নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জ্ঞান হারান সৌদি ফেরত গৃহবধূ

  

পিএনএস ডেস্ক : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের এক গৃহবধূকে (২০) প্রায় সাত মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তাকে দেওয়া হয়েছিল যৌনকর্মীর কাজ। যৌনকর্মে রাজি না হলে তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

ওই গৃহবধূকে সৌদির একটি অফিসে রেখে প্রতিদিন তিন-চারজন ধর্ষণ করতেন। অবশেষে তিনি পুলিশের সহায়তায় সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে গত ২৬ নভেম্বর দেশে ফিরে আসেন। গত সাত মাস তার ওপর চলা সেই নির্যাতনের বর্ণনা দেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে জ্ঞান হারান ওই গৃহবধূ।


চিকিৎসকরা জানান, ওই গৃহবধূ মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন কথা বলছেন। তার গোপনাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে।

ওই গৃহবধূর বিয়ের সাত মাসের মাথায় স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালের প্রলোভনে সৌদি যান। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল ঢাকার ফকিরাপুলে অবস্থিত সৌদিয়া রিকুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে তিনি গিয়েছিল সৌদির দাম্মামে।

সেখানে যাওয়ার পর থেকে ওই গৃহবধূকে গৃহকর্মীর কাজ না দিয়ে ব্যবহার করা হতো যৌনকর্মী হিসেবে। এ কাজে তিনি আপত্তি জানালে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতনকারী তাকে জানান, বাংলাদেশি চার লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে কেনা হয়েছে যৌনকর্মী হিসেবে। নির্যানকারীদের কাজে মিনতি করে তিনি রক্ষা করতে পারেনি নিজের সম্ভ্রম। যৌন কাজে রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতনের অংশ হিসেবে জলন্ত সিগারেট দিয়ে তার বুক ও স্পর্ষকাতর স্থান পোড়ানো হতো। বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রহার করে হাত, পা ও দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত করা হতো। প্রায়ই একাধিকজনের সঙ্গে যৌন নির্যাতনে ওই গৃহবধূ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। সুযোগ বুঝে রুবিনা পালিয়ে গিয়ে সৌদি পুলিশের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি হন। নির্যাতনে আহত স্থানের ছবি সেখান থেকে দেশে স্বামী ও স্বজনদের কাছে পাঠান।


এরপর স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালকে বলে স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দেন ওই গৃহবধূর স্বামী। পরে ঘটনাটি তিনি কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মর্তাকে (ইউএনও) জানান। এতে চাপে পড়ে সৌদিয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ছয় মাস ২৬ দিন পর গত ২৬ নভেম্বর ওই গৃহবধূকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

ওই নির্যাতিত গৃহবধূর মা জানান, তারা সরকারের সহায়তায় গত ২৬ নভেম্বর মেয়েকে দেশে এনেছেন। দেশে ফিরে ওই গৃহবধূ সৌদি আরবে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর আদম ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালের সহায়তা তাকে শ্রীমঙ্গলের মুক্তি মেডিকেয়ারে ভর্তি করা হয়।

গৃহবধূর মা আরও জানান, তার ভালো মেয়ে বিদেশে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন।

ওই গৃহবধূর স্বামী জানান, তারা বিয়ে করেছেন মাত্র সাত মাস হলো। পরিবারে অভাব অনটন ছিল, তবু বাঁশের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চলছিল তাদের। আদম ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালের মাধ্যমে সৌদিতে গৃহকর্মীর কাজ করে ভালো আয় হওয়ার প্রস্তাব পেলে প্রথমে তার স্ত্রী রাজি হননি। সৌদি আরবে ভালো নিরাপত্তায় ঘরের কাজকর্ম করে বেশি টাকা রোজগারের কথা শুনে এক সময় মোস্তফা কামাল পাসপোর্ট ও ভিসার কাজ করে দেন। পরে তার স্ত্রী সৌদি আরব যান।

গৃহবধূর স্বামী আরও জানান, সৌদি আরব যাওয়ার পরপরই তার স্ত্রীর ওপর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। প্রথম কয়েকদিনে দেশে যোগাযোগে সুযোগ দিলেও পরে যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্ত্রীর নির্যাতন দেখে নাম প্রকাশ না করে এক সৌদি প্রবাসী তার নির্যাতের ছবি ও ভিডিও দেশে পাঠান। একপর্যায়ে ঘটনাটি কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়। দেশে ফেরার পর থেকে তার স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যাপারে আদম ব্যবসায় মোস্তফা কামাল সহযোগিতা করছেন।

শ্রীমঙ্গলের মুক্তি মেডিকেয়ারের প্রধান সেবিকা দিপ্তী দত্ত জানান, নির্যাতনে ওই গৃহবধূর গোপনাঙ্গের নিচসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ও রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ কারণে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হতে তার বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।

মুক্তি মেডিকেয়ারের পরিচালক ডা. সাধন চন্দ্র ঘোষ জানান, ওই গৃহবধূর ওপর অত্যাধিক নির্যাতনের ফলে মানসিকভাবে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য একজন মনোবিজ্ঞানীর স্মরণাপন্ন হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আদম ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল বলেন, ঢাকায় সৌদিয়া রিক্রুটিয় এজেন্সির মাধ্যমে গৃহকর্মী হিসেবে তিনি ওই গৃহবধূকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। এভাবে আরও মেয়েরা সৌদি আরব গেছে। ওই ‍গৃহবধূকে যৌন হয়রানীসহ শারীরিক নির্যাতনের খবর পেয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন। আর এখন চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি আর্থিক সহায়তা করে যাচ্ছেন। এমনকি ওই গৃহবধূর জীবন বিমার টাকা পেতেও তিনি এজেন্সির মাধ্যমে চেষ্টা করছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, নির্যাতিত গৃহবধূকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও সমাজ সেবা অফিসের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। তা ছাড়া বিষয়টি তদন্তক্রমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন