অর্থ আত্মসাত মামলায় আজিজ কো-অপারেটিভের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম গ্রেপ্তার

  

পিএনএস : প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ১৬ লাখ টাকা অর্থ আত্মসাতের মামলায় আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামকে বংশাল থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

আজ বৃহস্পতিবার সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) শারমিন জাহান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শারমিন জাহান বলেন, ‘আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো যারা আসামি আছেন তাদেরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

তবে এর বাইরে আর কোনো তথ্য দেননি শারমিন জাহান। তিনি বলেন, সিআইডির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আপনাদেরকে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের থানায় দায়ের করা অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় তাজুল ইসলামকে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। সুফিয়া আক্তার নামের এক নারী বাদী হয়ে ওই মামলা করেন।’

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, সুফিয়া আক্তার নামের ভুক্তভোগী ওই নারী মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে বংশাল থানায় অর্থ আত্মসাৎ ও প্রাণনাশের হুমকি প্রদানের কারণ দেখিয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আসামিরা হলেন আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম (৬২), ব্র্যাঞ্চ কন্ট্রোলার ও ব্যবস্থাপক লাকী খাতুন (৩২), শাখা ব্যবস্থাপক মো. দ্বীন মোহাম্মদ (৪২) এবং নবাবপুর শাখা ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন (৩৫) এবং ব্যাংকের উপদেষ্টা মো. নুরুন্নবী (৬৫)।

এজাহার সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর থেকে আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের নবাবপুর শাখা অফিসে বিভিন্ন মেয়াদে সুফিয়া আক্তার মোট ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৫ টাকা জমা রাখেন। বিশেষ প্রয়োজনে সুফিয়া আক্তার গত ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বরসহ বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকে গিয়ে গচ্ছিত টাকা উঠাইতে গেলে নবাবপুর শাখা ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন সুফিয়া আক্তারকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘টাকা নেই, কোথা থেকে দেব?’

এজাহার সূত্রে জানা যায়, এরপর ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম ও ব্র্যাঞ্চ কন্ট্রোলার ও ব্যবস্থাপক লাকী খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওনা টাকা ফেরত চান সুফিয়া আক্তার। তখন তাঁরা দুজনই টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টালবাহানার মাধ্যমে বিভিন্ন সময় ঘোরাতে থাকেন। তখন তাঁরা সুফিয়া আক্তারকে জানান, শাখা ব্যবস্থাপক মো. দ্বীন মোহাম্মদ ও ব্যাংকের উপদেষ্টা মো. নুরুন্নবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এরপর দ্বীন মোহাম্মদ ও মো. নুরুন্নবী সুফিয়া আক্তারকে বারবার সময় দিয়ে ঘোরাতে থাকেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ৬ মার্চ আসামিরা টাকা দেবে না জানিয়ে সুফিয়া আক্তারকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। এরপর প্রথমে সংশ্লিষ্ট রমনা থানায় সুফিয়া আক্তার মামলা করতে যান। পুলিশ মামলা না নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করে। এরপর তিনি বংশাল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

উল্লেখ্য বুধবার পিএনএস নিউজে আজিজ কো-অপারেটিভের বিরুদ্ধে ২৩০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, শাখাগুলোয় তালা! পর্ব-১ শিরোনামে একটি নিউজ করা হয়েছে।

: আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি বর্তমানে ‘হায় হায়’প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। অবৈধ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সারাদেশ থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। মূলত প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ২৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

সাধারণ মানুষের টাকা নিয়ে সোসাইটির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম অন্য একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিজের ব্যক্তি নামে শেয়ার কেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মানুষের টাকা ফেরত না দিয়ে শাখা অফিসগুলোয় তালা দিয়ে আখের গোছাচ্ছে প্রতিষ্ঠাটির কর্ণধার। যে কোনো সময় যুবক, ইউনি পে টু, ডেসটিনির মতো উধাও হয়ে যেতে পারে আজিজ কো-অপারেটিভ।

অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অধিক হারে সুদের প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ২৩০ কোটি টাকা। সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো অনুমোধন ছাড়াই ১৫০টি শাখা খুলে মানুষে কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

এখন মানুষের টাকা ফেরত দিতে গিয়ে নানা অজুহাত দিয়ে দিনের পর দিন ঘুরাচ্ছে কর্মকর্তারা। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আজিজ কো-অপারেটিভের হেড অফিস- ৪৫ বিজয় নগর সায়হাম স্কাইভিউ টাওয়ারের চতুর্থ তলায় শত শত মানুষ এখানে আসছে তাদেরে আমানতের পাওনা টাকা লাভসহ উত্তোলনের জন্য। কিন্তু টাকা না দিয়ে নানা টালবাহানা করে তাদের ঘুরানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক শাখা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রাজধানীর মিরপুরের পলাশনগর শাখার শত শত আমানতকারী তাদের টাকা উত্তোলনের জন্য ভিড় জমাচ্ছেন। মিরপুর পলাশনগর শাখার আব্দুর রহমান নামক এক আমানতকারী বলেন, ‘তিনি প্রায় ছয় মাস যাবত তাদের পিছনে ঘুরছেন; কিন্তু টাকা তুলতে পারছেন না। নানা অজুহাত দেখিয়ে আজ নয়, কাল নয় করে টালবাহানা করছে। পলাশনগর শাখাটি বন্ধ করে তালা দিয়েছে। এখন এত দূর থেকে এখানে এসে হয়রানি শিকার হচ্ছি। অফিসে আসলে তাদের বড় কাউকে পাওয়া যায় না। চেয়ারম্যান এখন এই অফিসে আসেন না, তাকে ফোন দিলেও পাওয়া যায় না।’

মিরপুর পলাশনগর শাখায় মো. নওয়াব নামের এক আমানতকারীর মাধমে ওই শাখায় শত শত মানুষ টাকা রাখেন। এখন তারা কখনো উনার বাসায়, কখনো বিজয়নগর শাখা আসছেন; অথচ টাকা তুলতে পারছেন না।

বিজয়নগর অফিসে গিয়ে দেখা যায় অফিসের বেহাল অবস্থা। যে কোনো সময় এই অফিসেও তালা ঝুলতে পারে। অফিসে কোনো লোকজন নেই। যে দুচারজন আছেন, তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা এই অফিসের কর্মকর্তা নয় বলে এড়িয়ে যান।আসবাবপত্র অল্প অল্প করে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে! অনেক কর্মচারী তাদের বেতনের জন্য হাউমাউ করছেন।

সমবায় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজিজ কো-অপারেটিভটির ব্যবস্থাপনা কমিটির তিন বছর মেয়দ ।নেক আগে উত্তীর্ণ হলেও সময়মতো নির্বাচন দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থপনা কমিটি করে তাদের কাছে তিন দিনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দিলেও তা মানেনি প্রতিষ্ঠানটি। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন, সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক মো. মিজানুর রহমান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন : মোঃ গোলাম কিবরিয়া, মোঃ তাজুল ইসলাম, মোঃ আবদুল্লাহ আল মামুন, মুহাম্মদ আমানুর রহমান। দায়িত্ব হস্তান্তর না করে তারা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করে। হাইকোর্ট এই কমিটিকে তিন মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। ইতিমধ্যে হাইকোর্টের দেওয়া তিন মাস সময় গত ৭ এপ্রিল শেষে হয়ে গেছে । বর্তমানে এই মামলাটি সমবায় অধিদপ্তরের প্যানেল আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিমুল আলমের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি এখন এই মামলাগুলো দেখছেন।

এর আগে রমনা থানায় তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছিল। পরর্বতীতে এই মামলাটি দুদককে হস্তান্তর করা হয়। রমনা থানার মামলা নং ৫২। দুদকে মামলাটি আমলে নিলেও এ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। চাউর আছে, তারা নাকি দুদককে ম্যানেজ করেছে ফেলেছে। সমবায় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টাকা পাচ্ছেন না এরকম শত শত অভিযোগ তাদের কাছে প্রতিদিন আসছে। কিন্তু তাদের কিছুই করার থাকছে না।

বিষয়টি নিয়ে সোসাইটির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে একাধিকবার গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মোবাইল নম্বরে ফোন করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ের প্রিন্সিপাল অফিসার পরিচয় দিয়ে মিজানুর রহমান নামে একজন বলেন, তাদের কিছু টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে তাদের একটি মার্কেট করা হয়েছে। তাই আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ করা যাচ্ছে না।

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech