ফেনী-১ আসন: জাসদকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আ’লীগ মাঠে নেই বিএনপি

  


পিএনএস ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি থাকলেও বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ফেনী-১ নির্বাচনী এলাকায় মাঠে তৎপর নয় বিএনপি। মাঠে ময়দানে তো দূরের কথা মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীরা ঘরোয়া সমাবেশ এমনকি মসজিদের ভেতরে মিলাদ-মাহফিলেও পুলিশি বাধার অভিযোগ করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে তাকেই ওই আসনে বিজয়ী করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায় বলে বিএনপির নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

অন্য দিকে আসনটি নিজের করে পেতে আওয়ামী লীগ নিয়মিত সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ দখলে রাখলেও জাসদকে নিয়ে তুষের আগুনে পুড়ছে আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনে ওই আসনে জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান এমপি শিরীন আখতারের আবারো মহাজোট থেকে প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জনে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশে জাসদের নেত্রীকে প্রার্থী হিসেবে মেনে না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরে নেতাকর্মীদের সোচ্চার করছেন। দীর্ঘ দিন ধরে আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ থেকে ওই আসনটি দখলে নিতে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে দলটির জনপ্রিয় নেতা ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেলকে দলীয় প্রার্থী করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

বিএনপি : নব্বই দশকে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগ বরাবরই দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। বিপুল ভোটের ব্যবধানে বারবার ওই আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপি-জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ওই আসনে আওয়ামী লীগের টানা দুই মেয়াদের শাসনামলে তিন উপজেলায় শতাধিক মামলায় দেড় হাজারের বেশি আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম থানায় পৃথক তিন মামলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতসহ ২৬০ জনের নামে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলায় আসামিদের মধ্যে পবিত্র হজ করতে সৌদিআরবে অবস্থানরত এক নেতাকেও আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। মামলার আসামি হয়ে কেউ জামিনে, কেউবা পালিয়ে ঘর ছাড়া হয়ে দিন কাটাচ্ছেন বলে বিএনপি নেতৃবৃন্দের অভিযোগ। মামলায় জর্জরিত আর পুলিশি তৎপরতায় দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কার্যত বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারছে না কয়েক বছর ধরে। ঘরোয়া সমাবেশ কিংবা মসজিদে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও নেতাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে মসজিদেও নেতাকর্মীদের একত্র হতে প্রশাসন দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে বিএনপির নেতারা। মাঝে মধ্যে সীমিত পরিসরে কিছু ঘরোয়া কর্মসূচি পালন করলেও রাজপথের কর্মসূচিতে মাঠে নেই বিএনপি। ফেনী-১ আসনে বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও বর্তমানে পুলিশি তৎপরতা এবং কিছু নেতাকর্মীর গা বাঁচিয়ে চলা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার অভিযোগ করা হয়। তবে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দাবি নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দলের নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীকে মুক্ত করে নির্বাচনে ধানের শীর্ষকে বিজয়ী হতে মাঠে থাকবেন। তবে নির্বাচনী মাঠে সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে আবারো বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ওই আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।

আওয়ামী লীগ : আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেলকে নিয়ে নেতাকর্মীরা নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। কোনো প্রকার বাধাহীনভাবে দিন-রাত নৌকার পক্ষে সভা-সমাবেশ করছে। ওই সমাবেশে দলের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দলের প্রতিটি পর্যায় থেকে আসনটি দখলে নিতে সোহেল চৌধুরীর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ। গত আগস্ট থেকে নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্র কমিটি গঠনের মাধ্যমে আগাম নির্বাচনী শোডাউনে আওয়ামী লীগ। আবারো জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান এমপি শিরীন আখতার ওই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হতে পারেন এমন গুঞ্জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় না করার অভিযোগ তুলে বর্তমান এমপিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় শোক দিবসের জনসভায় ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি খায়রুল বাশার তপন বর্তমান এমপি ও তার দলীয় প্রধান হাসানুল হক ইনুকে বঙ্গবন্ধুর খুনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করে বক্তব্য দিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে জাসদের নেতাকর্মীদের বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে বলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ফেনী-১ আসনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা আগের যেকোনো সময় থেকে অনেক মজবুত বলে দাবি করছে।

ফেনী অঞ্চলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম এবং ফেনী-২ আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানা গেছে। তাদের আশীর্বাদ নিয়ে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল নৌকাকে বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি ছাড়াও ওই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল বাশার তপনের নাম শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি সমাবেশে তিনি কিংবা সোহেল চৌধুরী ফেনী-১ আসনে প্রার্থী হবেন বলে নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন। গত নির্বাচনে নিজে মনোনয়ন পেয়ে দলীয় প্রধানের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে জাসদ নেত্রী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোনো মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তার। আগামী নির্বাচনে আর জাসদের প্রার্থীকে মেনে না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

জোটগতভাবে নির্বাচন হলে ওই আসনে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী দেবে না বলে জানা গেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাতীয় পাটি, ইসলামী শাসনতন্ত্র, খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের প্রার্থী দেয়ার কথা শোনা গেলেও মাঠে তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। আবারো মহাজোট থেকে জাসদের বর্তমান এমপি শিরীন আখতার মনোনয়ন পাচ্ছেন এমনটি ধরে নিয়ে জাসদ নেত্রীর নেতৃত্বে ফেনী-১ নির্বাচনী এলাকায় সরকারি বিভিন্ন প্রোগাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তৎপর রয়েছে জাসদ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গনেত্রী মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নৌকাকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মী সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে তুলে ধরে পাড়া-মহল্লায় সাধারণ ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করে নির্বাচনী মাঠে তৎপর রয়েছেন।

ফেনী জেলা জাসদের সভাপতি কাজী আবদুল বারী জানান, মহাজোট থেকে যাকেই প্রার্থী দেয়া হবে তার পক্ষে কাজ করবে জাসদ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পরশুরাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব বর্তমান সরকারের আমলে নেতাকর্মীরা মামলায় জর্জরিত উল্লেখ করে জানান, বিগত ১০ বছরে মানুষ ভোট দিতে পারেনি, নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত হলে আবারো ধানের শীর্ষ বিজয়ী হবে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহম্মদ মজুমদার ঘরে-বাইরে পুলিশের বাধায় দলীয় কার্যক্রম চালাতে না পারার অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আবারো তাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিজয় সুনিশ্চিত।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech