মাদক, ভারতীয় সিরিয়াল-যোগসূত্রের মনঃস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ...

  


পিএনএস ডেস্ক: মাত্র হাজার পাঁচেক কিলোমিটার সীমান্ত উৎসে মাদকের রোধ নির্মূলে কঠোর অবস্থান ব্যাতিরেকে ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের বিস্তৃত বিশাল শাখা-প্রশাখায় মাদক নির্মূলের নামে নির্বিচার হত্যাকান্ড কতোখানি যৌক্তিক তা নির্ধারণ করতে বোধহয় আরও কিছুটা সময় লাগবে। বিশেষ করে বললে মাদক বলতে বর্তমানে যে ইয়াবার আগ্রাসনকে রোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা সমগ্র বাংলাদেশ থেকে উচ্ছেদ করার চেয়ে বোধহয় বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত মায়ানমানের ৭১৬ কিমি সীমান্তে কড়া নজর রাখা বহুগুনে সহজ। তাছাড়া দেশের অন্তত ১৬ কোটি মানুষ যাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে জানে তাকে অভিযানের বাইরে রেখে চুনোপুঁটিদের দমনের নামে ইতোমধ্যে যে শতাধিক মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে, এ শ্রেণীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের ভোক্তাদের দমন করে দেশ থেকে ইয়াবার ঘাঁটি নির্মূল করা কিছুটা অলীক স্বপ্ন বটে। কেননা মূল যদি থেকে যায় তবে তা সুযোগ মত আবার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করবেই। কাজেই কোন সমস্যার সমাধান যদি করতেই হয় কিংবা সদিচ্ছা থাকে তবে তা সস্যার মূলের বিনাশ করে তবেই সমাধান টানা উচিত। যেহেতু মাদকের সাথে দেশের নিম্নবিত্তের চেয়ে উচ্চবিত্তদের দহরম-মহরম সম্পর্ক কাজেই একাজে রাষ্ট্র কতটুকু সফল হবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ থাকছে ।

মাদকে আচ্ছন্নদের নিয়ে যাতনার গল্প ও ভয়াবহতা ভূক্তভোগী ছাড়া অন্যদের সেভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। নেশার কারনে এ দেশের কতগুলো সম্ভাবনা অকালে নষ্ট হয়েছে, সংসার ভেঙেছে এমনকি অকালে জীবনের ইতি ঘটেছে তার সংখ্যার সারি বিশাল লম্বা। অনেক বড় বড় অপরাধের জন্ম দিয়েছে মাদক। মাদক নির্মূলে সম্প্রতি গৃহীত সরকারের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় কিন্তু যে উপায়ে মাদক নির্মূলের পথে সরকার হাঁটছে তা একই সাথে নিন্দনীয়। কেননা ক্রসফায়ার দিয়ে জঘন্য কোন অপরাধীকে হত্যা করাও মানবতা বিরোধী। বরং দ্রুত ‍বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘ মেয়াদে শাস্তির বিধান করলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ প্রশংসিত ভাবে বন্ধ হত। প্রশ্ন জাগছে, মাদকের সমস্যা দেশের দীর্ঘ বছরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর অন্যতম। সময়ের বিবর্তনে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সীসা এসবের যুগের পরিবর্তন এসেছে মাত্র। হঠাৎ করে মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের যুদ্ধাংদেহী অবস্থানে অবতীর্ন হওয়ার কারন কী? পরিস্থিতি কি তবে একেবারেই নাগালের বাইরে?

কোন গণমাধ্যম কিংবা আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এখন অবধি প্রমান করতে পারেনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ফেনসিডিল, ইয়াবা কিংবা অন্যকোন মাদকের উৎপাদন হচ্ছে। বরং সবাই একমত যে, ফেনসিডিল ভারত থেকে এবং ইয়াবা মায়ানমার থেকে স্থল ও নৌ পথে বন্যার পানির মত বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করছে। এতোদিন ফেনসিডিল কিংবা ইয়াবা শুধু নগরের পরিমন্ডলেই সীমাব্ধ ছিল কিন্তু বর্তমানে এ জাতীয় মাদকের আগ্রাসন গ্রামে-গঞ্জে এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে যাতে গোটা সমাজ ব্যবস্থার শৃঙ্খলা কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার অনুকূলে। কাজেই মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং দরকারীও তবে দাবী থাকবে, কোন অপরাধ নির্মূল করতে যাতে আবার কোন অপরাধের আশ্রয় নেয়া না হয়। আইন ক্রসফায়ারকে বৈধতা দিয়েছে বটে কিন্তু যেহেতু মানুষ ও মানবতার জন্য আইন সেহেতু বিনাবিচারে হত্যাকান্ড কোনভাবেই সমালোচনাহীন বৈধতা দাবী করতে পারে না। এটা মানবিকতার ধর্ম কিংবা দাবীও নয়।

সমগ্র ভারতের যে ফেনসিডিলি নিষিদ্ধ, কাঁশির ওষুধের নামে তা বাংলাদেশে আসছে এবং নেশার উপকরণ হিসেবে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গছে, বাংলাদেশ সীমানার কিছু দূরে ভারতীয় অংশে শ’য়ে শ’য়ে ফেনসিডিল তৈরির কারখানা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিল কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে তারা বাংলাদেশকে সর্বান্তকারণে ভারত মুখাপেক্ষী করে রাখার সমগ্র কৌশল গ্রহন ও বাস্তবায়ণ করেছে। এ নীতি বাস্তবায়নের পথে ভারতে বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তনেও নীতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশকে ভারতমূখী করার চক্রান্ত হিসেবে সীমান্ত পথে প্রথমে এসেছে মাদক। কিন্তু শুধু মাদক দিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-যুব সমাজকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। কেননা বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো-বন্ধন অন্তত মজবুঁত হওয়ায় এখানকার পুরুষরা কোন না কোন ভাবে নারীদের সংস্পর্শে থাকে। হয় মায়ের আঁচলে, নয়তো বোনের স্নেহে কিংবা স্ত্রীর ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে থাকা তরুণ-যুবারা অসৎ সঙ্গ কিংবা ক্ষণিকের ভ্রান্ত মোহে মাদকের পথে বা বাড়ায় বটে কিন্তু পারিবারিক ভালোবাসায় তাদেরকে যে ধ্বংসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। যখন মনে হল শুধু মাদক দিয়ে তরুন-যুবাদের মেরুদন্ডহীন করা যাবে না তখন নারীদের জন্য সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে ধ্বংসশীল মাদকতায়পূর্ণ সিরিয়াল নামক একজাতীয় উদ্ভট নাটকের প্রবেশ করানো হলো। শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস বলে, নাটক-সিনেমার সাথে সমাজের অভিজাতদের কখনোই সুসম্পর্ক ঘটেনি। কিন্তু ভারতীয় সিরিয়ালের প্রকোপ থেকে সমাজের নিম্নস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তরের কেউ রক্ষা পায়নি। পারিবারিক অটুট বন্ধনের ভাঙন প্রথা প্রমান করেছে, মাদক দিয়ে ভারত যা পারেনি সিরিয়াল দিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি পেরেছে। কাজেই সামাজিকভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে যে বন্ধনের গভীরতা ছিল তাতে মাদক এবং সিরিয়ালের প্রভাবে দূরত্ব এসেছে। ভালোবাসার বন্ধনে লেগেছে ভাটির টান । কাজেই পরিবারের কোন পুরুষ মাদকের পথে ঝুঁকলে তাকে ফেরাতে নারীর সংস্পর্শ আর কাজ করছে না কিংবা সংস্পর্শে আর নারীত্বের সে মোহাময়তা অবশিষ্ট নেই। কেননা দু’শ্রেণীই যে মাদকতার দু’মেরুতে অবস্থান করছে। কে কাকে শোধরায়? কাজেই পারিবারিক ছন্দপতনের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়েছে এবং রাষ্ট্রে চরম বিশৃঙ্খলা একীভূত হয়েছে।

নিঃসন্দেহের মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন ছিল। যে বাহিনী দিয়ে মাদক নির্মূলের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে সে বাহিনীর সব সদস্যরা কি মাদকমুক্ত? অতীতের খবর কাগজগুলো ঘাটলে এ বাহিনীর অনেক সদস্য নিয়ে বীভৎস অনেক সংবাদের প্রমান মেলে। কাজেই ভেতর-বাইরের সব আবর্জনা সাফ হলেই তবে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ সফলতা ধরা দেবে। চুনোপুঁটিদের দমনের চেয়ে রাঘব-বোয়ালে দৃষ্টি দিতে হবে। এক হাজার চুনোপুঁটি দমনের চেয়ে মাত্র একটি রাঘব-বোয়াল দমন বেশি ফলপ্রসু হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে সচেতনাতামূলক প্রচারণা বাড়ানোর মাধ্যমেও মাদকের ব্যবহার হৃাস করা সম্ভব । সর্বোপরি উৎসে নজরদারি বৃদ্ধি করার মাধ্যমেই দেশকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্তে টহল জোরদার করতে হবে । সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সাথে দেশের বিভিন্ন শহরের যোগসূত্রে চেকপোষ্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং কঠোরতাও সম্প্রসারিত করতে হবে। শুধু ইয়াবা, রফেনসিডিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মাদক নির্মূল হবে না বরং বিড়ি-সিগারেট থেকে শুরু মদ-হিরোইনের লাঘাম টানতে হবে। রাষ্ট্র যদি এক হাতে মদের বারের লাইসেন্স দেয় এবং অন্য হাতে ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতিতে স্বাক্ষর করে তবে কোনকালেই বাংলাদেশ মাদকমুক্ত হবে না। যা নেশাধরায় তার সবটাকেই মাদক বিবেচনা করে আইনের মাধ্যমে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে। নিকোটিনের ক্ষতি ইয়াবার ক্ষতির চেয়ে খুব বেশি কম নয়। পার্থক্য শুধু, একটিতে সাময়িক ক্ষতি আরেকটি সুদুঢ়প্রসারী।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
raju69alive@gmail.com

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech