বড় আন্দোলনে যেতে সময় নেবে বিএনপি

  

পিএনএস ডেস্ক: স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না বলেই মনে করছে বিএনপি। দলটির ধারণা, এর পেছনে সরকারের হাত রয়েছে। দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সরকারের এমন আচরণে দলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষুব্ধ। তাঁরা বড় আন্দোলন করতে চান কিন্তু সেটা এখনই নয়, আরও সময় নিতে চান। কারণ, দলের ভেতরে নানা কারণে অস্থিরতা রয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতানুগতিক কর্মসূচি আসছে। কাল রোববার ঢাকাসহ সব জেলা এবং মহানগরে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হবে। এরপর আবার কর্মসূচি দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার গুলশানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও আইনজীবীদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। আজ শনিবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারেন। তবে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিনের কী হয়, তা দেখে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, বড় হোক আর ছোট হোক, কর্মসূচি থাকবে। আরেকটি সূত্রমতে, আপাতত ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান নিয়ে মাঠে থাকতে চায় দলটি।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিনের শুনানি পিছিয়ে যাওয়ার পর হতাশা দেখা দেয় বিএনপিতে। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক খালেদা জিয়ার সর্বশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থার প্রতিবেদন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ গঠিত মেডিকেল বোর্ড জমা না দেওয়ায় শুনানি হয়নি। ১২ ডিসেম্বর শুনানির দিন ধার্য রেখেছেন আদালত।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে মেডিকেল বোর্ড আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়নি। আপিল বিভাগে জামিনের শুনানির আগের দিন খালেদা জিয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য থেকে সে রকমই মনে হয়। ‘খালেদা জিয়া রাজার হালে আছেন’—রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর এমন বক্তব্যের পর সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কী প্রতিবেদন দিতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

গতকাল শুক্রবার ঢাকায় এক আলোচনা সভায় বিষয়টির উল্লেখ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের আগের দিন প্রধানমন্ত্রী ওই মামলাকে কেন্দ্র করে বললেন, তিনি (খালেদা জিয়া) খুব ভালো আছেন, সুস্থ আছেন, হুইলচেয়ারে আছেন, ভালোভাবেই আছেন। সরকারপ্রধান যখন বলেন সব ঠিক আছে, তিনি সুস্থ আছেন...তখন বিএসএমএমইউর উপাচার্য বা ডাক্তারদের ঘাড়ে কয়টা মাথা যে তাঁরা বলবেন, তিনি খারাপ আছেন।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, দলীয় প্রধানের মুক্তিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকেরা সরকারবিরোধী একটি সমন্বিত আন্দোলনের চিন্তা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলে সে রকম আন্দোলনের প্রস্তুতি নেই। এ নিয়ে দলের কোনো পর্যায়ে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনাও হয়নি। কারণ, আন্দোলনের ধরন ও কৌশল নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে মতভেদ আছে। আবার এ পরিস্থিতিতে শক্ত কর্মসূচি দিলেও নেতা-কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কতটা হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আপাতত বড় কর্মসূচিতে না গিয়ে গতানুগতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নেতাদের অনেকে। যদিও কেউ কেউ শক্ত কর্মসূচির পক্ষে।

বিএনপির নেতারা মনে করেন, সরকারের নানা ব্যর্থতা ও অনাচারে মানুষ ক্ষুব্ধ। তাঁরা খালেদা জিয়ার মুক্তি চান। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে সরকার সারা দেশে একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছে। এ কারণে মানুষ মাঠে নামার সাহস পাচ্ছে না, মানুষ সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, ‘আমাদের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনের ব্যাপারে আন্তরিক। তাঁরা সরকারের নির্যাতন–নিপীড়নে অতিষ্ঠ। সরকারের দুঃশাসনে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ। আমরা আশা করছি, দুই বিক্ষুব্ধ পক্ষের সম্মিলনে অচিরেই এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হবে।’

অবশ্য আন্দোলনের কৌশল নিয়ে এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছেনি বিএনপি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি যাতে সহিংস আন্দোলনে নামে, সে জন্য সরকারি দলের নেতাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই উসকানিমূলক বক্তব্য আসছে। আবার বিএনপির নেতাদেরও অনেকে শক্ত কর্মসূচির ব্যাপারে উৎসাহী। এই দুয়ের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে জানান স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য।

সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় মন্তব্য করেন, বিএনপির কর্মীরা সাহসী, নেতারা দুর্বল। নেতাদের কেউ কেউ এত পয়সা বানিয়েছেন যে রাজপথে রোদ লাগাতে ইচ্ছে করে না। তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা মাঠে নামুন, ইনশা আল্লাহ সরকার বিদায় হয়ে যাবে।’

গত ২৬ নভেম্বর হাইকোর্টের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অঘোষিতভাবে বিক্ষোভ করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সে কর্মসূচির আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান ও মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতসহ অনেকে বক্তব্য দেন। এ ঘটনায় পুলিশ ৫০০ নেতা-কর্মীকে আসামি করে মামলা করে। সে রাতেই উলফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে আটক করার পর তিনি জামিন পান।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার ঘটনাকে ‘বালুতে মাথা গুঁজিয়ে মরুঝড় থেকে রক্ষার চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী। তিনি জানান, ‘দেশের সব প্রতিষ্ঠানই ভেঙে গেছে। জুডিশিয়ারি বলতে কিছু নেই। যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) রাজার হালে আছেন, সেখানে দলীয়করণে বর্তমান সংস্কৃতিতে ডাক্তাররা কি বলতে পারবেন, তিনি সুস্থ নন? এতে আমি মোটেও আশ্চর্য হইনি।’

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন