মেয়েদের অগ্নিপরীক্ষার নাম ভারত

  


পিএনএস ডেস্ক: ‘ফুটবল, ফুটবল, ফুটবল...। শহীদ রঙ্গশালায় আজ ফুটবল উৎসব। সাফের সেমিফাইনালের দুটি ম্যাচ দেখার আমন্ত্রণ রইল সবার’—সকাল থেকেই শহরে চলছে মাইকিং। হঠাৎ শুনে মনে হবে যেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের আশপাশেই রয়েছি আমরা। ঠিক এভাবেই যে ঢাকায় ফুটবল ম্যাচ দেখার আমন্ত্রণ জানায় বাফুফে!

রঙের উৎসব দোলের ছোঁয়া লেগেছে বিরাটনগরের অলিগলিতে। স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরা মেতে উঠেছে হোলির আনন্দে। রাস্তায় নেচেগেয়ে রং খেলে একাকার অবস্থা সবারই। বাংলাদেশ দলের টিম হোটেল থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের যে স্কুলমাঠে কাল অনুশীলন করেছেন সাবিনারা, সেখানেও আবির ছড়ানো হয়েছে। ডিপিএস স্কুলের মুক্ত মঞ্চের ওপর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আবির যেন হাতছোঁয়া দূরের মাঠে অনুশীলনরত মারিয়া, কৃষ্ণাদের মনেও লেগেছে। হোক না সাফের সেমিফাইনাল, প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, হোক চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত—মেয়েদের চেহারায় নেই কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ।

বিরাটনগরের শহীদ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে আজ বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে শুরু হবে খেলা। বাঁচামরার লড়াইয়ের আগে মেয়েরা থেকেছে নির্ভার। এত দিন ফুটবল ছাড়া হালকা অনুশীলন করলেও কাল একটু হলেও ছিল ব্যতিক্রম। আলাদা করে ব্যস্ত রাখা হয়েছিল মাঝমাঠ, ফরোয়ার্ড লাইন, ডিফেন্ডারসহ প্রতি বিভাগের ফুটবলারদের। এক ফাঁকে পেনাল্টি শুটআউটও করেছেন তিন গোলকিপার রুপনা চাকমা, মাহমুদা আক্তার, ইয়াসমিন আক্তার।

দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে এই ভারত দুর্বার, দুর্জয়। এ পর্যন্ত সাফের ২১টি ম্যাচের ২০টিতেই জিতেছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই ভারতের কাছে হেরেছে। একটা মাত্র ড্র, সেটি বাংলাদেশেরই সঙ্গে। এটাও একটা অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের। ২০১৬ সালে শিলিগুড়িতে সাফের গ্রুপ পর্বে সেবার গোলশূন্য ড্র করেছিলেন সাবিনা-কৃষ্ণারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফিফা র্যারঙ্কিংয়ে ভারত ৬২তম, বাংলাদেশ ১২৫তম স্থানে। সাফ ও অন্যান্য আসর মিলিয়ে যে আটবার ভারতের মুখোমুখি হয়েছে, সাতবারই হেরেছে বাংলাদেশ। ভারতের জালে এ পর্যন্ত ১টি করে গোল করেছেন সাবিনা, কৃষ্ণা ও স্বপ্না।

এমন কঠিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে কি লড়াই করা সম্ভব? অন্তত হারের আগেই হার মানতে রাজি নন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন, ‘এই মেয়েরা এত দিন বয়সভিত্তিক দলগুলোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কাল হবে তাদের আসল লড়াই। তা ছাড়া সেমিফাইনাল নকআউট ম্যাচ। ওরা শক্তিশালী হলেও এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। মেয়েরা জয়ের জন্যই মাঠে নামবে।’

গ্রুপ পর্বে নেপালের কাছে বাংলাদেশ হেরেছিল ছোট ছোট ভুলের মাশুল দিয়ে। সেই ভুল শুধরে নিয়েছে আগেই। ভারতের সঙ্গে রণকৌশলও ঠিক করে ফেলেছেন কোচ। ফরোয়ার্ড লাইনে থাকবেন সাবিনা, স্বপ্না, কৃষ্ণা ও সানজিদা। লেফট ব্যাকে শামসুন্নাহার সিনিয়র, রাইটব্যাকে শিউলি আজিম। রক্ষণে আঁখি ও মাসুরা। বরাবরের মতোই মাঝমাঠের প্রাণভোমরা হয়ে খেলবেন মারিয়া ও মণিকা। কোচের প্রথম পছন্দ ৪-২-৪ ছক। তবে রক্ষণ সামলানোর সময় সেটা হয়ে যাবে ৪-৪-২। সামনে তখন থাকবেন সাবিনা ও সানজিদা। কৃষ্ণা ও স্বপ্না নিচে নেমে আসবেন। বাকিটা কাভার করবেন শিউলি আর শামসুন্নাহার।

কোচের আত্মবিশ্বাস যেন তুঙ্গে, ‘এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে এটাই আমাদের শেষ ম্যাচ। সেটা ভাবছিও না। ফুটবলে যেকোনো কিছু হতে পারে।’

গত নভেম্বরে এই ভারতের কাছেই অলিম্পিক বাছাইপর্বে ৭-১ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। সাবিনাদের জন্য সুসংবাদ, সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ফুটবলার বালা দেবী ও কমলা দেবী নেই। কিন্তু ভারতের সঞ্জু যাদব, সংগীতা বাসফোর, দাংমেই গ্রেসদের আক্রমণ সামলাতেই তো দিশেহারা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। অবশ্য কোচ বলছেন, আগের মতো একজন একজন করে পাহারা নয়, জোনাল মার্কিংয়ে খেলবে দল।

মেয়েদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ইতিবাচক সব ভাবনা। বাইরের সবকিছু থেকে দূরে রাখা হচ্ছে কৃষ্ণাদের। যেন সব মনোযোগ থাকে সেমিফাইনালে। তাই তো পরশু রাতে আনফার (অল নেপাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যেখানে সব দলের মেয়েরা এসে আনন্দ–ফুর্তি করেছে, সেখানে বাংলাদেশ দলের শুধুই কর্মকর্তারা ছিলেন। কোচ ও মেয়েরা হোটেলেই সময় কাটিয়েছেন।

চোটের কারণে গত দুই ম্যাচে ছিলেন না কৃষ্ণা রানী সরকার। আজ তাঁকে পাওয়া যাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে হারের ম্যাচে একমাত্র গোল করেছিলেন এই কৃষ্ণাই। সেমিফাইনালকে ‘ফাইনাল’ হিসেবেই দেখছেন টাঙ্গাইলের কিশোরী, ‘আমরা দুই বছর আগে ভারতের সঙ্গে ড্র করেছিলাম। আর ফাইনালে লড়াই করেই হেরেছিলাম। এবারও শতভাগ উজাড় করে খেলব। ওদের হারানো সম্ভব।’

দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলে ভারত যেন ‘হিমালয়’। নেপালে এসে সেই হিমালয়ের চূড়া জয় করেই মেয়েরা পৌঁছাতে চায় ফাইনালে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech