‘মূল ধারার’ গণমাধ্যমে কপি-পেস্টের প্রভাব!

  

পিএনএস ডেস্ক : যেদিন থেকে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’, ‘অপসাংবাদিকতা’, ‘অ-সাংবাকিতা’, ‘কু-সাংবাদিকতা’র মতো বিতর্কিত বিশেষণগুলো গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে; সেদিন থেকেই এর বিপরীতে আরেকটি শব্দ শক্তভাবে অবস্থান করে নিয়েছে। তা হচ্ছে- ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’। বিশ্বব্যাপী যখন সাংবাদিকতা বিতর্কের মুখে পড়ে তখনই আমরা আশ্রয় খুঁজি এই ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’ বিশেষণটির মধ্যে। তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের যুগে মুহূর্তে যেমন খবর ছড়ায় তেমনি মুহূর্তেই ছড়ায় যত বিভ্রান্তি। বরং বর্তমানে খবরের চেয়ে অ-খবরই বেশি ছড়ায়-বলা যায়। আর এসব অ-খবরের মধ্যে বা বিভ্রান্তিকর খবরের মধ্য থেকে সঠিক খবর বেছে নেয়ার ক্ষেত্রেও আমরা আশ্রয় খুঁজি ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’ বিশেষণের কাছে।

দেশে গণমাধ্যম অনেক থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র গণমাধ্যমে আমার বিশ্বাস আছে। কোনো খবর ছড়ানোর আগে দেখি মাধ্যমটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচুর খবর ভাসে। কোনো কোনোটি বিশষ আকর্ষিত হলেও তাতে ক্লিক করার আগে সচেতন পাঠক প্রচারমাধ্যমটি আগে দেখে নেন। দেশে বর্তমানে কমপক্ষে পাঁচ হাজার অনলাইন সংবাদমাধ্যম রয়েছে সারাদেশে অনুমোদিত প্রিন্ট পত্রিকা রয়েছে কমপক্ষে তিন হাজার। টেলিভিশন রয়েছে প্রায় ৩০টি। প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ১১টি। এফএম রেডিও-কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন রেডিও-টেলিভিশ তো আছেই। এই বিশাল সংখ্যক নামসর্বস্ব গণমাধ্যম রয়েছে। এর অধিকাংশই স্পষ্ট করে বললে হয়ত ৯৯ শতাংশ গণমাধ্যমই তথ্যবহুল খবরের চেয়ে কপি-পেস্ট খবর প্রচারেই বেশি ব্যস্ত। সাধারণের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। এরমধ্যেও যারা একটু সচেতন তারা ওই ‘মূল ধারার গণমাধ্যম’ ট্যাককৃতদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো খবর কানে ভাসলে আগে দেখে নেয় বিশ্বস্ত ‘মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো’ কী বলে? তাদের কোনো মাধ্যমে খবরগুলো ভাসছে কিনা? বিভ্রান্তের ফাঁদ থেকে বাঁচতে আপাতত এটিই একমাত্র কৌশল বলে বিবেচনা করেন অনেকে। কিন্তু যখন সচেতনতাও বিভ্রান্ত করে তখন আর বিশ্বাসের জায়গা থাকে না।

যারা অগোছালো কথাগুলোয় এরইমধ্যে একটু একটু করে বিরক্ত হতে শুরু করেছেন তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। প্রশ্ন করতেই পারেন- ‘মূল ধারার সাংবাদিকরা’ আবার বিভ্রান্তি ছড়ালো কখন? বা ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’ আবার কপি-পেস্ট করে হয় নাকি? অথবা এতে প্রভাবিত হওয়ারই কী আছে? মূল ধারার সাংবাদিকরা তো আর কপি-পেস্ট করেন না। এমন বিশ্বাস একদিন আমারও ছিল। কিন্তু যখন কতিপয় প্রথম শ্রেণির সংবাদমাধ্যমের খবর পড়তে গিয়ে দেখি অমুক ডটকমকে বলেন রয়ে গেছে খবরের মাঝে তখন বিভ্রান্ত না হয়ে পারি না। যত না বিভ্রান্ত হই তারচেয়ে অবাক হই বেশি। সম্প্রতি একটি খবর আলোচিত হয়েছে। ‘মা ও মেয়ের স্বামী একজনই, এই গোষ্ঠীর এটিই রীতি’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করেছিল শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকার অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সন। মুষ্টিমেয় সচেতনমহলও খবরটিতে বিশ্বাস এনেছিল শুধুই ওই গণমাধ্যমটির নাম দেখে। বিশ্বাস ছিল এমন একটি নামকরা প্রথম শ্রেণির গণমাধ্যম নিশ্চয়ই ভুল তথ্য দিতে পারে না। কিন্তু যখন জানা গেল ওই বিশ্বাস করাটাও ছিল ভুল। মান্দি জাতিকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি নিয়ে এরইমধ্যে কয়েক মান্দি বন্ধু প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিকাটি বয়কট করার। জেনিস আক্তার নামে এক কবি লিখেছেন, ‘ এরকম মিথ্যে ও তথ্য-যুক্তিহীন নিউজ কালা কাওয়াই করতে পারে।

তারা ভুল তথ্য তো দিয়েছেই সেই সাথে ‘মান্দি’ লিখতে পারেনি লিখেছে মান্ডী। ফাউল যত্তসব। এখনই উচিত গারো সমাজ জেগে ওঠার। সংগ্রাম ও প্রতিবাদ তাদের রক্তে। এ নিয়ে এখন কোনো কথা না হলে এরা মাথায় কাঠাল ভেংগে খাবে। কিছুদিন আগেও এমন নিউজ করেছে ফালতু আরো এক পত্রিকা। আমার ধারণা এর সাথে জেরাবের হাত আছে।’ আরো কয়েক বন্ধু কট্টর ভাষায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জানা গেছে নামসর্বস্ব একটি অনলাইন থেকে কপি করেই সংবাদটি প্রকাশ করেছিল নমকরা ওই গণমাধ্যমটি। কয়েকদিন আগে জনপ্রিয় একটি টেলিভিশনও যাচাই-বাছাই না করেই এক তারকার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করে সমালোচিত হয়েছে।

মাঝেমধ্যেই এমন অনেক খবরের প্রতিবাদ বা বিরোধীতা সামনে আসে। অতটা অবাক হই না। কারণ, সে সকল গণমাধ্যমে আমাদের বিশ্বাস কোনোকালেই ছিল না। কিন্তু যখন বিশ্বস্ত গণমাধ্যমটি এরকম ভুল তথ্যের খবর দেন তখন বিশ্বাস করবো কাকে? আমাদের ‘মূল ধারার গণমাধ্যম’ যখন প্রচলিত বিতর্কিত কপি-পেস্টে প্রভাবিত হয় তখন লজ্জা পাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। যে গণমাধ্যমটিকে ‘মূল ধারার গণমাধ্যম’ বলে বিশ্বাসের মণিকোঠায় বসিয়েছে পাঠক তারাও যখন বিভ্রান্ত ছড়ায় বা কপি-পেস্ট নির্ভর হয়ে পড়ে তখন পাঠকের করণীয় কী? আদতে আর কোনো গণমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে কি? নিশ্চয়ই নয়। এভাবেই একদিন সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যম পরিণত হবে হাস্যকর এক মাধ্যমে। অবিশ্বাসের দোলাচলে চলতে থাকে গোটা সাংবাদিক জগৎ। তখনও ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’ ট্যাগে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে ব্যস্ত থাকে কতিপয় সাংবাদিক।

লেখক: রনি রেজা, কবি ও সাংবাদিক।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech