যেখানে দাঁড়ালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়

  

পিএনএস ডেস্ক:
১৭৯১ সালে মুক্তিযুদ্ধো করে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। আমরা পাই একটি লাল সবুজ পতাকা। বাংলাদেশর স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বে দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুবিজনগর সরকার। সেই সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। মেহেরপুরের মুজিবনগর দেশের প্রথম ও অস্থায়ী রাজধানীর স্বীকৃতি পায়।

দেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে প্রথম রাজধানী খ্যাত মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর অন্যতম। মুজিবনগর আম্রকাননেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়। এরপর ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় গিয়ে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কেন্দ্রের কাজ শুরু করে। মুজিবনগর আম্রকাননকে ঘিরে গড়ে ওঠে মুজিবনগর স্মৃতি সৌধ, স্মৃতি কমপ্লেক্স, প্রশাসনিক ভবন, অডিটোরিয়াম ও প্লাজা, ছয় স্তরবিশিষ্ট গোলাপ বাগান, পর্যটন মোটেল, শিশু পরিবার, মসজিদ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি ভাস্কর্য। এর আগেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রথম মুজিবনগরকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ স্তম্ববিশিষ্ট স্মৃতি সৌধ গড়ে তোলেন। এছাড়াও বিশাল মানচিত্র করে ভাস্কর্যের মাধ্যমে ১১ সেক্টর ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

কি আছে ঐতিহাসিক মুজিবনগরে

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসংখ্য ভাস্কর্য্যে মূর্তমান হয়ে সেজেছে মুজিবনগর। এখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি মানচিত্র ও জাদুঘর তৈরী করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেখানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের চিত্র। নির্মিত মানচিত্রের চর্তুদিক ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা ও ধ্বংসলীলার বিভিন্ন চিত্র মূরাল ভাস্করে সচিত্র করে তুরে ধরা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ দর্শনাথীদের দেখার জন্য আজও তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়নি। ফলে অযত্নে অবহেলায় পড়ে থেকে নস্ট হতে বসেছে এই ঐতিহাসিক নির্মাণশৈলী। তবে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্মৃতিকে এখানে তুলে ধরা হলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজাকারদের কি ভূমিকা ছিল সেই চিত্র কোথাও ফুটিয়ে তোলা হয়নি।

এতদিন মুজিবনগরে বিশাল একটি আমবাগান ছাড়া দেখার তেমন কিছুই ছিল না। এখন মুজিবনগর সেজেছে দেশের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় মূর্তমান প্রতীক হয়ে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে নানা অবকাঠামো উন্নয়নসহ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতি মানচিত্র ও জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে কিছু বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ১১ বছর আগে। যেমন, পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পর্যটন মটেল ও শপিং মল, সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে শিশু পল্লী, ধর্ম মন্ত্রাণালয়ের অর্থায়নে মসজিদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পোস্ট অফিস ও টেলিফোন অফিস, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে আভ্যন্তরীণ রাস্তা ও হেলিপ্যাড, এবং বনও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ৬ দফা ভিত্তিক গোলাপ বাগান নির্মাণ করা হয়েছে। টেলিফোন একচেঞ্চ ও শিশুপল্লী ছাড়া এর কোনটিই আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু না হওয়ায় অব্যবহৃত অবস্থায় অযত্নে পড়ে আছে সবকিছু। সে কারণে ইতিমধ্যে মটেলের আসবাবপত্র, জানালা দরজা নস্ট হয়ে যাচ্ছে। একেবারেই মরে শুকিয়ে গেছে কোটি টাকা ব্যায়ে ৬ দফা ভিত্তিক মনোরম গোলাপ বাগান। তবে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে এবার আবার ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মুজিবনগরে নির্মিত সবুজ বুকের উপর উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলাদেশের স্মৃতি মানচিত্র। মানচিত্রের বুকে মুক্তিযুদ্ধের ১১ টি সেক্টরকে দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের বেনাপোল, বনগাঁও, বিরল, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে শরনার্থী গমন, হার্ডিঞ্জ ব্রীজ ধ্বংস, আসম আব্দুর রবের পতাকা উত্তোলন, শাহজাহান সিরাজের ইশতেহার পাঠ, শালদাহ নদীতে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মুখ যুদ্ধ, কাদেরীয়া বাহিনীর জাহাজ দখল ও যুদ্ধ, পাক বাহিনীর সাথে কামালপুর, কুষ্টিয়া ও মীরপুরের সন্মুখ যুদ্ধ, শুভপুর ব্রীজের দুপাড়ের মুখোমুখি যুদ্ধ, চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস, পাহাড়তলী ও রাজশাহীতে পাক বাহিনীর হত্যাযঞ্জ, জাতীয় শহীদ মিনার ধ্বংস, জাতীয় প্রেস ক্লাবে হামলা, সচিবালয়ে আক্রমণ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও জগন্নাথ হলের ধ্বংসযজ্ঞ, তৎকালীন ইপিআর পিলখানায় আক্রমণ, রায়ের বাজার বধ্যভূমি, বুদ্ধিজীবি হত্যা।

মানচিত্রের চর্তুদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাক্তিদের সাহসী নেতৃত্বে এবং ভূমিকার ছবিসহ ৪০ টি ভাস্কর্য্য শিল্প কর্ম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মধ্যে তৎকালীন সেনাপ্রধান, উপপ্রধান, বীর উত্তমদের, জাতীয় চার নেতার, তারামন বিবি, সেতারা বেগমের মূর্তমান ছবিসহ ব্রঞ্চের তৈরী ২৯ টি অবক্ষ ভাস্কর, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ৩০ নেতার তৈলচিত্র রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পরে জিয়ার ভাস্কর্য্যটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তাহলে কি স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়ার কোন অবদান নেই। কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হওয়ায় নির্মাণের ৬ বছর পরও এই ঐতিহাসিক মূহুর্তগুলির মূর্তমান নিদর্শনগুলি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়নি।

মানচিত্রের বাইরে বড় ম্যুরালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের কালো রাত্রির হত্যাযজ্ঞ, পাক বাহিনীর হাতে নারী নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানী, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ৭১ এর ১৭ এপ্রিল এই মুজিব নগরে দেশের প্রথম সরকারের শপথ ও সালাম গ্রহণ, মেহেরপুরের স্থানীয় ১২ আনসার সদস্য কর্তৃক প্রথম সরকার প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ সরকার প্রধানদের গার্ড অব অনার প্রদান, সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় ১১ জন সেক্টর কমান্ডারদের গোপন বৈঠক, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের সেক্টর বন্টন সভা ছাড়াও অরোরা নিয়াজী ও একে খন্দকারের উপস্থিতিতে পাক বাহিনীর আত্বসর্মপনের চিত্র নির্মিত ভাস্কর্য্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভাস্কর্য্যগুলি (লাইফ সাইজের) মানুষ সমান আকৃতির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরহাদ হোসেন বলেন ৯৮ সালে এই প্রকল্পের নকশা তৈরী ও অনুমোদন হয়। অথচ জোট সরকার সেই নকসা কাঁটছাঁট করে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস বাদ দিয়েছে। সে কারণে এখানে অনেক কিছুই করা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার ৯৮-এর অনুমোদিত নক্সা ও প্রকল্প অনুযায়ী মুজিবনগরকে সাজাতে চাই। তাই এর কাজ আরও বাড়ানো হয়েছে।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech