নানা সমস্যায় জর্জরিত নওগাঁর হাঁস প্রজনন খামার

  

পিএনএস, নওগাঁ: নওগাঁর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের মাধ্যমে দেশের প্রায় ১৮টি জেলায় বিভিন্ন প্রজাতির হাঁসের চাহিদা পুরণ করা হলেও নানা সমস্যায় জর্জরিত সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। সরকারির পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই খামারে আরো অনেক কিছু করার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে শুধু হাঁস প্রজননের জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছে এই খামারটি।

নওগাঁর সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় সান্তাহার ঢাকারোড নামক স্থানে অবস্থিত এই আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির হাঁসের বাচ্চার মাধ্যমে আজ অনেকের বেকারত ¡দূর হয়েছে। কেউ কেউ আবার হাঁস পালন করে নিজে স্বালম্বী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরীতে ভ’মিকা রাখছে। হ্যাচারীসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৯ সালে ৭একর জমির উপড় প্রতিষ্ঠিত হয় এই খামার। ওই বছর ডিসেম্বর থেকে খামারে বাচ্চা পালনসহ যাবতীয় কার্যক্রম শুরু হয়।

খামার সূত্রে জানা, বর্তমানে খামার থেকে নওগাঁ, কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই খামারে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগের অধিকাংশ জেলায় নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় ছাড়াও সকল আবাদি জমির অনেকাংশ বছরের কোন না কোন সময় জলমগ্ন বা অনাবাদি থাকে। এ সমস্ত এলাকায় হাঁসের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রাকৃতিক খাবার থাকায় হাঁস পালন অত্যন্ত লাভজনক। তাই এ খামার থেকে প্রতি বছর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রায় ১৫ শত জন হত দরিদ্র মানুষ হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করে তা পালন করে আর্থিক ভাবে উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছেন।

এ খামার থেকে ইন্ডিয়ার রানার, খাকি ক্যাম্পবেল, জেন্ডিং ও বেইজিং জাতের হাঁসের বাচ্চা ফুটানো ও সরবরাহ করা হয়। এ জাতের হাঁস বৎসরে প্রায় ২শত ৮০ থেকে ৩শতটি ডিম দিয়ে থাকে যা আমাদের দেশিও জাতের চেয়ে অনেক বেশি। স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই মুনাফা পাচ্ছে হাঁস পালনকারিরা। ইতিমধ্যে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১হাজার জন খামারীকে ৪দিন মেয়াদী হাঁস পালন ও তুষ পদ্ধতিতে বাচ্চা ফুটানোর উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা আজ হাঁস পালন করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখছে। অনেক শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকাররা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ হাঁস পালন করে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। তাছাড়াও প্রতি বছর ২৫০জন খামারীকে স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

তবে সমস্যাও রয়েছে অনেক। বর্তমানে খামারের ৮টি ব্রিডার সেট ও ২টি ব্রডিং শেডের পানি নিষ্কাশনের জন্য কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পাশের কৃষকের জমিতে শেডের বর্জ পানি যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকরা। কৃষকদের প্রায় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছেন খামারের কর্মচারীরা। খামারের ভিতর সকল রাস্তা অত্যন্ত নিচু ও পাকা না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি জমে এবং প্রচুর আগাছা জন্মায় যা খামারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন খামারের সকল শেডের রান ও দেওয়াল সংস্কার এবং নেটসমূহ রং না করায় তা নষ্টের পথে। খামারের সেটের নেট অনেক স্থানেই চিড়ে গেছে। ছেড়া নেট দিয়ে বেঁচি অথবা শিয়াল ঢুকে বড় ধরনের ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। খামারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য দীর্ঘদিন পূর্বে তৈরি করা ভবনগুলো নতুন করে সংস্কার না করায় সেগুলো আজ প্রায় বসবাসের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে।

নাটোর থেকে আসা হাঁস পালন কারী সিরাজুল হোসেন বলেন, তিনি এ খামার থেকে কম মূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা নিয়ে পালন করে আজ আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বর্তমানে মাসে ডিম বিক্রি করে ১২-১৫ হাজার টাকা লাভ হয়।

একই এলাকার হাঁস ব্যবসায়ী আক্কাজ আলী বলেন, আমি ১দিনের বাঁচ্চা কিনে নিয়ে যেয়ে বড় করে বিক্রি করি। খাঁকি ক্যাম্বেল হাঁসের চাহিদা সব সময় থাকে তাই হাঁস বিক্রি করতে কোন সমস্যা হয় না। মাস শেষে সব খরচ বাদ দিয়ে ৮-১০ হাজার টাকা লাভ থাকে।

খামারের ব্যবস্থাপক আব্দুল হামিদ বলেন, খামারটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জড়িত। খামারে নিয়মিত ১৪জন ও সংযুক্ত ২জন কর্মকর্তা ও কর্মচারি মিলিয়ে ১৬জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ১৩ জন রয়েছে। খামারের সব কিছু নতুন ভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন। সেডের নেট ও রাস্তা সংস্কার করা অতি জরুরী। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি খামারীদের চাহিদা মিটানোর জন্য। বর্তমানে ৪৫০০ হাঁস নিয়মিত পালন করা হচ্ছে। তবে সরকার যদি ডিমের মূল্য কম ধরতো তাহলে খামারে উৎপাদিত ডিমগুলো নষ্ট হতো কম। অনেক ডিম ব্যবসায়ীরা এখান থেকে ডিম সংগ্রহ করতো। এতে করে খামারের ডিম প্রচুর বিক্রয় হতো। গত অর্থ বছরে এই খামার থেকে ১৯ লক্ষ টাকার হাঁসের বাচ্চা ও ডিম বিক্রি করতে পেরেছি। বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধান করে আরও উন্নয়ন করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খামার বড় ভ’মিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ উত্তম কুমার দাস বলেন, হ্যাচারীসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৯ সালে এই খামার প্রতিষ্টি হলেও পরবর্তীতে এই খামারের তেমন উন্নয়ন হয়নি। আমি নওগাঁয় যোগদান করার পর থেকে চেষ্টা করছি খামারের জনবল সংকট সহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের জন্য। ইতিমধ্যে কর্মকর্তাদের বাসস্থানের কিছু মেরামতের কাজ হয়েছে। মন্ত্রাণালয়ে খামারটির উন্নয়নের জন্য প্রকল্প জমা দেওয়া আছে। প্রকল্পটি পাশ হলে অন্যান্য সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি জানান।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech