বারোমাসি দেশজ কাঠাল-রপ্তানীতে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা -সৌখিন রসনা বিলাসীদের জন্য গরম খবর

  20-12-2014 06:09PM

পিএনএস(কামাল পাশা দোজা) : কাঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আক্ষরিত অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়, কাঠাল মহান আল্লাহ্ তায়ালার এক বিশাল নেয়ামত। আদম সন্তানের জন্য আল্লাহর নেয়ামতের ভান্ডার অপরিসীম। যে ভান্ডারের বিবরণ মানুষের পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব পর নয়। বক্ষমান নিবন্ধে বারোমাসি দেশজ কাঠালকে নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই কমবেশী কাঠাল পাওয়া যায়। কাঠাল একটি অতি পরিচিত দেশীয় ফল। জৈষ্ঠ মাসকে মধু মাস বলা হয়। আর তা বলা হয় আম-কাঠালের জন্যই। যখনই মধু মাসের প্রসঙ্গ আসে তখনই উচ্চারিত হয় আম কাঠালের কথা। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম বললে ভুল হবে প্রতিটি বাড়িতেই কমবেশী ২/৪ টি কাঠালের গাছ অবশ্যই পাওয়া যাবে।

বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় আম বাগানের পাশাপাশি কাঠাল বাগানও দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া তথা গোটা উত্তরাঞ্চলেই প্রচুর পরিমানে কাঠাল উৎপাদিত হয়। তবে দেশের সবচেয়ে বেশী কাঠাল উৎপাদনকারী অঞ্চল হচ্ছে গাজীপুর এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের জেলাগুলি। গাজীপুরের শ্রীপুর, কাপাসিয়া, মাওনার কাঠালের জুড়ি নেই। কাঠাল মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাক ভর্তি কাঠাল যায় গাজীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে।

কাঠালের খাদ্যমান এবং পুষ্টিগুনও অনেক। কাঠাল এক ব্যতিক্রমধর্মী ফল। যার কোন অংশই ফেলনা নয়। গাছে কাঠালের আগমনী বার্তা শুরু হয় মুচি (কঁচি) কাঠাল এর মাধ্যমে মুচি বা শুরুর কাঠাল একটু বড় হলে তা কাঁচা তরকারি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কাঁচা কাঠাল এর তরকারি যে কি সুস্বাদু তা না খেলে বোঝানো যাবে না। কাঁচা কাঠাল চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করলে রসনা আর ভোজন বিলাসীদের জিভে রীতিমতো পানি এসে যায়। কচি কাঠাল ভাজি করেও খাওয়া যায়। তারপর পাকা কাঠালের কথা আর কি বলা যাবে -কাঠাল একটি সুস্বাদু পুষ্টিকর ফল। পাকা কাঠালের হলুদ রং এবং সুগন্ধ মন মাতিয়ে তোলে। গ্রাম বাংলায় কাঠাল খাওয়ার প্রচলিত নিযম হচ্ছে যে, পান্তা-ভাত কাঠাল, দুধ-ভাত কাঠাল। এখন খাদ্যাভাস পরিবর্তন হয়েছে। মুড়ি কাঠাল, চিড়া-দই-কাঠালও বেশ জনপ্রিয়। শহরে আজকাল কাঠালের বীচি আলাদা করে ব্যালেন্ডারে লিকুইড করা হয় কাঠালের কোষ গুলি।



তারপর বিভিন্ন উপাদেয় খাবার কেক, পেষ্টি দুধ ইত্যাদির সাথে লিকুইড কাঠাল কোষ পরিবেশন করা হয়। মজার ব্যাপর হচ্ছে কাঠালের কোন কিছুই ফেলনা নয় তা আগেই বলেছি-কাঠালের বীচি তরকারি হিসাবে বেশী সুস্বাদু ও উপাদেয়।কাঠালের বীচি গরম কড়াইয়ে ভেজে তা ভর্তা করলে বেশ স্বাদ লাগে। তা ছাড়া গ্রামের মানুষ কাঠালের বীচি ভেজে খাদ্যের বিকল্প হিসাবে তা খেয়ে থাকে।

অনেকে কাঠালের বীচি সিদ্ধ করে তা ভাতের বিকল্প হিসাবেও খেয়ে থাকেন। কাঠালের কোষের মতো বীচিও সমান জনপ্রিয়। কাঠাল কাঁচা-পাকা উভয় অবস্থাতেই খাওয়া যায় বিধায় এর কদর বিস্তর। তারপর কাঠালের বজ্য ভিতরের কেউতা, ভোঁতা-গো খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

মোট কথা বাঙ্গলীর ইতিহাস-ঐতিহ্য আর খাদ্যাভাসের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কাঠাল। যা আমদের জাতীয় ফল।
এতোক্ষন কাঠালকে নিয়ে একাডেমিক আলোচনা করছিলাম। এবার এর বাণিজ্যিক দিক নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা দরকার। মৌসুমের সময় আমাদের দেশে যে পরিমান কাঠাল উৎপাদিত হয় তা যদি সংরক্ষন করা যেত- তা হলে গোটা বছরের খাদ্যাভাবও দুর হতো, পাশাপাশি রপ্তানী করে প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। দেশে কাঠাল প্রক্রিয়া করণ প্ল্যান্ট এবং জ্যাম, জেলী, জুস তৈরীর প্ল্যান্ট মেশিনারীজ বসালে জাতীয় ফল কাঠাল সত্যিকার অর্থেই জাতির জন্যে সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করতে পারবে।



মৌসুমী কাঠালের লাখো সম্ভাবনার পর এবার বারোমাসি কাঠাল জাতির সামনে সম্ভাবনার আর এক নয়া দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। এক সময়ে প্রবাদ গল্প শুনতাম ফাঁসির আসামীর শেষ ইচ্ছা পুরনের জন্য নাকি যে কোন ফল বছরের যে কোন সময়ে কোন না কোন দেশে পাওয়া যেত। অর্থাৎ প্রতিটি প্রচলিত ফলই গোটা বছর পৃথিবীর কোন না কোন দেশে পাওয়া যেত।

গত কয়েক দিন থেকে বায়তুল মোকাররম এলাকায় ঘুরে দেখা পেলাম জাতীয় ফল কাঠালের। প্রথম প্রথম দোকানী আমাকে বোকা ভেবে বলত এগুলি থাই কাঠাল। কাঠালের রং একটু মলিন বিধায় আমওি তা মেনে নিতাম। কিন্তু তখনও আমার জনা ছিলনা যে আমাদের দেশেই বারোমাসি কাঠাল পাওয়া যাচ্ছে। এবং তা বিপুল পরিমানে।

দিন কয়েক আগে বায়তুল মোকাররমের উল্টো দিকে ফলের দোকান গুলিতে অনেকগুলো তাজা কাঠাল দেখে মকে দাঁড়ালাম। কাঠাল থেকে সাদা আঠা ঝরছে, তারপর পাতা এতই সবুজ এবং তরতাজা যে মাত্র কয়েক মিনিটি আগে তা গাছ থেকে কাটা হয়েছে বা সংগ্রহ করা হয়েছে। এবার আগ্রহ নিয়ে ফল দোকনীকে জিজ্ঞাসা করতেই কাংখিত জবাব পেলাম। এবার আর ধোকায় পড়তে হলোনা। কাঠালগুলি আমদের দেশীয়। এবং তা কিছুক্ষণ আগেই গাজীপুরের কাঠাল বাগান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।



বারোমাসি কাঠাল দেখে অন্তরাত্মা যে কি পুলকে নেচে উঠল তা ভাষায় বর্ণনা করতে পারবো না। ভাবলাম আসময়ের কাঠাল দেশের মানুষের রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি রপ্তানী করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। সাথে সাথে পিএনএস’র ফটো সাংবাদিক আব্দুল হালিমকে ডেকে নিয়ে বেশ কয়েকটি ফটোগ্রাফ নিলাম। আসলে আমাদের দেশের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্পদের খোঁজ আমরা কমই রাখছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের কাজ হবে বারোমাসি এই কাঠালের সংরক্ষন এবং বিপনন-সেই সাথে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। আর তা হলেই কেবল দেশ এগিয়ে যাবে কাংখিত অগ্রগতির পথে।

লেখক-সাংবাদিক, কলামিষ্ট-প্রধান বার্তা সম্পাদক, পিএনএস
e-mail : [email protected]

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন