ভয়ঙ্কর চক্র : দক্ষিণ আফ্রিকায় অপহরণ, বাংলাদেশে মুক্তিপণ

  

পিএনএস ডেস্ক : ‘ভাইয়ের চিৎকার কি কোনো ভাই সহ্য করতে পারে?’ বলেই একটু দম নিলেন মাহাবুবুল হক। তাঁর ভাই দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী রবিউল হক গত ২৯ জানুয়ারি দেশটির রাজধানী শহর জোহানেসবার্গ থেকে অপহৃত হয়েছিলেন। পরে দেশে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে ভাইকে বিদেশি অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত করেন মাহাবুব।

অপহৃত রবিউলের ভাই মাহাবুবুল আজ বৃহস্পতিবার এসেছিলেন মালিবাগে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে। তাঁর কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, দেশের মানুষই যুক্ত ছিল বিদেশের মাটিতে ঘটা ওই অপহরণকাণ্ডে। মাহাবুব বললেন, অপহরণের পর রবিউলকে প্রচণ্ড মারধর করা হতো। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য দেশে তাঁকে ফোন করে রবিউলের কান্না ও যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শোনানো হতো। এসব শুনিয়ে একজন ব্যক্তি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় দ্রুত ৬০ লাখ টাকা পাঠাতে বলতেন। তা না হলে রবিউলকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো। সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকা পরিশোধের পর মুক্তি পান রবিউল।

মাহাবুবুল আরও জানান, অপহরণের সময়ই তাঁর ভাই রবিউলের কাছে থাকা ২ লাখ ২০ হাজার র‌্যান্ড (১৬ লাখ টাকা) নিয়ে নিয়েছিল অপহরণকারীরা। নির্যাতন ও অনাহারে এখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। জোহানেসবার্গে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

রবিউল অপহরণের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে সম্প্রতি সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট দেশ থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাংলাদেশ পুলিশের অনুরোধে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ গত ১৮ এপ্রিল এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে আরও দুজন বাংলাদেশি, তিনজন পাকিস্তানি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার চার নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গ্রেপ্তার দুই বাংলাদেশি হলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের তাহের ও কক্সবাজারের মহসিন। এই মহসিনই বিভিন্ন সময় মাহাবুবুলকে ফোন করে রবিউলের চিৎকার শোনাতেন এবং মুক্তিপণ দাবি করতেন। বাংলাদেশ থেকে গ্রেপ্তার তিনজন হলেন মো. বাশার, কাউসার ও মোহাম্মদ ফাহাদ।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ফাহাদ হলেন চক্রটির নেতা এবং দক্ষিণ আফ্রিকাপ্রবাসী। গত ডিসেম্বরে তিনি দেশে আসেন এবং অপহরণের পুরো চক্রটি চালাতেন। ১২ জুন তাঁকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দুই সহযোগী কাউসার ও বাশারকে গ্রেপ্তারের পর দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ফাহাদ। চলতি বছরেই তাঁর বিরুদ্ধে রবিউলসহ তিন প্রবাসীকে অপহরণের পরে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সব কটি ঘটনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, নির্যাতনে রবিউল এখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। জোহানেসবার্গে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

যেভাবে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়
রবিউলের ভাই মাহাবুবুল বলেন, তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। গত ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে ১৭ লাখ টাকা খরচ করে দুই ভাই রবিউল ও জসীমউদ্দীনকে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠায় পরিবার। রবিউল ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। তাঁর একটি মেয়ে আছে। আর জসীম ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দুই ভাই প্রথমে দোকানে কাজ করতেন।

এক বছর পরে তাঁদের নিজেদের জমানো টাকা আর বাংলাদেশ থেকে পরিবারের পাঠানো ১৩ লাখ টাকা নিয়ে নিজেরাই একটি দোকান শুরু করেন। জোহানেসবার্গের শহরতলি বয়জান এলাকার সেই দোকান ভালোই চলছিল। গত ১৯ জানুয়ারি রবিউল দোকানের মাল কিনতে জোহানেসবার্গ যান। সেখান থেকেই তাঁকে অপহরণ করা হয়।

নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে মাহাবুবুল বলেন, তাঁর ভাইকে গাড়িতে তুলেই চোখ বেঁধে ফেলে অপহরণকারীরা। এরপর তাঁকে একটি কক্ষে নিয়ে হাতে-পায়ে হাতকড়া পরিয়ে ফেলে রাখা হয়। প্রায়ই কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। প্রচণ্ড মারধরও করা হতো। আর রবিউল চিৎকার করে কান্না শুরু করলে মহসিন বাংলাদেশে মাহাবুবুলের কাছে ফোন করে সেই চিৎকার শোনাতেন এবং তাড়াতাড়ি ৬০ লাখ টাকা পাঠাতে বলতেন। রবিউলের কাছে থাকা ২ লাখ ২০ হাজার র‌্যান্ড (১৬ লাখ টাকা) অপহরণকারীরা আগেই ছিনিয়ে নেয়। পরে আরও ৬০ লাখ টাকা পাঠাতে চাপ দিতে থাকে অপহরণকারীরা।

মাহাবুবুল বলেন, ‘ভাই, বিশ্বাস করেন, ১৭টি দিন আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। এত নিষ্ঠুরভাবে মানুষ মানুষকে অত্যাচার করতে পারে আপনি ভাবতেও পারবেন না। পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাইয়ের দোকান বিক্রি করে টাকা দিলে ভাইটা ছাড়া পায়। এরপর আমরা পুলিশের কাছে যাই।’

সিআইডি জানায়, অপহরণকারীরা রবিউলের দোকান বিক্রি করে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে চাপ দেয়। দোকানের ক্রেতাও অপহরণকারীরা নির্ধারণ করে দেয়। টাকা দেওয়ার জন্য তারা বাংলাদেশের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরও দেয়।

দোকান বিক্রির পর রবিউলের ভাই মাহবুবুল হক গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেনীর দাগনভূঞায় অহনা ইলেকট্রনিকসের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের শাখা কার্যালয়ে থাকা একটি অ্যাকাউন্টে নয় লাখ টাকা দেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ইউসিবিএলের একটি অ্যাকাউন্টে ১১ লাখ টাকা দেন মাহাবুবুল। টাকা পেয়ে অপহরণকারীরা গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রবিউলকে ছেড়ে দেয়।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, রবিউল ছাড়া পাওয়ার পর মাহাবুবুল মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তে নেমে সিআইডি ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ধরে অনুসন্ধান শুরু করে। জানা গেছে, বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক হোসেন পারভেজ ওই টাকা একটি সিগারেটের চালানের মূল্য পরিশোধের নামে মোহাম্মদ ফাহাদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন।

হোসেন পারভেজ এখনো গ্রেপ্তার হননি। অন্যদিকে অহনা ইলেকট্রনিকসের মালিক কাউসার ওই টাকা বাশারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। গত ২৮ মে কাউসার ও বাশারকে ফেনী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে জানা যায়, অপহরণকারী চক্রটির প্রধান ফাহাদ দেশেই রয়েছেন। গত ১২ জুন গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।

এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech