খাদ্যগুদামেও সেই ‘কালো বিড়াল’

  

পিএনএস ডেস্ক : তেজগাঁও কেন্দ্রীয় সরকারি খাদ্যগুদামকে (সিএসডি) ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির জাল পেতে বসে আছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমের জন্য রাখা চাল-আটা বাইরে পাচার করে দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিএসডি থেকে চাল-গম আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত আটজনের তথ্য পায় র‌্যাব। তাদের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে র‌্যাবের আইন কর্মকর্তা লিখিত চিঠি

দেন দুদকসহ সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরে। কিন্তু গত এক বছরেও এতে কোনো ফল আসেনি; বরং খাদ্যগুদাম ঘিরে তৎপর ছিল পুরনো 'কালো বিড়াল'রা।

সর্বশেষ গত শনি ও রোববার অভিযান চালিয়ে কালোবাজারে পাচার করা ওএমএসের ২১৫ টন চাল-আটা জব্দ করে র‌্যাব। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিএসডির ম্যানেজার হুমায়ুন কবীর, প্রধান নিরাপত্তারক্ষী মো. হারেজ, গেট শাখাপ্রধান ইউনুছ আলী মণ্ডলসহ একটি চক্র এই জালিয়াতিতে জড়িত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক বছর আগে র‌্যাবের দেওয়া সিএসডির দুর্নীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনেও এদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়েও তারা কী করে বহাল তবিয়তে সেখানে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এদিকে, সিএসডির পণ্য জালিয়াতিতে জড়িত থাকার ঘটনায় চালের ১২ পাইকারি আড়তদার, ঠিকাদারসহ ২৩ জনের নামসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে মঙ্গলবার মধ্যরাতে মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, সিএসডির ঘটনায় মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি করেছে। দুদকে মামলা হচ্ছে। এরই মধ্যে ম্যানেজার হুমায়ুন কবীরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একজন সৎ কর্মকর্তাকে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সম্ভবত আগের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার পর ম্যানেজার হুমায়ুন সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

র‌্যাবের আইন কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বলেন, ২০১৭ সালে সিএসডি ঘিরে একটি অপরাধ চক্র শনাক্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি চালাচালিও হয়। এক বছর পর চলতি সপ্তাহে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আবারও সিএসডি ঘিরে জালিয়াত চক্রের সক্রিয় থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে আগে যাদের নাম এসেছিল, তাদের অনেকেও আছে। অন্যদের ব্যাপারে তদন্ত করতে দুদককে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে র‌্যাব তেজগাঁও সিএসডির খাদ্যগুদামের সামনে থেকে চালবোঝাই দুটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ব-ন-৯৩৫৬ ও ঢাকা মেট্রো-ট-১৪-৯১২০) জব্দ করে। পরে নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু হোসেন বাবলার আধা-সরকারি পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার দুস্থ পরিবারের মধ্যে বিতরণের জন্য ৩০ টন জিআর চাল বরাদ্দ করা হয়েছিল। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, ১৩ নম্বর গুদাম থেকে ৫০০টি ও ৩ নম্বর গুদাম থেকে ৫০২টি চালের বস্তা দুটি ট্রাকে তুলে সাংসদের প্রতিনিধি হায়দার আলীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবেই এমপির প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, প্রতিটি বস্তায় চাল কম দেওয়া হয়েছে। সিএসডির কর্মকর্তারা তখন অ্যানালগ ওজন সেতুতে জালিয়াতি করে হায়দার আলীকে নিশ্চিত করেন, সেখানে ৩০ টন চালই আছে।

কিন্তু একই রাতে সিএসডির ডিজিটাল ওজন সেতুতে পরিমাপ করে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রো-ট-১৪-৯১২০ নম্বর ট্রাকে চার হাজার ৭০৫ কেজি ও ঢাকা মেট্রো-ন-৯৩৫৬ নম্বর ট্রাকে চার হাজার ৭৯০ কেজি চাল কম রয়েছে। জালিয়াতি করে দুটি ট্রাকে মোট নয় হাজার ৪৯৫ কেজি চাল কম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত ডিও রেজিস্টার ও বোঝাই এবং খালাসের নথি পর্যালোচনায় উঠে আসে, জেলা আনসার-ভিডিপিকে ৩, ৩৪ ও ৩৯ নম্বর গুদাম থেকে ২৫৮ টন চাল সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু আনসার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নিশ্চিত করেন, ৭৫ টন চাল পাওয়া গেছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, বাকি ১৮৩ টন চাল কোথায় গেছে। কারণ, প্রধান ফটকে রক্ষিত রেজিস্টারে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২৫৮ টন চালই সিএসডি থেকে বের করা হয়েছে।

এ ঘটনার অনুসন্ধানে সিএসডির ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবীর, প্রধান নিরাপত্তারক্ষী মো. হারেজ, গেট শাখার ইনচার্জ ইউনুছ আলী মণ্ডল, ওজন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত পাপিয়া সুলতানা, ৩ নম্বর গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নান্নু, ১৩ নম্বর গুদামের মামুন এবং ৪ ও ৩৪ নম্বর গুদামের ইনচার্জ আবু সাঈদের দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে। র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, হারেজ কালোবাজারিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জালিয়াতি করে আসছেন। বিভিন্ন অভিযোগে তাকে বদলি করা হলেও তিনি সিএসডিতে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ইউনুছ আলী কাগজপত্রের তারিখ পরিবর্তন করে কালোবাজারিদের সহায়তা করেন। নান্নু ও মামুন তার সহকর্মী পাপিয়ার সহযোগিতায় কম চাল দেন। গুদাম ইনচার্জ আবু সাঈদ ওজনে কম চাল দিয়ে রেখে দেওয়া অতিরিক্ত চাল বাইরে বিক্রি করেন। ১ ও ২ নম্বর গুদাম ইনচার্জ আবদুল কাদের বকসি দীর্ঘদিন ধরে গুদামের দায়িত্বে ছিলেন। কালোবাজারির সঙ্গে যোগসাজশে তিনি বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তিনি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন।

অভিযুক্ত যারা :সর্বশেষ গত শনি ও রোববার অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ওএমএসের ২১৫ টন চাল ও আটা জব্দ করে। ১২ জন আড়তদার সিএসডির অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে স্বল্প আয়ের মানুষের এসব চাল-আটা বেহাত করেন। ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় প্রতিদিন ঢাকার ১৪১টি পৃথক স্পটে স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে ১৪১ টন চাল ও ২৮২ টন আটা বিক্রি করার কথা। তবে সিএসডির একটি অসাধু চক্র প্রতিদিন দুইশ' টনের বেশি চাল-আটাই কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তারা হলেন- মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বন্ধু রাইস এজেন্সির কর্ণধার নজরুল ইসলাম, রাহমানিয়া রাইস এজেন্সির বিল্লাল হোসেন, কর্ণফুলী রাইস এজেন্সির গোলাম কিবরিয়া, জামি রাইস এজেন্সির ইকবাল হোসেন, ছালেক এজেন্সির মো. সালাউদ্দিন, এশিয়ান ট্রেডার্সের মিসকাতুর রহমান, সুগন্ধা ট্রেডিংয়ের গোলাম মোস্তফা, মহানগর এন্টারপ্রাইজের তৈয়বুর রহমান, সুগন্ধার মো. হান্নান, জননী এন্টারপ্রাইজের মো. শাহ আলম, সূর্য্য এন্টারপ্রাইজের কবির হোসেন, তেজগাঁও সিএসডির শ্রমিক উপদেষ্টা আলমগীর সৈকত, শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুদু মিয়া, শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন, শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আলমগীর, সিএসডির স্টক ইনচার্জ সুখরঞ্জন হালদার, গেট ইনচার্জ ইউনুছ আলী মণ্ডল, চেকপোস্ট ইনচার্জ সুমন, ডিও শাখার ইনচার্জ কাজী মাহমুদ, প্রধান নিরাপত্তারক্ষী হারেজ, নিরাপত্তারক্ষী বাবুল, ঠিকাদার ও ডিলার নজরুল ইসলাম ও মো. জাকির হোসেন। প্রতি টন চাল ও গম থেকে এক হাজার টাকা হাতিয়ে নেন সিএসডির ম্যানেজার হুমায়ুন। আর ৫০০ টাকা অন্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। এরই মধ্যে শ্রমিক নেতা আলমগীর সৈকত, দুদু মিয়াসহ অনেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কয়েক বছর আগেও শ্রমিক হিসেবে তারা সিএসডিতে বস্তা টানতেন।

সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সিএসডিতে দুর্নীতিবাজরা এতই বেপরোয়া যে সেখানে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা পোস্টিং পেলেও আতঙ্কে যেতে চান না। আবার অনেকে গেলেও বেশিদিন টিকতে পারেন না।

তবে গেট শাখার ইনচার্জ ইউনুছ আলী মণ্ডল বলেন, অবৈধ আয়ের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। কার মাধ্যমে চাল-আটা পাচার হচ্ছে, তা তার জানা নেই।

এ ব্যাপারে সিএসডির ম্যানেজার (প্রত্যাহারকৃত) হুমায়ুন কবীর শনিবার জানান, কীভাবে সিএসডির চাল-গম বেহাত হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি অবগত নন। ওএমএস কার্যক্রমে বিক্রির জন্য বরাদ্দ চাল-আটাবাহী ট্রাক সিএসডিতে ঢোকার কথা নয়।- সমকাল

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech