে। এবার করোনার জেরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর ভরসা কমিয়ে দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থানের ধারণাও জোরালো হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন। সৌজন্য জাগো নিউজ

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন