সুনামগঞ্জে অবারো বন্যার পূর্বাভাস

  


পিএনএস ডেস্ক: সুনামগঞ্জে দুই দফা বন্যার চরম দুর্ভোগ থাকার পরও তৃতীয় দফা বন্যার পূর্বাভাস জানিয়েছে জেলা পানিউন্নয়ন বোর্ড। এ কারণে জেলা হাওর পাড়ের বিছিন্ন গ্রামের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কয়েকদিন যাবৎ বৃষ্টি না হওয়ায় জেলা শহরের আশপাশে বাসা বাড়ি থেকে পানি নামতে শুরু করলেও হাওর এলাকায় বন্যার পানি রয়েছে স্থিতিশীল।

মঙ্গলবার বিকাল থেকে হালকা বৃষ্টি ও রোদের আলোয় আকাশ উজ্বল হয়ে উঠায় বানভাসীর মনে কিছুটা আশা সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু এতো আশার মধ্যেও পাউবোর তৃতীয় দফা বন্যার পূর্বাভাসে হাওরবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দক্ষিণা বাতাসে হাওরের ‘জল-তরঙ্গের’ উত্তাল ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়ায় দুশ্চিন্তায় হাওরবাসী। উত্তাল ঢেউ থেকে বাঁচতে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় পরিবেশবাদী সংস্থা সিএনআরএস- কেয়ার বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে ফেনারবাঁক, রাজাপুর, উদয়পুর, হঠামারা, নাজিমনগর, মাতারগাও-খুাঁজার গাও বাজর সহ ৮-৭টি গ্রামে বন্যা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করায় ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দারা হাওরের ঢেউ থেকে রক্ষা পায়। ওই সব পাশ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দারা ঢেউ থেকে তাদের বসতভিটা বাঁচাতে বন্যা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণে সরকারের কাছে ও বিভিন্ন সংস্থার কাছে জোর দাবি জানান।

সুনামগঞ্জ পাউবো অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০-২১ জুলাই হতে পুনরায় জেলার প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। পানি বৃদ্ধির প্রবণতা নির্ভর করবে বৃষ্টিপাতের উপর। আর এটি স্থায়ী থাকতে পারে আরো ৪-৫ দিন। ওই সময়ে জেলার সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, পিয়াইন, কালনী, রক্তি নদীর পানি কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে আবারো বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং কোথাও কোথাও নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

ভারতের মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল ও সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সুনামগঞ্জে দ্বিতীয়বারের মতো বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর কারণে জেলায় তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দোয়ারা বাজার, জগন্নাথপুরসহ ১১টি উপজেলায় জেলা শহরসহ নিম্নাঞ্চলের সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। হাট বাজার, অভ্যন্তরীণ সড়ক পানিতে প্লাবিত হওয়ায় জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ চরম দূর্ভোগে রয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, হাওরের পানি বৃদ্ধি আর ঢেউয়ের কারণে হাওর পাড়ের হাজরো ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছে। বসতঘরে পানিতে ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশু আর গোখাদ্য (খড়) নিয়েও বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক পরিবার। দুর্গম গ্রামগুলোতে দূর্গত মানুষেরা ত্রাণের অপেক্ষা করছেন। বন্যার কারণে হাওর এলাকার বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ডুবে যাওয়ার কারণে ঘরবন্ধি নারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। পরিবারের লোকজনের অগোচরে হাওরের পানিতে শিশুদের ডুবে যাওয়ার ভয় তাদের আতঙ্কিত করছে প্রতিনিয়তই।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার জহিারুল আলম জানান, সুনামগঞ্জে বন্যায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭২৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৩৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১৩৩টি পরিবার রয়েছে। এ পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ৮৬৫ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ১ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ২ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ২ লাখ টাকার গোখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সবিবুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় শহরতরীতে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে হাওরের পানি স্থিতিশীলে রয়েছে। রোদের দেখা মিলছে বিধায় পানি কিছুটা কমবে। আগামী ২০-২১ জুলাই থেকে পুনরায় জেলার প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পেতে পারে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, জেলার প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনা খাবার দেয়া হচ্ছে। প্রশাসনের সবাই বানভাসী মানুষের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছেন। জেলা ও প্রতিটি উপজেলায় আমাদের কন্ট্রোল রুমের নাম্বারে কোনো প্রয়োজনে জানালে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। নদীর পানি কমেছে, হাওরে পানি কমতে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকা বিশাল হাওর বেষ্টিত। প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকার গ্রামগুলোতে বানভাসী মানুষের কাছে গিয়ে প্রতিদিনই খোঁজখবর নিচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বন্যা কবলিত মানুষ যাতে কোনো কষ্ট না করে সেদিকে বিশেষ নজর রাখছি। আগামীতে হাওর এলাকায় ‘ভিলেজ প্রটেকশন ওয়াল’ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বন্যায় মারা যাওয়া মানুষকে দাফনের সুব্যবস্থার জন্য হাওর এলাকার কবরস্থান ও শ্মশানগুলো উঁচু করে নির্মাণ করা হবে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন